ভিন্ন বাঁকে অভিজিৎ সেন

শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৫

নিরীক্ষাপ্রিয় এই ভাষাচিত্রীর প্রথম উপন্যাস রহু চণ্ডালের হাড় বাংলা উপন্যাসের ধারায় একটি বিশেষ সংযোজনা একমুখী ঘটনা ও কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে এই উপন্যাসেই তিনি বিনির্মাণ করলেন বহু চরিত্রের একমুখী ডাইমেনশন। উত্তরবঙ্গের এক যাযাবর গোষ্ঠীর জীবন সংগ্রামের কাহিনী- এই কাভারেজটি প্রথম সংস্করণে ব্যবহৃত হলেও পরে আর ব্যবহৃত হয়নি। সম্ভবত দেড়শ বছরের ক্যানভাসকে তিনি সেখানেই আটকে রাখতে চাইলেন

গু ড়িৎশ যধং রঃং ড়হি মবড়মৎধঢ়যু ধং বিষষ ধং রঃং ড়হি মবহবধষড়মু ধহফ রঃং ড়হি ভধসরষরবং, রঃং ঢ়ষধপবং ধহফ রঃং ড়নলবপঃং, রঃং ঢ়বড়ঢ়ষব ধহফ রঃং ভধপঃং, বাবহ ধং রঃ ঢ়ড়ংংবংংবং রঃং যবৎধষফৎু, রঃং ধৎরংঃড়পৎধপু ধহফ রঃং নড়ঁৎমবড়রংরব, রঃং ড়িৎশসবহ ধহফ রঃং ঢ়বধংবহঃং ধহফ ফধহফরবং ধহফ রঃং ধৎসু- রহ ংযড়ৎঃ, রঃং ড়িৎষফ. বালজাকের এই উক্তিটি অভিজিৎ সেনের ক্ষেত্রেও সত্য। উদ্ধৃতাংশটির পারম্পর্যে আরেকটি তথ্য তুলে ধরা যায়- বিকাশ শীল সম্পাদিত ‘জনপদপ্রয়াস’ ‘অভিজিৎ সেন সংখ্যা’র প্রচ্ছদে কোনো ছবি না দিয়ে একটি ক্যাপশন ব্যবহার করা হয়েছে- ‘ভীষণ নিরপেক্ষ লেখক- আসলে ভীষণ চতুর’। ক্যাপশনটি অভিজিৎ সেন কোনো এক অনুষ্ঠানে কিংবা কোনো এক আড্ডায় বলেছিলেন কোনো লেখক সম্পর্কে। কিন্তু সেই ক্যাপশনটি আবিষ্কার করে বিকাশ শীল যে তারই সম্পর্কে তার ওপর সংখ্যায় ব্যবহার করবেন তা তিনি হয়ত ভাবেননি। কিন্তু তা দেখার পর নিজের বিস্ময়ও ধরে রাখতে পারেননি। ক্যাপশনটি যথাযথ। কেননা বাংলা কথাসাহিত্যের ধারায় কথাশিল্পী অভিজিৎ সেন বিশেষ নাম- সার্বভৌম অধ্যায়। অভিজিৎ সেনের জন্ম বাংলাদেশে- অভিবক্ত ভারতবর্ষে, তৎকালীন বরিশাল জেলার ঝালকাঠি মহকুমার কেওড়া গ্রামে, ১৯৪৫ সালের ২৮ জানুয়ারি। দেশভাগের অব্যবহিত পরেই দেশত্যাগ করেন এবং কসমোপলিটন কলকাতায় থিতু খোঁজা। কিন্তু ষাট-সত্তরের উত্তাল সময়ে রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে জড়িয়ে পড়েন নকশালপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে। ফলে অনিশ্চিত জীবনের পথে ফেরারি হয়ে এক সময় নিঃস্ব-বিহŸল হয়ে আশ্রয় পান বালুরঘাটে- স্ত্রীর কাছে। রাজনীতি থেকে ফেরার হয়ে যে আততায়ী ভীতিময় সময় পার করেন বালুরঘাটেই। ষাটের শেষ দিকে এই অন্ধকার আশ্রয় তার জীবনের পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়। নিজেকে খুঁজে ফেরার তাগিদে বন্দি করেন নিজেকেই। স্ত্রীর আয় এবং নিজের আত্মগোপন ক্রমশ তুখোড় রাজনৈতিক মতবাদ ভেঙে তাকে মানবিক করে তোলে। বালুরঘাটেই অভিজিৎ সেনের স্বর্ণময় সময় কাটে- প্রিয় শহর কলকাতার আলোক ঝলকানি মায়া কেটে থিতু হন বালুরঘাটেই, ১৯৭০ থেকে ১৯৯৬ সুদীর্ঘ ২৬ বছর পার করেন এখানেই এবং এই সময়টাই অভিজিৎ সেনের শিল্পীজীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বিবেচিত। সাংসারিক জীবনের দায়ভারে ন্যুব্জ না হলেও তাকে ঘরকুনো করে তোলে জীবনের একটি দুর্ঘটনা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তার জীবনে এবং তার পরিবারে যে ক্ষত দিয়ে যায় তার দায়ভার চল্লিশ বছর যাবৎ বয়ে বেড়াচ্ছেন। একাত্তরের উত্তাল সময়ে সীমান্তবর্তী বালুরঘাট একইসঙ্গে শরণার্থীর আশ্রয়দাত্রী, ফলে গোলার আঘাত তাকেও সইতে হয়। কিন্তু বারুদের তেজষ্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। প্রথম সন্তান সুদেষ্ণার জন্মকালে তেজষ্ক্রিয়তার ফলে ফরসেপ নিরাপদ ছিল না এবং যা তার সন্তানকে মানসিক প্রতিবন্ধীতে পরিণত করে। দেশবাগ-দেশত্যাগ-সা¤প্রদায়িক নানান ঘটনার জের, রাজনৈতিক দর্শন এবং একাত্তরের এই ঘটনা অভিজিৎ সেনের লেখক জীবনকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। রহু চণ্ডালের হাড় থেকে হালের লাশ কাটা ঘরের সামনে অপেক্ষা (২০১১) প্রতিটি উপন্যাসে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব লক্ষণীয়। বিষয়বস্তু নির্বাচন, চরিত্রচিত্রণ, ঘটনার প্রবহমানতা ও রাজনৈতিক দর্শনে অভিজিৎ সেন নিঃসঙ্গ এক যাত্রী। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি যোগ করেছেন ভিন্ন মাত্রা ও অন্য সুর। রহু চণ্ডালের হাড় (১৯৮৫) অভিজিৎ সেনের প্রথম উপন্যাস, এ ছাড়া অন্ধকারের নদী (১৯৮৮), ছায়ার পাখি (১৯৯৩), আঁধার মহিষ (১৯৯৩), হলুদ রঙের সূর্য (১৯৯৬), স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা (২০০০), নিম্নগতির নদী (২০০৬), মেঘের নদী (২০০৭), মৌসুমী সমুদ্রের উপক‚ল (২০০৬), রাজপাট ধর্মপাট (২০০৮), নগ্ন নির্জন হাত (২০০৮), লাশ কাটা ঘরের সামনে অপেক্ষা (২০১১) তার অন্যতম উপন্যাস। ১৯৯২ সালে নিউইয়র্কের ঋঅঈঊঞ ইঙঙকঝ ওঘঞঊজঘঅঞওঙঘঅখ এবং দিল্লির অইঐওঘঅঠ চটইখওঈঅঞওঙঘঝ যৌথভাবে রহু চণ্ডালের হাড় উপন্যাসটির অনুবাদ গঅএওঈ ইঙঘঊঝ প্রকাশ করে। দেবাংশী (১৯৯০), ব্রাহ্মণ্য ও অন্যান্য গল্প (১৯৯৫), অভিজিৎ সেনের শ্রেষ্ঠ গল্প (২০০৫), অভিজিৎ সেনের দশটি গল্প (২০০৮) তার উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ এবং উপন্যাসের মতো ছোটগল্পের আঙ্গিক ও বিষয়বৈচিত্র্যের নিরীক্ষাভাবনায় তার স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়। ১৯৯২ সালে অভিজিৎ সেন রহু চণ্ডালের হাড়-এর জন্য বঙ্কিম সাহিত্য পুরস্কার পান এবং ২০০৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

নিরীক্ষাপ্রিয় এই ভাষাচিত্রীর প্রথম উপন্যাস রহু চণ্ডালের হাড় বাংলা উপন্যাসের ধারায় একটি বিশেষ সংযোজনা- একমুখী ঘটনা ও কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে এই উপন্যাসেই তিনি বিনির্মাণ করলেন বহু চরিত্রের একমুখী ডাইমেনশন। উত্তরবঙ্গের এক যাযাবর গোষ্ঠীর জীবন সংগ্রামের কাহিনী- এই কাভারেজটি প্রথম সংস্করণে ব্যবহৃত হলেও পরে আর ব্যবহৃত হয়নি। সম্ভবত দেড়শ বছরের ক্যানভাসকে তিনি সেখানেই আটকে রাখতে চাইলেন। কারণ অসংখ্য সূত্র বুনে অভিজিৎ সেন যাযাবর জীবনের অনালোকিত বিষয়গুলোকে পাঠকের সামনে উন্মোচন করলেন। দনু, পীতেম, পরতাপ, জিল্লু, ইয়াছিন, জামির, শারিবারা ক্রমশ যেন একটি পুরুষ চরিত্রে রূপ নেয়। সালমা, পেমা, ধার্য, পাখি, রাধা, লুবিনিরাও একটি নারী চরিত্রকে প্রতিফলিত করে। উপন্যাসে একটি নারী ও একটি পুরুষ প্রধান চরিত্রের প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে অভিজিৎ সেন বাজিকরের গোষ্ঠীগত চারিত্রদান করে কেন্দ্রীয় চরিত্রে একক নয় বহুমাত্রিক বহুব্যক্তিক অভিঘাত তৈরি করে একক লক্ষ্য স্থাপন করলেন। সমান্তরালে বদিউল শেখ, দয়ারাম ভকত, দেদন ঘোষ, আজুরা মণ্ডল, হানিফ চরিত্রগুলোও একক কোনো চরিত্র না হয়ে বরং ধর্ম কিংবা গোষ্ঠীগত চারিত্রগুণ লাভ করেছে। দেড়শ বছরেরর গোষ্ঠীগত কাহিনীকে অভিজিৎ সেন দুশ চুয়াল্লিশ পৃষ্ঠায় শুধু আবদ্ধই করেননি- বরং গণবৃত্ত ইতিহাসের যে দলিল তাকেও কথাশিল্পে জায়গা করে দিয়েছেন। আঁধার মহিষ উপন্যাসটিতে সা¤প্রদায়িক দাঙ্গার প্রসঙ্গটি প্রবলভাবে এসেছে। কামাল ও অলোকানন্দা প্রণয় ও পরিণয়কে দুই ধর্মের কেউই স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। উত্তর বাংলার জীবন ও জনপদ স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে- নগরজীবনের ছোঁয়া এখানে যেমন ছাপ রাখে নি- তেমনি রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে সেখানে ধর্মীয় প্রথাগত ধারণাকেই সকলে লালন করে। ষাট ও সত্তরের পরে আশি ও নব্বই দশকে যখন উত্তরবাংলায় রাজনৈতিক মতবাদগুলো প্রবেশ করছে সেসময় বাবরি মসজিদের ঘটনা সমগ্র ভারতবর্ষে নতুন মাত্রা যোগ করে। সাতচল্লিশের দেশভাগে যে সা¤প্রদায়িক বীজ বপিত হয়েছিল তারই একটি শাখা মাথা চারা দিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষকে ধর্মীয় গোঁড়া অন্ধকারে গ্রাস করে। সে সময় কামাল-অলোকনন্দার সম্পর্ক বিদ্বেষী ফায়দাভোগী সমাজপতিরা নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ধর্মীয় ঈর্ষাকে চরিতার্থ করে। পুরো উপন্যাসে ব্যক্তি জীবনের টানাপড়েন ও সমান্তরালে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অন্তরঙ্গ অবলোকন প্রকটভাবে ধরা পড়ে।

স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা উপন্যাসটি একাত্তরের পটভূমি নিয়েই লেখা। আনোয়ার পাশা রাইফেল-রোটি-আওরাত একাত্তরের উত্তাল-দুঃসহ সময়ের কাহিনীচিত্র, পক্ষান্তরে স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরের কাহিনী চিত্র। একাত্তরে বাঙালি দিশেহারা হয়ে যখন ভারতমুখী তখন মানিক কলকাতা থেকে বালুরঘাটমুখী হয়। কারণ রাজনৈতিক পরিচয়টি তাকে আততায়ী পরিচয় সেটে দেয়। মানিক পালিয়ে মাঝের বন্দর আসে এবং পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা নির্যাতিত-নিপীড়িত হেনাদের পরিবারও মাঝের বন্দর আশ্রয় নেয়। দুটি ঘটনাই নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার। মাঝের বন্দর উত্তরবাংলার বিভিন্ন স্থানের নামকরণের সঙ্গে মেলে, পশ্চিমবাংলার দক্ষিণ দিনাজপুরে মাঝের বন্দরের অবস্থান, বাংলাদেশে চিরিরবন্দর, রাণীরবন্দর, পুরাতন বন্দর। অপ্রয়োজনীয় কিন্তু প্রসঙ্গত উল্লেখ্য প্রবন্ধকারের জন্মস্থান পুরাতন বন্দরে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যধারায় স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা উপন্যাসটি তাই বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে। ব্যক্তি জীবনের অভিঘাত থাকার কারণে উপন্যাসটি অনেকটা আত্মজৈবনিক প্রভাবজাত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রবন্ধকারের সঙ্গে ঔপন্যাসিকের কথোপকথনে সে বিষয়টি তিনি অকপটে স্বীকারও করেন। পাঠ নেয়া যেতে পারে সে সাক্ষাৎকার থেকে- ‘আপনার রাজনৈতিক জীবন ‘স্বপ্ন ও অন্যান্য নীলিমা’র মানিক ওরফে সরোজ ব্যক্তি অভিজিৎ সেনের আত্মজৈবনিক আবহপুষ্ট কি না? উত্তরে তিনি বলেন, ‘স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা’ মূলত উপন্যাস। তবে তোমার অনুমান ঠিক উপন্যাসের কাহিনীর অনেকটাই আত্মজৈবনিক।’ এসম্পর্কে সম্পুরক ছিল, ‘আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত-এর যেখানে শেষ বলা যায় ঠিক সেখানেই ‘স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা’র শুরু এবং তা বিপরীত দিকে। দুটো ঘটনার পারম্পর্য মিলে যাওয়াটা কি কাকতালীয়? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এটাই আপনার বড় কাজ। এরপরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আর কোন কাজ সেভাবে করেননি। ভবিষ্যতে করার ইচ্ছে আছে কি? উত্তরে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জন্য বিশেষ করে বাংলাদেশি যে কোনো মানুষের সবচেয়ে বড় আবেগের জায়গা। একাত্তরে আমি মালদায়। হাজার হাজার শরণার্থীরা সীমান্তের জেলাগুলোতে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। হঠাৎ এই বিপর্যয়ে মানুষ দিশেহারা। আশ্রয় নেই, খাবার নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই এবং সামনে অনিশ্চিত ভবিষৎ! এই সময় আমি রাজনৈতিক কারণে কলকাতাছাড়া। এই ধেয়ে আসা মানুষদের সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে কখন মিলিয়ে গেছি বুঝতে পারিনি। একটা সময় মনে হলো এইসব ছিন্নমূল মানুষের মতো তো আমারও জীবন। সে জায়গা থেকে উপন্যাসটার ভাবনাটা মাথায় আসে। মুক্তিযুদ্ধ এত বড় ক্যানভাস যে এ বিষয় নিয়ে এখনো পরিণত তেমন কোনো কাজ হয়নি। স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা লেখার আগে রাইফেল রোটি আওরাত পড়া হয়নি। জানতামও না। কিন্তু যখন পড়েছি তখন আমিই বিস্মিত হয়েছি। উপন্যাসটির ঘটনা ও কাহিনীর রেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার খবর দিয়ে। নতুন দেশে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে জীবনের সব গøানিকে পেছনে ফেলে মানিক ফিরে যায় কসমোপলিটন কলকাতায় আর সতী-হেনাদের পরিবার ফেরে নিজের দেশে, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে, ‘নতুন বছরের পাঁচ তারিখে অন্য অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সতী এবং তার মা রুমেলা তাদের মুক্ত স্বদেশের পথে যাত্রা করল। সেখানে তাদের জন্য আর কোন কোন দুঃখ, আর কি অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করে আছে, তা তারা জানে না। এই মুহ‚র্তে জানতেও চায় না। তবুও সেই প্রাচীন সময় থেকে মানুষ জানে যে বন্ধ বাক্সের মধ্যে আশা শেষ পর্যন্ত থাকেই, সেই আশাই পাথেয় হয়। তারা আশা করে নতুন স্বাধীন দেশ তাদের সমস্ত অভাব এবং শোক ভুলিয়ে দেবে। এখন পর্যন্ত যার কোনো খবর পাওয়া যায়নি সেই আলমগীর মনসুর ফিরে এসে তাদের সঙ্গে মিলিত হবে।’ [স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা, পৃ-২২২]

রাজপাট ধর্মপাট উপন্যাসটি শ্রীচৈতন্যদেবকে নিয়ে। ইতিহাসকে আশ্রয় করে অভিজিৎ সেন শ্রীচৈতন্যকে মানবিক করে তুলেছেন। ধর্মপ্রচারক শ্রীচৈতন্যদেবের ধর্ম প্রচারণার বাইরে রাজনৈতিক দুরদর্শিতাকে খুব সূ²ভাবে তুলে আনতে পেরেছেন। সমগ্র ভারতবর্ষকে একই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মানবিক ছায়াতলে নিয়ে আসার এক প্রাণান্ত প্রচেষ্টা দেখা যায়। পরিব্রাজক হয়ে শ্রীচৈতন্যদেব যে রাজনৈতিক দর্শনকে লালন করে তাকে প্রোথিত করে ধর্মান্ধতার বাইরে নিরপেক্ষ দৃষ্টি রেখে তিনি শ্রীচৈতন্যদেবকে এঁকেছেন মানবীয় গুণাবলীর এক ঐশ্বর্যশালী ক্ষমতাবান পুরুষ হিসেবে। অভিজিৎ সেনের কথাসাহিত্য প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে দেয়- রহু থেকে যে পুবের যাত্রা তা ক্রমশ বাংলার সীমানা পেরিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষকে ছাপিয়ে যায় রাজপাট ধর্মপাটে এসে। শেষ করবো সোমনাথ হোরের একটি চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে, ‘…আমাদের দেশেও ভিন্নরূপে ডধৎ ্ চবধপব-এর মতো লেখা হতে পারে। একটা শক্ত কাঠামো আর তাকে ঘিরে খুঁটিনাটির পর্যবেক্ষণ এবং অনাবিল রসসৃষ্টি- পড়তে পগতে এগুলো উপলব্ধি করলাম। তাই বলতে ইচ্ছে করে নগর-উপনগর-গ্রাম সব মালায় গেঁথে একটি বড় বই লিখুন না। আজকাল বড় আকারে অনেকেই লিখছেন। কিন্তু মহৎ সৃষ্টি হচ্ছে কই! আসলে একটা মরমী জীবনবোধই উত্তরণের সহায় মনে হয়।’ সোমনাথ হোরের পর্যবেক্ষণ সামনে রেখেই হয়তো রাজপাট ধর্মপাটের সৃষ্টি। কিন্তু জীবনবোধের যে আলোকবর্তিকা নিয়ে রহু পাঠকের সামনে আসে তাকেই আগামীর পথে এগিয়ে নেন শ্রীচৈতন্যদেব। ২৮ জানুয়ারিতে এই ভাষাচিত্রী পা দিচ্ছেন ৬৭ তে- জন্মদিনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাকে অভিনন্দন- জয়তু অভিজিৎ সেন।

:: রা হে ল রা জি ব

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj