শ্রদ্ধাঞ্জলি : প্রেম ও দ্রোহের কবি রফিক আজাদের চলে যাওয়া

বুধবার, ১৬ মার্চ ২০১৬

যার কবিতা মন ভালো করে দেয়, দুঃখ-হতাশা দূর করে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করে তিনি কবি রফিক আজাদ। তার কবিতার ছোট অবয়বে বিশাল হৃদয়বৃত্তি, জীবনাচরণ, দেশাত্মবোধ, প্রেম, বিরহ ও সংগ্রামের কথা উঠে আসে। তার অপ্র্রতিদ্ব›দ্বী জাদুকরি কলমে শব্দেরা বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

কবিতার রাজপুত্তুর রফিক আজাদ ১২ মার্চ ২০১৬ তারিখ পৃথিবীর রোদ্র-ছায়া ছেড়ে চলে গেছেন অনন্তের উদ্দেশে। তার ডাক নাম জীবন। তিনি এই জীবনের কথা তার কবিতায় তুলে এনেছেন। উত্তরাধিকার পত্রিকার সম্পাদক, রোববারের নির্বাহী সম্পাদক, সংগঠক, চাকরিজীবী একাধিক পরিচয় থাকলেও তিনি কবি। অসংখ্য সাহিত্য পত্রিকায় রফিক আজাদ তার সমসাময়িক ও তরুণ কবিদের অসংখ্য কবিতা প্রকাশ করেছেন। রফিক আজাদ ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান কবি। পিতৃ প্রদত্ত নাম রফিকুল ইসলাম খান। ১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার গুণী গ্রামে তার জন্ম। পিতা সলিমউদ্দিন খান, মা রাবেয়া খানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান তিনি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে বাংলা সাহিত্যে বিএ ও ১৯৬৭ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রেম, প্রকৃতি, মানবিকতা তার কবিতার মুখ্য প্রতিপাদ্য। রফিক আজাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অসম্ভবের পায়ে’ ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়। আত্মজীবনী, পদ্যগ্রন্থসহ ৪৫টি গ্রন্থের রচয়িতা রফিক আজাদ ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ২০১৩ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।

তার ৫০ বছরের পেশাগত জীবন শুরু কাগমারী কলেজের প্রভাষক হিসেবে। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলা একডেমিতে যোগদান করেন। তিনি উত্তরাধিকার পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রফিক আজাদ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ও বিরিশিরি কালচারাল একাডেমির পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। তিনি বিজিএমসির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারেরও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক ও দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪), কবি আহসান হাবীব স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯১), কবি হাসান হাফিজুর রহমান স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৬), একুশে পদক (২০১৩), প্রভৃতি পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন। রফিক আজাদ রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ- অসম্ভবের পায়ে, সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে, এক জীবনে, হাতুড়ির নীচে জীবন, পরিকীর্ণ পানশালা আমার স্বদেশ, খুব বেশি দূরে নেই, মৌলবীর মন ভালো নেই, প্রেমের কবিতা ও শ্রেষ্ঠ কবিতা। ‘যদি ভালোবাসা পাই শুধরে নেবো জীবনের ভুলগুলো’ থেকে শুরু করে তার অসংখ্য কবিতা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে’ শীর্ষক কবিতা তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর রচনা করেছিলেন। ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কাব্যগ্রন্থে তিনি শান্ত সৌম্য গ্রাম আর শান্তিপ্রিয় মানুষদের কথা বলেছেন। প্রেম, দ্রোহ ও খেদহীন জীবনের কথা তার কবিতায় অনুরণিত হয়েছে।

আমাদের কৈশোর ও যৌবনের প্রারম্ভে রফিক আজাদের কবিতা প্রধান পাঠ্য ছিল। আমরা যারা মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে বিভিন্ন পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাহিত্য ভালো বেসেছিলাম তাদের কাছে ষাট দশকের কবিরা ছিলেন আইকন। পথ প্রদর্শক। রফিক আজাদের অনেক কবিতা আমাদের মুখস্থ ছিল। কথাবার্তায় চিঠিতে ও আড্ডায় কবিতাগুলো ঘুরে-ফিরে আসত। এখন ইন্টারনেট ও কম্পিউটারের ফেসবুক, ই-মেইল ও অনন্য সামাজিক মাধ্যমে ভুল বাংলা ব্যবহার সংক্রমিত হচ্ছে। শুদ্ধ বাক্য নির্মাণ, উপমা উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারের জন্য রফিক আজাদের কবিতা অবশ্যই পাঠ্য। আড্ডা, সাহিত্য সভা ও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সব সময় তিনি হয়ে উঠেছেন মধ্যমণি। রফিক আজাদের কবিতা পড়েছি, তাকে নিয়ে লিখেছি এবং দৈনিক ইত্তেফাকের জন্য একবার তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তিনি অকপটে তার আবেগ, ভালোবাসা ও অভিমানের কথা বলেছেন। একটি কবিতা কিভাবে রচিত হয় তার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন। রফিক আজাদ একজন মুক্তিযোদ্ধা। কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্য হিসেবে একাত্তরে রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে তিনি যুদ্ধ করেছেন। আবার সামাজিক অনাচার দুঃশাসন নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার কবিতা হয়ে উঠেছে হাতিয়ার। জাতীয় কবিতা পরিষদের সূচনা লগ্ন থেকে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন, সভাপতি ও উপদেষ্টা পদে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন কবিতা পরিষদে। রফিক আজাদের প্রয়াণ জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি কেবল বলতে পারতেন ‘পাখি উড়ে চলে গেলে পাখির পালক পড়ে থাকে’। তিনি বেঁচে থাকবেন স্মৃতিতে, স্মরণে ও কবিতায়।

সাইফুজ্জামান : প্রাবন্ধিক, লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj