বাংলাদেশ যে জন্য এগিয়ে যাচ্ছে

মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না, এ কথাটা নিছক ঐতিহাসিক পরম্পরাবোধ থেকে যে বারবার আওড়ানো হয় সেটা নয়, এটার পেছনে একটা মানসিকতা কাজ করে যে যে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রনীতির ওপর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশও যেন সে নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে কথাটা প্রতিষ্ঠিত করা। সে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রনীতিই যেন অনুসৃত হবে এটাই যেন ওই ঐতিহাসিক পরম্পরার ব্যাখ্যা। … বাংলাদেশ আসলে এ ধারণাকে অস্বীকার করেই সৃষ্টি হয়েছে।

এগিয়ে যাওয়ার প্রযুক্তিগত ভিত্তি : বাংলাদেশ ৪৪তম বিজয় দিবসে উপনীত হলো। হেনরি কিসিংগার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে গাল দিলে আমরা সেটা হজম না করে কাজ করতে লাগলাম। কাজে কাজে বাংলাদেশ তো তলাবিহীন ঝুড়ি হলোই না, বরঞ্চ এর উন্নতির অনেক তলা হলো। পত্রপত্রিকার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ উন্নতির বহু সূচকে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে ভারতের চেয়েও। শিশু মৃত্যু ও প্রসূতির মৃত্যুর হার কমেছে, বয়োবৃদ্ধ লোকের আয়ুও বেড়ে গেছে এবং সক্ষম জনগোষ্ঠী, অর্থাৎ ১৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে বেঁচে আছে এমন লোক এখন সংখ্যাধিক্যতা পেয়েছে ফলে যে বিশাল জনসংখ্যাকে ইঙ্গিত করে তলাবিহীন ঝুড়ির মতোটা তৈরি হয়েছিল, সে জনগোষ্ঠীই এখন অর্থনীতির ভাষায় ডিভিডেন্ট বা লাভ দিতে শুরু করেছে। সবল জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হচ্ছে চিকিৎসা প্রয়োগ ও ওষুধ প্রস্তুতির উন্নতি হওয়া।

জনসংখ্যার গুণগত মান বৃদ্ধি পাওয়ার আরেকটি কারণ হলো কর্মসংস্থানের বিকাশ হওয়া। ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার ধারণা হলো কাজ না খুঁজে কাজ তৈরি করা আর সে অর্থে বাংলাদেশে গত দুদশকেরও বেশি সময়ে ব্যক্তিগত উদ্যমে উপকৃষি পণ্য উৎপাদনের ঘোর লেগেছে। আলু, বেগুন, কপি, টম্যাটো, শসা, ঝিঙা প্রভৃতি সবজির চাষ আশ্চর্যজনকভাবে বেড়েছে। নিজের কর্ষিত এবং চর্চিত কুমড়োর বাগানের পাশে দাঁড়ানো হাস্যোজ্জ্বল কৃষকের ছবি পত্রপত্রিকায় প্রায় দেখি। মাছের চাষ বাংলাদেশের আদি উৎপাদন কর্ম। এখন হ্যাচারি আর ফিশারিসমূহে মাছের ডিম প্রজনন ও চাষ, পোনা মাছের দেখভাল করার ব্যবস্থা ও গতিশীলতা দেখার মতো। ব্যক্তিগতভাবে চাকরিসূত্রে আমি এখন ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানায় বাস করি আর দেখছি কবি নজরুল স্মৃতিধন্য এই ত্রিশাল যেন মাছ প্রজননের রাজধানী হয়েছে। আগে যেমন গ্রামের বাড়িতে সামনে-পেছনে পুকুর সাজানো থাকত, এখন সে পুকুরগুলো হয়ে গেছে মাছ প্রজননের জলাধার। অর্থনীতির উৎপাদন উৎসের পরিবর্তন হলে- এর স্তরেরও পরিবর্তন হয়, ফলে পুকুরের কাব্যিক অবস্থানের জায়গা করে নেয় প্রচুর অর্থ সংস্থানকারী হ্যাচারির জলাধার। আমার বহু কর্মচারীর ফাইল আমি সই করি যেখানে তারা ব্যাংক লোনের জন্য আবেদন করে থাকেন। আমি বলি, এই লোন আপনারা শোধ করবেন কীভাবে? তারা বলেন, হ্যাচারির ব্যবসাতে পুঁজি দেবেন, লাভ আসবে এবং এই লোন শোধ করা তখন কোনো ব্যাপার হবে না। আমি বুঝতে পারি, এটি অলীক আশা নয়, বাস্তব অর্থনীতিজাত আশা। মনে পড়ছে, প্রায় বছর বত্রিশ আগে লিও মার্ক্স নামক এক আমেরিকান অধ্যাপকের মেশিন ইন দ্য গার্ডেন নামক একটি চমৎকার বই পড়েছিলাম, যেখানে বিশ্লেষেণ করা হয়েছিল আমেরিকা মহাদেশটি এক সময় ভার্জিন ল্যান্ড (আবার ভার্জিন ল্যান্ড নামক একটি বিখ্যাত বই আছে, যার লেখক হেনরি ন্যাশ স্মিথ নামক আরেকজন আমেরিকান অধ্যাপক) নামে রোম্যান্টিকভাবে পরিচিত থাকলেও আসলে এর প্রযুক্তিগত উন্নতিতে শিল্পায়ন হওয়ার ফলে সেই ভার্জিন ল্যান্ড তার সতীত্ব রক্ষা করতে পারেনি এবং রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় কিন্তু সে সতীত্ব হারানো প্রকৃতির জন্য মায়াকান্না নেই, আছে কুমারী প্রকৃতির সঙ্গে প্রযুক্তির মেলবন্ধন। ওই সুরেই লিও মার্ক্স বললেন, আমেরিকার শিল্পায়নের ফলে প্রকৃতি মার খেয়ে গেছে বললে ভুল হবে, বরঞ্চ শিল্পায়নের ফলে আমেরিকান কুমারী প্রকৃতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। টম হ্যাংকস অভিনীত অতি উঁচুমানের ছবি ফরেস্ট গাম্পে প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পায়নের সমন্বয়ের ভিত্তিতে তৈরি প্রচুর দৃশ্যাবলি রয়েছে। প্রকৃতিকে নতুনভাবে দেখা, এর সঙ্গে প্রাচীন প্রথাগত কৃষি জীবনযাপনের ছবি বদলে সেখানে প্রযুক্তি ও শিল্পায়নগত সমন্বিত ছবি ফুটিয়ে তোলা এখন বাংলাদেশেও জরুরি হয়ে পড়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশের উদ্বোধন করলে তখন প্রচুর সমালোচনা আসতে থাকে কিন্তু পাঁচ বছর পার হওয়ার পর এখন সেরকম আর সমালোচনা আসে না, কারণ সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছে যে ডিজিটাল বাংলাদেশের অর্থ বাংলাদেশেকে দ্রুত শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিবান্ধব করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বস্তুত প্রযুক্তিনির্ভর না হয়ে বাংলাদেশের উপায় নেই। এত ছোট জায়গায় এত জনবহুল দেশ পৃথিবীতে আর নেই, তার ওপরে রয়েছে ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে সময় এবং ভূমি অর্থাৎ টাইম এবং স্পেইসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে প্রযুক্তিনির্ভরতা ছাড়া উপায় নেই।

এগিয়ে যাওয়ার তাত্তি¡ক ভিত্তি :

বাংলাদেশ কেন এগিয়ে যাচ্ছে এর একটা তাত্তি¡ক ভিত্তিও আছে। আমি প্রায় একটা কথা শুনি আর অস্বস্তিতে পড়ি। সেটা হচ্ছে, পাকিস্তান না হলে নাকি বাংলাদেশ হতো না। ঐতিহাসিকভাবে কথাটা গ্রহণযোগ্য। কারণ এর একটা ঘটনা পরম্পরা আছে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান-ভারত দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় এবং ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রক্তক্ষয়ী এক মুক্তিযুদ্ধের ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়, যে দেশটির আজকে ৪৩ পার হয়ে ৪৪ বছর শুরু হলো এবং যার আমরা গর্বিত নাগরিক।

আমার অস্বস্তিটা সেখানে নয়। আমার অস্বস্তিটা হচ্ছে পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না, এ কথাটা নিছক ঐতিহাসিক পরম্পরাবোধ থেকে যে বারবার আওড়ানো হয় সেটা নয়, এটার পেছনে একটা মানসিকতা কাজ করে যে যে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রনীতির ওপর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশও যেন সে নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে কথাটা প্রতিষ্ঠিত করা। সে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রনীতিই যেন অনুসৃত হবে এটাই যেন ওই ঐতিহাসিক পরম্পরার ব্যাখ্যা।

আজকের লেখায় আমি আলাপ করতে চাই যে কীভাবে এ ধারণাটা ভিত্তি পেয়েছে এবং সে সঙ্গে এ কথাও যে বাংলাদেশ আসলে এ ধারণাকে অস্বীকার করেই সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমদিকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন ও তারপর সে নীতির সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সংঘর্ষের ফলেই যে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে এ কথাটাই খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমি বলার চেষ্টা করব।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর। যার অর্থ ছিল হিন্দুদের একটি আলাদা রাষ্ট্র হবে আর মুসলমানদের হবে আরেকটা। ভারত ও পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হলো। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে দেখা গেল একটা বিরাট সমস্যা যে এর অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হলেও এদের ভাষা বাংলা ও এদের সংস্কৃতি বাঙালি।

ভাষার প্রশ্নে উত্তর দিতে পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এলেন। তিনি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রমনার ঘোড়দৌড় ময়দানে বিরাট এক জনসভায় বললেন যে, ‘এটা আপনাদের কাছে স্পষ্ট করে বলে দেয়া হচ্ছে যে, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়।’

জিন্নাহর যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কথা আবুল কালাম আজাদের ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম বইটা পড়ে জেনেছি, তাতে আমার মানব চরিত্রের গূঢ় অভীপ্সা সম্পর্কে উৎসুক মন বিশ্বাস করতে চায় না যে জিন্নাহ এ কথাটা ভেতরের কোনো গভীর উপলব্ধি থেকে বলেছিলেন। বরঞ্চ আমাদের বইটা পড়ে মনে হয় যে তার দেশ থেকে এক হাজার মাইল দূরে পূর্ব পাকিস্তান নামক একটি ভূখণ্ডও তার রাজনৈতিক পরিধির আওতায় আসবে এটা তিনি চেতনায়ও আনেননি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আলাদা ভূগোল, ইতিহাস, জলবায়ু এবং ভাষা সম্পর্কে তিনি কোনো ওজনদারী চিন্তা করেননি বলেই পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার অস্তিত্বকে অস্বীকার করেই তবে ওই অবাস্তব ঘোষণাটি দিতে পেরেছিলেন। হয়ত জীবন সায়াহ্নে উপস্থিত হয়ে এ ঘোষণাটা তিনি অনেকটা নির্ভার হয়ে ঝুঁকিহীনভাবে বলেছিলেন। এর ফলাফল সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার ব্যাপারটা তার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল না।

কিন্তু জিন্নাহ না হয় পরিণাম চিন্তা করেননি, কারণ তার চিন্তা করার কারণও ছিল না। কিন্তু এ ভূখণ্ডের বাঙালি ভাষাভাষী নেতারা কেন পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেছিলেন তা বিস্ময়করভাবে একটি ঐতিহাসিক সত্য হলেও একটি বিস্ময়ও বটে। এ প্রশ্নের খানিকটা উত্তর পেলাম একটা ঘরোয়া আলাপে অধ্যাপক পবিত্র সরকারের কাছে। তিনি রবীন্দ্র-ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং খুব পণ্ডিত লোক। আলাপে আলাপে ভারতবর্ষ বিভক্তির কথা উঠে আসলে তিনি বললেন, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন না হলে এ অঞ্চলের মুসলমানরা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে হিন্দুদের দ্বারা পর্যুদস্ত থাকত। তাই দেশ ভাগ হয়ে ভালোই হয়েছে। অর্থাৎ অধ্যাপক সরকার ওপরে আমি যে প্রশ্নে আমার অস্বস্তি হয় বললাম, সে প্রশ্নেরই সমর্থন করলেন।

চিন্তাবিদ আবুল ফজলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তার মৃত্যুর কিছু আগে যে ক্ষণিকের পত্র-যোগাযোগ হয়েছিল, সে বিনিময়েরও একটি বিষয়ের সঙ্গে আমার অস্বস্তির একটা সম্পর্ক আছে। বিষয়টা ছিল পূর্ব বাংলার মুসলমানী শব্দ বনাম কলকাতাভিত্তিক চর্চিত বাংলা শব্দের ব্যবহার নিয়ে। আবুল ফজল রবীন্দ্রনাথের কাছে অনুযোগ করলেন যে পূর্ব বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠীর জীবন ও ভাষা রবীন্দ্র সাহিত্যে তেমন করে জায়গা না পাওয়াতে চন্দ্রের অর্ধ পিঠ রবীন্দ্র প্রতিভার আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আরো বললেন, বাংলায় ‘জলখাবার’ পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা ‘নাস্তা’ হিসেবে চেনে। মৃত্যুর আগে আগে রবীন্দ্রনাথ তখন গুরুতর অসুস্থ, তার দৃষ্টিশক্তি তখন ক্ষীণ। তারপরও তিনি আবুল ফজলকে উত্তর লিখলেন যে বাংলা ভাষা তার নিজস্ব চরিত্র অনুযায়ী বিদেশি ভাষা গ্রহণ করবে কিংবা বর্জন করবে। ওখানে জোরাজুরির কিছু নেই। বললেন, হিন্দি এবং উর্দুতে ‘খুন’ মানে রক্ত হলেও, বাংলায় ‘খুন’ মানে হত্যা এবং এটা আপনা থেকেই এসেছে। আবুল ফজলের অনুরোধের পেছনে রাজনৈতিক যে চিন্তাটা কাজ করেছিল, সেটা হচ্ছে যে রবীন্দ্রনাথের মতো কাণ্ডারি লেখক যদি বাংলায় মুসলমানী শব্দের আগমন ঘটান তাহলে হিন্দু-মুসলমানের সাংস্কৃতিক ঐক্য দৃঢ়তর হবে। কিন্তু এর কিছু পরে অন্নদাশংকর রায়ের যখন রবীন্দ্রনাথ এবং ফজলের মধ্যে পত্র বিনিময়ের ব্যাপারটা দৃষ্টিগোচর হলো তখন তিনি মন্তব্য করলেন যে তাই যদি হয়, তা হলে কেন আবুল ফজলসহ সে সময়কার অন্যান্য বাঙালি মুসলমান লেখকরা পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করলেন! (সূত্র : আবুল ফজল স্মারক গ্রন্থ)

অন্নদা শংকর রায়ের কৌত‚হলের জবাবে এ ধারণাটা জবাব হিসেবে আসবে যে তখনকার বাঙালি মুসলমান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী মনে করেছিলেন যে হিন্দু আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে হলে পাকিস্তান আন্দোলনে সাড়া দেয়া হলো আশু কর্তব্য। অর্থাৎ একটি তাৎক্ষণিক সমাধানের রাস্তা খুঁজে পেয়ে তারা দূরবর্তী ফলাফলগুলো সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। তারা বুঝতে চাননি যে, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে ভাষার প্রশ্নটা আপাতত গৌণ থেকে গেলেও এক সময় সেটা বিস্ফোরিত হবে। ফলে ভবিষ্যতে সংকট তৈরি হবে।

তবে সবাই যে দ্বিধাহীনভাবে পাকিস্তানপন্থী হয়ে পড়েছিলেন তেমনটি নয়। ভাষার প্রশ্নে যে সংকট তৈরি হবে এটি উপলব্ধি করেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. মুহাম্মদ জিয়াউদ্দিন দেশ বিভাগের আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। তখন দৈনিক আজাদ, ১২ শ্রাবণ, ১৩৫৪ (১৯৪৭) সংখ্যায় ড. শহীদুল্লাহ লিখেছিলেন যে, ‘বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতার নামান্তর হইবে।’ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, যার প্রবন্ধ ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও ঢাকা’ প্রবন্ধ থেকে উপরের তথ্যটি নিয়েছি তিনি লিখলেন যে, ‘বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ড. শহীদুল্লাহই প্রথম পাকিস্তানের রাষ্টভাষা রূপে বাংলার দাবি উচ্চারণ ও উত্থাপন করেছিলেন।’

ড. শহীদুল্লাহর চিন্তাধারার অনুসরণে, বলাবাহুল্য, পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরপরই ভাষা সম্পর্কিত প্রশ্নটি জোরদার হয়ে ওঠে এবং ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়। এর পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হলে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের পাল্টা বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক রাজনৈতিক চেতনা শিকড় গাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছয় দফা আন্দোলন, আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলনসহ যখন মুক্তিযুদ্ধে দেশ পদার্পণ করল তখন বাংলা ভাষা ও বাঙালি অর্থনীতি ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রের চৌহদ্দির মধ্যে রূপ পাওয়ার মুখোমুখি হয়। তখন দেখা গেল যে পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিগুলো যে পথটি নিল সেটি হলো জিন্নাহ নির্ধারিত পথটি, যেখানে বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতির পরিচিতি ও অস্তিত্ব অস্বীকার করে একটি বিজাতীয় ভাষা ও তার মাধ্যমে বিজাতীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার আয়োজন ছিল।

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এ শক্তিগুলোর লক্ষ্য হয়ে পড়ল ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের আলোকে উস্কানিকৃত জিন্নাহর ভাষাচিন্তাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়া। মুক্তিযুদ্ধের ঊষালগ্নে এ শক্তিগুলো বাংলাদেশ আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি নিধনে সার্বিক পরিকল্পনায় নামল।

এটাই আমি বলতে চাইছিলাম যে, পাকিস্তান আন্দোলনের সময় যে সত্যটা আপাত চাপা পড়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সে সত্যটাই নগ্ন হয়ে প্রকাশ হয়ে পড়ল যে পাকিস্তান আন্দোলন ছিল পুরোপুরি একটি সাম্প্রদায়িক আন্দোলন। অর্থাৎ জিন্নাহর ঘোষণার তাত্তি¡ক আড়ালে যে সাম্প্রদায়িকতার অস্ত্রটি লুকিয়ে ছিল, সেটিই প্রকাশ হয়ে পড়ল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক শক্তিসমূহের দ্বারা গঠিত শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদি বিভিন্ন সংগঠনের কার্যাবলির মধ্য দিয়ে।

পূর্ব পাকিস্তানের অর্থাৎ ‘খ’ অঞ্চলের প্রধান সামরিক প্রশাসক লে. জে. টিক্কা খানের নেতৃত্বে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শেষ হওয়ার পর পরই ৪ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে পিডিপির (পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি) সভাপতি নূরুল আমীনের নেতৃত্বে ১২ জনের একটি দল তার সঙ্গে দেখা করেন। অন্যদের মধ্যে এ প্রতিনিধি দলে ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম, মৌলভী ফরিদ আহমদ, খাজা খয়েরউদ্দীন, এ কিউ এম শফিকুল ইসলাম, মাওলানা নূরুজ্জামান প্রমুখ। তারা সামরিক কার্যক্রমকে সমর্থন করেন এবং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সামরিক আইন প্রশাসনকে সহায়তার আশ্বাস দেন। টিক্কা খান তাদের সহায়তার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে ‘দুষ্কৃতকারী ও সমাজবিরোধীদের আশ্রয় না দেয়া এবং সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের সংবাদ পৌঁছে দেয়ার’ কথা বলেন। (সূত্র : ‘ঢাকায় স্বাধীনতা বিরোধীদের তৎপরতা’, আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন)।

এভাবেই শান্তি কমিটি গঠিত হয়। এরা জিন্নাহর চিন্তাকে প্রত্যক্ষ রূপ দেয়ার পথে নামে। হোসেনের প্রবন্ধটি থেকে জানতে পারছি, মোহাম্মদপুর শান্তি কমিটির শাখা ৯ আগস্ট ১৯৭১ সালে যে এগারটি সিদ্ধান্ত নেয় তার প্রথমটি ছিল এরকম- ‘উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্টভাষা এবং বিদ্যালয়ের বাধ্যতামূলক বিষয় করতে হবে। বাংলা সাইনবোর্ড, নম্বর প্লেট ও নাম অপসারণ এবং সংস্কৃত ধরনের বাংলা অক্ষরের পরিবর্তে রোমান হরফ ব্যবহার করতে হবে।’

তাহলে দেখা যাচ্ছে, যে পাকিস্তানের ভিত্তি ছিল উর্দু ভাষা ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, সে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের সৃষ্টি হতে পারে না। সে জন্য বাংলাদেশের সৃষ্টির উৎসলগ্নটা ধরতে হবে ১৯৪৭ সাল থেকেই। অর্থাৎ যখন থেকে পাকিস্তানের সৃষ্টি তখন থেকেই বাংলাদেশের সৃষ্টির আয়োজন। তখন থেকেই বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতির স্বাধিকার আন্দোলন শুরু হয়।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে এ কথাটা না বলে বলতে হবে পাকিস্তান নামক পর্বটা বাংলাদেশের পথ আটকে ছিল যেটাকে সরাতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন হয়ে পড়ল।

:: মোহীত উল আলম

লেখক : উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

বিজয় দিবস : বিশেষ আয়োজন ২০১৪'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj