স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র এবং মেজর জিয়ার ভূমিকা

মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রথম মনস্তাত্তি¡ক যুদ্ধের মোক্ষম হাতিয়ার। এই অস্ত্র শত্রুকে বিদ্ধ করেছে চতুর্দিক থেকে। প্রচারিত হয়েছে বাংলা, ইংরেজি এমনকি উর্দুতেও। বাংলায় হতো কারণ দেশবাসী জনগণ তো বাংলায় কথা বলেন। ইংরেজিতে প্রচারের আয়োজন ছিল বিদেশি জনগণের জন্য আর উর্দুতে প্রচার হতো অবাংলাভাষী বৈরী মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তি এবং পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের জন্য। এসবই ছিল অবরুদ্ধ বাংলাদেশ, পাকিস্তানি জনগণ ও সেনাবাহিনী এবং রণাঙ্গনের মুক্তিসেনাদের উদ্দেশ্যে। কিন্তু শুরুতেই স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র ধাক্কা খেল বাঙালি মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে। তিনি তো গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানি অস্ত্রবোঝাই জাহাজ খালাস করতে। সেখানে গিয়ে তিনি বন্দর শ্রমিকদের ব্যারিকেডের সম্মুখীন হলেন এবং নিকৃষ্ট ভাষায় বিপ্লবী শ্রমিকদের মুক্তির আকাক্সক্ষায় সৃষ্ট কর্মোদ্যোগকে গালমন্দ করতে এবং তার সঙ্গীদের বাধা অপসারণের হকুম দেন। ইতোমধ্যে তিনি তারই এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারেন, অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে হেলিকপ্টারে ঢাকা সেনানিবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর রেজিমেন্টের সব বাঙালি জোয়ান ও অফিসারদের ডিস আর্ম করা হচ্ছে। এ খবর শুনে মেজর জিয়াউর রহমান সিদ্ধান্ত নেন, তার লোকজনকে নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেবেন। সেই মতো চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে চলে গেলেন, সীমান্ত পথে যাওয়ার সময়ই গ্রামবাসী জনগণ পথ আগলে দাঁড়ালেন এবং বললেন, দেশের এ দুঃসময় আপনারা আমাদের ফেলে সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারেন না। আপনারা এখানেই থাকুন। তার প্রশ্ন ছিল আমরা এতক্ষণ কোথায় থাকব, খাব কি? জবাবে গ্রামবাসী বলেছিলেন, ওসব চিন্তা আপনাদের করতে হবে না। আমরা সব ব্যবস্থা করব। … গ্রামবাসী মুক্তিকামী জনগণ মেজর জিয়া ও তার সঙ্গীদের থাকার ব্যবস্থা স্থানীয় একটি স্কুলে করে বাড়ি বাড়ি থেকে খাবারের জোগান দিয়েছিলেন। এরই মধ্যে সেই ঘটনাটি ঘটে গেল যে ঘটনা জিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ে পৌঁছলো।

স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের সংগঠকরা তখন খুঁজছিলেন একজন বাঙালি সেনা অফিসারকে যিনি বাঙালি সেনাসদস্যদের এই মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আহ্বান জানাতে পারবেন। সংগঠকরা প্রথমে চট্টগ্রাম ইপিআর বাহিনীর অধিনায়ক ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামকে এই ডাক দেয়ার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু তিনিও যেহেতু সেনাবাহিনীর সদস্য, সে জন্য রাজি হলেন না। বললেন, আমার সিনিয়র একজন রয়েছেন তিনি মেজর জিয়াউর রহমান, তাকে বলুন। বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের সংগঠকদের নেতৃস্থানীয় ছিলেন বেলাল মোহাম্মদ, তিনি একজন সঙ্গীকে নিয়ে পটিয়া রওনা হয়ে গেলেন। সেখানে এক স্কুল গৃহে জিয়ার আস্তানা খুঁজে পেলেন। বেলাল মোহাম্মদ বিষয়টা বুঝিয়ে এবং প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে জিয়াকে রাজি করাতে চেষ্টা করলেন। ফল হলো না। কিন্তু বেলাল নাছোড়বান্দা। কারণ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, এখন তো দেশের আপামর জনগণকে সাহস দিতে হবে এই জানিয়ে যে, এ যুদ্ধে কেবল নিরস্ত্র দেশবাসী কৃষক, শ্রমিক ছাত্র জনতাই করছেন না, এ যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি জোয়ান ও অফিসাররাও যোগ দিয়েছেন। বেলাল বারংবার তাকে এই যুদ্ধের গুরুত্ব অনুধাবন করাতে এবং এই আহ্বানের গুরুত্ব বোঝাতে চেষ্টা করলেন। এক সময় বেলাল মোহাম্মদ বললেন, আমরা তো সব ‘মাইনর’ আপনি ‘মেজর’। আপনি না গেলে চলবে কেমন করে?… অবশেষে এক সময় মেজর জিয়া সম্মত হলেন। কি চিন্তায় হলেন তাতো বলতে পারব না তবে মেজর জিয়া স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রে এসে সেদিন অর্থাৎ ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় নিজেকে অস্থায়ী সরকারের প্রধান হিসেবে ঘোষণা দিলেন, যেন দেশে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, তিনি তারই প্রধান হয়ে অস্থায়ী সরকার গঠন করেছেন। তিনি ক্ষমতার লোভ সংবরণ করতে পারেননি বলেই এমনি ঘটনা ঘটিয়ে ফেললেন, তাছাড়া তিনি তো মুক্তিযুদ্ধ কি জানেন না। তাই তার জানা ক্যু পদ্ধতিরই সুযোগ গ্রহণ করে তেমনই ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সকলে চমকে উঠেছিলেন। এ কি করলেন তিনি! চট্টগ্রামের খ্যাতনামা শিল্পপতি ও ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শিল্পমন্ত্রী এ কে খান মন্তব্য করেছিলেন, ওকে বুঝিয়ে বলো এটা আর্মি ক্যু নয়, এ হচ্ছে পলিটিক্যাল ওয়ার- রাজনৈতিক যুদ্ধ। অন্যদিকে বেতার সংগঠক ও সংস্কৃতিজন যারা তখনও জড়িত ছিলেন তারাও তাকে বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন যে এটা নিয়মিত প্রচারিত বেতার নয়, এটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা এবং দুঃশাসন বিরোধী সংগ্রামের চূড়ান্ত লড়াই। সুতরাং মেজর জিয়া যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা তো নয় এ যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে শুরু হয়েছে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার জন্য, একে মুক্তিযুদ্ধ বলেই অভিহিত করতে হবে। মেজর জিয়া যে চিন্তা থেকে নিজে ক্ষমতা দখল করার জন্য যে ঘোষণা দিয়েছেন এটা দিলে চলবে না। ২৩ বছরে পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এতদিন চলে এসেছে এ তারই গণবিস্ফোরণ। কারণ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পেরেছিল, এই তাদের শেষ সুতরাং তারাও মরণ কামড় দিয়ে গণহত্যা শুরু করেছিল। সবার বিরোধিতায় মেজর জিয়া মেনে নিয়েছিলেন সেদিনের পরিস্থিতির রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং পরে তিনি ভাষা ও বাক্যে তার বক্তব্য রাখবেন সেটা ঠিক করতে, ভাবতে শুরু করলেন এবং একা একটি ঘরে বসে কি লিখবেন তার খসড়া রচনায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

যারা সেদিন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের কাছ থেকে যুদ্ধকালীন একসঙ্গে কাজ করার সময়ই শুনেছি, মেজর জিয়া তাহলে কি রচনা করবেন, তা লিখতে বসে গিয়েছিলেন একটি ঘরে কিন্তু দরজা বন্ধ করে নিঃসঙ্গভাবে। তার ধারণা ছিল অন্য কেউ যেন তাকে প্রভাবিত করতে না পারে। কামরায় বসে লিখছেন সবার পরামর্শ অনুযায়ী কিন্তু পছন্দ হবে না। আবার লিখছেন ছিঁড়ে ফেলছেন, মনে করছেন ঠিক হচ্ছে না। বারবার লিখছেন আর ছিঁড়ে ফেলছেন। এমনি করে কেটে গেল সময়, ঘরের মেঝেটা সাদা মুড়িয়ে ফেলে দেয়া কাগজে ভরে গেল। তবু তার মনমতো হচ্ছে না বাক্য। অবশেষে মেজর জিয়াউর রহমান লিখলেন, আমি আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।… এই বাক্যটি সঠিক ভেবে মেজর জিয়া বেতার কর্মীদের জানালেন তিনি ঘোষণাটি পাঠ করবেন। বেতার সংগঠকরাও নিশ্চিন্ত হলেন। তবে তিনি বেতারের নাম ঘোষণা থেকে ‘বিপ্লবী’ শব্দটা বাদ দিতে বললেন। যারা উদ্যোগী হয়ে দেশকে ভালোবেসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞকে মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায় ভেবেছিলেন, তারা চিন্তা করলেন, আহ্বানটাই জরুরি দরকার। বেতারের নামটা বড় নয়। তাছাড়া ‘স্বাধীন বাংলা’ কথাটা তো আছেই। তারাও প্রয়োজনের খাতিরে ‘বিপ্লবী’ শব্দটি বাদ দিতে সম্মতি জানালেন। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র হয়ে গেল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর নামে লিখিত ঐ ভাষণটি পাঠ করলেন। সেদিন অবশ্যই এ ঘোষণাপাঠ সমগ্র দেশের তাবৎ মানুষের মনে দারুণ হতাশার মধ্যে নতুন প্রেরণা জাগ্রত করেছিল। জনসাধারণ বুঝতে পেরেছিলেন, এ যুদ্ধে আমরা একা নই সেনাবাহিনীর বাঙালি সেনারাও আছেন। মনে বল পেয়েছিলেন। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, তাহলে ইতিহাস বিকৃত করা হত।

যারা আজ মেজর জিয়া যিনি পরে জেনারেল জিয়া হয়েছিলেন, তাকেই ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বলিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে এবং বাংলাদেশের স্রষ্টাই বানাতে চাইছেন, তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছিলেন, তা যে কতখানি ইতিহাসবিরোধী অসত্য, তা বুঝেও বুঝতে চাইছেন না। কারণ এটা প্রতিষ্ঠিত করতে যে জোর প্রচারণা দরকার তার জন্য যারপরনাই কসরত চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মানুষতো নিজেরাই সাক্ষী এমন ঐতিহাসিক ঘটনায় প্রত্যক্ষ সাক্ষী তারা গ্রহণ করবেন কি করে? তাই আজ বহু চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হচ্ছেন, তখন তারা অপপ্রচার ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন। তাই বলি সত্য হলো রাজনৈতিক সংগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পরিণতি কোনো সামরিক অফিসারের কৃতিত্ব একক নয়, এ যুদ্ধ জনগণের।

:: কামাল লোহানী

লেখক : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, সাংবাদিক।

বিজয় দিবস : বিশেষ আয়োজন ২০১৪'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj