মুজিবনগরস্থ বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী বিষয়ক ভূমিকা

মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা ও গঠন হওয়ার পর ব্যাপকভাবে শরণার্থীদের আগমন থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় অত্যাচারের মাত্রার সঙ্গে শরণার্থীদের ভারতে উপস্থিতি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ পর পাকিস্তানি বাহিনীর বিভিন্ন জেলা শহর দখল ও দ্বিতীয় দফার হত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ, রাহাজানি, ধর্ষণ, অপারেশন শুরু করার পর শরণার্থীদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন জেলা শহর দখল করলো : প্রথমে ১০ এপ্রিল পাকসী; পাবনা; সিলেট; ১১ এপ্রিল ঈশ্বরদী; ১২ এপ্রিল নরসিংদী; ১৩ এপ্রিল চন্দ্রঘোনা; ১৫ এপ্রিল রাজশাহী; ঠাকুরগাঁ; ১৬ এপ্রিল কুষ্টিয়া; লাকসাম; ১৭ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা; ১৯ এপ্রিল দর্শনা; ২১ এপ্রিল গোয়ালন্দ, ফরিদপুর; ২২ এপ্রিল দোহাজারী; ২৩ এপ্রিল বগুড়া; ২৬ এপ্রিল রংপুর; নোয়াখালী; ২৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ; শান্তাহার; ২৮ এপ্রিল মৌলভীবাজার; ১০ মে কক্সবাজার; ১১ মে হাতিয়া। একটি পরিসংখ্যান বিশেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

পশ্চিম বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক সমিতি (৩৩ মিরর স্ট্রিট, কলকাতা) গঠিত হয়। এই সমিতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুব অভ্যর্থনা কেন্দ্রসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরের যাবতীয় রসদ, বস্ত্র, ও আনুষঙ্গিক বিষয়ক ত্রাণ সরবরাহ করে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে পশ্চিম বাংলার গভর্নর এ এল ডায়াস রাজ্যেও শাসনভার গ্রহণ করেন।

ভারত সরকারের অক্টোবর মাসের পরিসংখ্যান মতে, শরণার্থীদের মধ্যে শিশু ও প্রসূতিদের সংখ্যা যথাক্রমে ১৩ লাখ ৬০ হাজার এবং ৫ লাখ ৩১ হাজার। প্রসূতি ও শিশু মৃত্যুর হার ছিল বেশি। ঞযব পযরষফৎবহ ংঁভভবৎ ঃযব সড়ংঃ. গধহু ধৎব নবমরহহরহম ঃড় ষড়ড়শ ষরশব ঃযব ংঃধৎারহম পযরষফৎবহ ড়ভ ইরধভৎধ, ঃযবরৎ ৎরনং ঢ়ৎড়ঃৎঁফরহম, ঃযবরৎ ংঃড়সধপযং ফরংঃবহফবফ. অষসড়ংঃ ধষষ ংঁভভবৎ ভৎড়স সধষহঁঃৎরঃরড়হ ড়ৎ ফুংবহঃবৎু. খরভব-মরারহম সরষশ ধহফ ড়ঃযবৎ ঢ়ৎড়ঃবরহ ভড়ড়ফং ধৎব ধাধরষধনষব রহ ংড়সব ড়ভ ঃযব পধসঢ়ং, নঁঃ ঃযব ৎঁংয রং ংড় মৎবধঃ ঃযধঃ সধহু পযরষফৎবহ হবাবৎ মবঃ ধহু. অ ফড়পঃড়ৎ ধঃ ধ নড়ৎফবৎ যড়ংঢ়রঃধষ ংধুং, “ঃযব পযরষফৎবহ ফরব ংড় য়ঁরপশষু ঃযধঃ বি ফড়হ’ঃ যধাব ঃরসব ঃড় ঃৎবধঃ ঃযবস.” [*অৎঃরপষব নু উধারফ জববফ ধহফ ঔড়যহ ঊ. ঋৎধুবৎ, জবধফবৎং’ উরমবংঃ, ঘড়াবসনবৎ, ১৯৭১. সেভ দ্য চিল্ড্রন ফান্ড জুলাই ৭১ থেকে ফেব্রুয়ারি ৭২ পর্যন্ত সার্বিকভাবে একটি শরণার্থী শিবিরে গবেষণা চালিয়ে দেখেছে শিশুরা উদরাময় রোগ ও অপুষ্টিজনিত কারণে সরচেয়ে বেশি মৃত্যুর শিকার হয়েছে। জুন মাসে কলেরায় কৃষ্ণনগর ফিল্ড হসিপাতালে ৫০০০ নারী ও শিশু মৃত্যু হয়। আমি ও মোল্যা জালাল (এমএনএ, গোপালগঞ্জ) অসহায় শরণার্থী নারী রোগীদের রোগ যন্ত্রণা প্রত্যক্ষ করেছি।। মার্কিন সাপ্তাহিক জুন মাসে কলেরায় শরণার্থীগণ আক্রান্ত শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

আমি কল্যাণীতে স্বদেশবাসী বা শরণার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন শিবিরে কথা বলেছি। তাদের কথায় শুধু প্রাণভয়ের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। যারা আমাদের প্রতিবেশী, শান্তি কমিটি, রাজাকাররা আমাদের সঙ্গে এতবড় বেইমানি করলো, আমাদের ঘরদোর ভেঙে নিয়ে গেল। আর্মি দিয়ে মারলো, মা-বোনের ইজ্জত নিয়ে নারকীয় উল্লাস করলো, তাদের সঙ্গে থাকা যাবে না। আমি বললাম, দেশ স্বাধীন হলে আর কোনো ভয় থাকবে না। পাকিস্তানি আমলের সব কালা আইন বাতিল হয়ে যাবে, আমরা সবাই স্বাধীন দেশের সমনাগরিক হবো। নিজের মাটিতে, পূর্বপুরুষের ভিটায় স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে বাঁচবো। আজ এই যে আমরা শরণার্থী হয়ে এসে হাজার হাজার লোক অসুখ-বিসুখে মরলো, লাখ লাখ শিশু ও প্রসূতি অপুষ্টি, অনাহার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মারা গেল তাদের মৃত্যু কি কোনো মূল্য পাবে না? আমরা সকলে দেশে নিজ ভিটায় ফিরে যাবই, স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হবোই। আমার কথায় অনেকে চুপ করে থাকে, তাদের অনেকেই খুলনা ‘চুক নগরের’ বা অন্য কোনো গণহত্যার নৃশংস হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছে। সর্বস্ব হারিয়ে জীবন নিয়ে বেঁচে এসেছে। আমি বুঝলাম, প্রাণের ভয়, নিদারুণ স্বজন হারানো অভিজ্ঞতা ও প্রতিবেশীদের প্রতি আস্থাহীনতা তাদের মন বিক্ষিপ্ত। এই মানবেতর শরণার্থী জীবন তাদের কাছে কোনো পথের সন্ধান বা নতুন আশার আলো বয়ে আনেনি। আমরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছি বলে, আর আমরা হিন্দু বলে অত্যাচারিত হয়ে বাস্তুহারা। তবু তাদের মধ্যে বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয়, বাপ-ঠাকুরদা ভিটা, দেশে যাব। আগে দেশ স্বাধীন হোক।’ (লেখক)। ‘পাক বাহিনীর নির্মম অত্যাচারে বাংলাদেশের ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল ভারতে। এই এক কোটি জনগোষ্ঠীর ত্রাণকার্য পরিচালনা করা সহজসাধ্য নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রচেষ্টায় এই লোকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে খাদ্য বস্ত্র কম্বল প্রভৃতি ত্রাণ সামগ্রী এসেছে। মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রিলিফ কমিশনার হিসেবে আমার প্রধান দায়িত্ব ছিল ভারত সরকারের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করা এবং ত্রাণ সামগ্রী বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে যাতে যথাযথভাবে পৌঁছে যায় এবং তা সুষ্ঠুভাবে বণ্টিত হয় তার দিকে লক্ষ্য রাখা। এ ব্যাপারে আমাকে বিভিন্ন ক্যাম্প (শিবির) পরিদর্শন করতে হয়েছে। তৎকালীন ত্রাণ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত উদ্ভূত সমস্যাবলী নিয়ে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বৈঠকে বসতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারত সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সচিব মি. কলহান ও অতিরিক্ত সচিব মি. লুথরার নাম উল্লেখ করতে চাই। অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও অসহায় শরণার্থীকে তাৎক্ষণিক বিপদের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য তৎকালীন বিপ্লবী সরকারের মন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামানের পরামর্শক্রমে কিছু কিছু আর্থিক সাহায্যও দেয়া হয়েছে।’ (রিলিফ কমিশনার শ্রী জয় গোবিন্দ ভৌমিক : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : ১৫ খণ্ড সংক্ষেপিত)

এপ্রিল মাস থেকে আমরা সীমান্ত এলাকায় যাওয়া শুরু করি। কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করেই বুঝতে পারলাম তাদের ওপর কী ভয়ানক নিপীড়ন চলেছে। অনেকেই তাদের সন্তান হারিয়েছে। কেউ কেউ বললো, বেয়নেট বিদ্ধ করা হয় তাদের। অনেকে জানালো গুলি করে মারার জন্য তাদের লাইন করে দাঁড় করানো হয়েছিল। গুলির শব্দে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে গিয়ে তারা মৃতের ভান করে শুয়ে থাকে। তারপর নিঃশব্দে বুকে হেঁটে পালিয়ে আসে। রাইফেলের গুলি কাঁধের মাংস ছিঁড়ে নিয়ে গেছে, এরকম কয়েকজনকে আমি হাসপাতাল ও সেবা কেন্দ্রে দেখেছি। বিরামপুর হাসপাতালে ৬৫ বয়সের এক বৃদ্ধের সঙ্গে কথা হয়। তার কথা আমি টেপ রেকডারে রেকর্ড করি। তার ভাষায়- রাজশাহীতে গঙ্গার পাড়ে কয়েকশ লোক এসে জড় হয়। নদী পার হওয়ার জন্য নৌকায় উঠতে থাকে এমন সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সৈনিকেরা তাদের ঘিরে ফেলে। শিশু আর মহিলাদের এক পাশে এসে দাঁড় করার। তাদের বলা হলো বাড়ি চলে যেতে। বয়স্ক আর কিশোরদের বালির ওপর বসে পড়তে নির্দেশ দিল। এবং বসা মাত্রই মেশিন গানের গুলি চালিয়ে দেয়া হলো। তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো অনেকে। যারা আগত হলো মৃতের ভান করে পড়ে রইলো। তারপর সবাইকে টেনে এনে এক জায়গায় গাদা করা হলো। তারপর তাদের ওপর পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো।

৬৫ বছরের বৃদ্ধটি বললো, সে বুঝতে পারছিল কী ঘটতে যাচ্ছে। আগুনের বিস্তার শুরু হতেই সে মৃতের ভান করে পড়ে থাকতে পারলো না। নিঃশব্দে দেহের ওপর থেকে মৃতদেহ সরিয়ে বুকে হেঁটে সরে যায়। তার ছেলে ও আরো কয়েকজন এভাবে পালায়।… এপ্রিল এবং মে মাসে দিনাজপুর জেলার লোক বন্যার মতো সীমান্ত পাড়ি দিতে থাকে। আগতদের পরনে কোনো বস্ত্র ছিল না। রাতে তাদের ওপর হামলা করা হয়।… আমি হিলির ওপারে গ্রমগুলো জ্বালিয়ে দিতে দেখলাম।’ ফাদার হ্যাসটিংসের দীর্ঘ রিপোর্ট, ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় বেশ কিছু লোকের সঙ্গে কথা বলে তাদের দেয়া বিবরণ তুলে ধরেছেন। (সূত্র : বাংলাদেশ ডকুমেন্টস, ২য় খণ্ড, পৃ-৬৮-৭১) (সংক্ষিপ্ত) অ্যান্টনি মাসকারেনহাস তার ‘রেইপ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন : ‘সারা প্রদেশজুড়ে হত্যাকাণ্ডের সুব্যবস্থার নমুনার সঙ্গে জেনোসাইড বা গণহত্যা শব্দটির আভিধানিক সংজ্ঞার হুবহু মিল রয়েছে। পরে আম যখন কুমিল্লাস্থ ১৪নং ডিভিশনের প্রধান কার্যালয় সফরে যাই, তখন জানতে পারি যে, বর্বরতা ও ব্যাপকতার সঙ্গে ওই অভিযানের জন্য সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা কার্যকর করা হচ্ছে।

গণহত্যার লক্ষ্যবস্তু ছিল এই :

১। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিক পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল বাহিনীর লোক, পুলিশ এবং আধা সামারিক আনসার ও মুজাহিদ বাহিনীর লোক।

২। হিন্দু স¤প্রদায় ‘আমরা কেবল হিন্দু পুরুষদের হত্যা করছি, হিন্দু নারী ও শিশুদেরকে ছেড়ে দিচ্ছি। আমরা সৈনিক, নারী শিশুদেরকে হত্যা করার মতো কাপুরুষ আমরা নই। কুমিল্লায় আমি এ কথা শুনেছি।

৩। আওয়ামী লীগের লোক- নিম্নতম পদ থেকে নেতৃত্বস্থানীয় পদ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের লোক, বিশেষ করে এই দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও স্বেচ্ছসেবকগণ।

৪। ছাত্র- কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত তরুণের দল ও কিছু সংখ্যক ছাত্রী। যাঁরা ছিলেন অধিকতর সংগ্রামী মনোভাবাপন্ন।

৫। অধ্যাপক ও শিক্ষকদের মতো বাঙালি বুদ্ধিজীবী স¤প্রদায় যারা ‘সংগ্রামী’ বলে সেনাবাহিনী কর্তৃক সব সময় নিন্দিত হতেন।

ঢাকায় এবং প্রদেশের অন্যান্য স্থানে সেনাবাহিনীর লোকেরা যখন তাদের নৃশংসতা চালাত তখন তারা এই হতভাগ্য লোকদের তালিকা সঙ্গে নিয়ে যেত। ২৫ মার্চের আগে সেই অবমাননাকর দিনগুলোতে অর্থাৎ অসহযোগ আন্দোলনের সময় এই হতভাগ্য লোকদের তালিকা তৈরি করা হয়। তারপর সেনাবাহিনীর লোকেরা ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। হিন্দুদের খুঁজে খুঁজে বের করা হচ্ছিল। কারণ শাসকগোষ্ঠী তাদেরকে মনে করতে ‘ভারতের অনুচর’ তারা পূর্ব বাংলার মুসলমানদের কলুষিত করে ফেলেছে। বাঙালি সামরিক পুলিশ বাহিনীর লোকদের অনুসন্ধান করার কারণ তারাই একমাত্র শিক্ষাপ্রাপ্ত দল, যারা সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ দিতে সমর্থ। অন্যদের গণহত্যার আওতাভুক্ত করার কারণ তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষাকে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার প্রতি প্রত্যক্ষ হুমকিস্বরূপ মনে করা হচ্ছিল। আমি চিন্তা করে দেখেছি যে, গণহত্যা ছিল ‘শোধন প্রক্রিয়া’ যাকে শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান বলে মনে করত। সেই সঙ্গে এই বর্বরোচিত উপায়ে প্রদেশটিকে উপনিবেশে পরিণত করাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। (দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ, অ্যান্টনি মাসকারেনহাস, অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, (১৯৮৯) পপুলার পাবলিশার্স পৃ: ১২৬)।

ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান সাহেবের নির্দেশে শরণার্থীদের পরিসংখ্যান ও ক্যাম্প তালিকা প্রস্তুত করা হয়। অক্টোবর মাসের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৯.৫ মিলিয়ন বা ৯৫ লাখ বাঙালি শরণার্থী বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারতের ৪টি রাজ্যে প্রবেশ করেছে। এদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ৭.১ মিলিয়ন বা ৭১ লক্ষ লোক (শরণার্থীর ৭৬ শতাংশ); ত্রিপুরায় ১.৪ মিলিয়ন বা ১৪ লক্ষ (শরণার্থীর ১৫ শতাংশ); মেঘালয়ে ০.৭ মিলিয়ন বা ৭ লাখ লোক (শরণার্থীর ৫ শতাংশ); আসামে ০.৩ মিলিয়ন বা ৩ লাখ (শরণার্থীর ৩ শতাংশ); সর্বমোট ৯.৫ মিলিয়ন বা ৯৫ লাখ শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। আমরা এর মূল্যায়ন করে দেখি যে, মে মাসে সর্বোচ্চ প্রতিদিন ১ লাখ ২ হাজার শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করেছে। জুন মাসে ৬৮ হাজার জন এবং এপ্রিল মাসে ৫৭ হাজার জন প্রতিদিন বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। ভারত সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের ৮২৭ শরণার্থী শিবিরে প্রায় ৬৮ লাখ এবং আত্মীয়স্বজন বা নিজস্ব আয়োজনে ৩১ লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে: অপপড়ৎফরহম ঃড় ড়ভভরপরধষ ংঃধঃরংঃরপং, নু ঃযব ংবপড়হফ বিবশ ড়ভ উবপবসনবৎ ১৯৭১ ধনড়ঁঃ ৬.৮ সরষষরড়হ বাধপঁববং যধফ নববহ যড়ঁংবফ রহ পধসঢ়ং ধহফ ধহড়ঃযবৎ ৩.১ সরষষরড়হ বিৎব ংঃধুরহম রিঃয ভৎরবহফং ধহফ ৎবষধঃরাবং. অং সধহু ধং ৮২৭ ংঃধঃব পধসঢ়ং ধহফ ১৯ ঈবহঃৎধষ পধসঢ়ং ধপপড়সসড়ফধঃবফ ড়হব ড়ভ ঃযব ষধৎমবংঃ সরমৎধহঃ সড়াবসবহঃং রহ যরংঃড়ৎু.

কেন্দ্রীয় সাহায্য ও পুনর্বাসন কমিটি গঠন ও কর্মসূচি :

বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের একটু পরিচিতি দেয়া প্রয়োজন। মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক সমিতির প্রচেষ্টায় ৩/১ ক্যামাক স্ট্রিটে কেন্দ্রীয় সাহায্য ও পুনর্বাসন কমিটি অফিসের দায়িত্ব নিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী। বিশেষভাবে সাহায্য করতেন ব্যারিস্টার বাদল রশীদ। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে এটাই সর্বপ্রথম সংযোগ রক্ষাকারী অফিস। ক্যামাক স্ট্রিটে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় ৪৫ প্রিন্সেস স্ট্রিটে অফিস স্থানান্তরিত করা হয়। মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ এবং পুনর্বাসনমন্ত্রী ছিলেন এ এইচ এম কামরুজ্জামান- চেয়ারম্যান, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী অনারারী মহাসচিব। কেন্দ্রীয় সাহায্য ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্য আব্দুল মালেক উকিল, মো. সোহরাব হোসেন, আব্দুর রব সেরনিয়াবত, ব্যারিস্টার বাদল রশীদ, আকরুজ্জামান বাবু (চট্টগ্রাম) প্রমুখ নেতৃবৃন্দ সার্বক্ষণিকভাবে কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

এই কেন্দ্রীয় সাহায্য ও পুনর্বাসন কমিটি প্রাথমিকভাবে অঘোষিত, স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে। এই কমিটির অধীনে ‘যুবঅভ্যর্থনা শিবির’ স্থাপন করা হলো। এগুলোর কাজ ছিল সীমান্ত অতিক্রম করে আসা যুবকদের জন্য আহার বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, ক্লাস নেয়া, শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য পিটিসহ অন্যান্য শারীরিক কসরত ও হালকা অস্ত্র পরিচালনা শিক্ষা করা। ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীকে এই দায়িত্ব পালনের জন্য মটিভেটর নিয়োগ, তাঁবু-বিছানা-বালিশ, কাপড়-চোপড়, রান্নার যাবতীয় সরঞ্জাম ও নিয়মিত রেশন সরবরাহ করতে হয়েছে। শিবির পরিচালক ও আমরা নিয়োগ করতাম। মহাসচিব হিসেবে তাঁকে এই শিবিরগুলোতে অর্থসহ যাবতীয় সরবরাহ প্রথমে সরাসরি এবং পরে জোনাল কাউন্সিলের মাধ্যমে করতে হতো।

এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় সাহায্য ও পুনর্বাসন কমিটি দায়িত্ব ছিল সীমান্ত বরাবর উদ্বাস্তু শিবিরগুলির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ভারত সরকারসহ বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্র এবং সাহায্যদাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা। উদ্বাস্তুদের কার্ড ও অন্যান্য বস্তু সরবরাহের দায়িত্ব আমাদেরই পালন করতে হতো। মূল কথা, যেহেতু এই সময় শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সরকারী কর্মচারীসহ বিভিন্ন স্তরের উদ্বাস্তুদের রিলিফের প্রয়োজন ছিল সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এই অফিসকে সবদিকেই দৃষ্টি রাখতে হতো।

যুব অভ্যর্থনা শিবির ছাড়াও তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনী, ইপিআর, আনসার মুজাহিদ যারা প্রথম থেকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত ছিলেন (কারণ তারা ছিলেন শিক্ষাপ্রাপ্ত এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল না) তাদের শিবিরগুলোর দায়িত্বও আমাদের মন্ত্রীকে নিতে হয়েছে, তাদের কাপড়-চোপড়, খাওয়া-দাওয়াসহ যাবতীয় সরবরাহ আমাদেরই করতে হয়েছে। এরপর এসেছে ‘যুব শিবির’ প্রকল্পটির ধারণা। এর মূল উদ্ভাবক ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ডঃ ত্রিগুনা চরণ সেন। স্থির হলো যুব অভ্যর্থনা শিবির থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বাছাই করে এই যুব শিবিরে আনতে হবে। সেখানে উচ্চতর মোটিভেশনসহ মাঝারি ধরনের অস্ত্র পরিচালনা প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেখান থেকে সরাসরি তাদেরকে অস্ত্র দিয়ে গেরিলা হিসেবে দেশের ভেতরে প্রেরণ করা হবে কিংবা কেউ যদি আরো উচ্চতর ভারী অস্ত্রের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে চায়, তাদের জন্য ভারতের বিভিন্ন স্থানে ‘প্রশিক্ষণ শিবির’ নামে আরো কয়েকটি শিবির স্থাপন করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা অঞ্চলের যুব অভ্যর্থনা শিবিরগুলোর দায়িত্ব আওয়ামী লীগের এমএনএ ও এমপিদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। এসব যুব শিবির সরাসরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এগুলোতে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মেজর পর্যায়ের অফিসারবৃন্দ। এগুলোর পরিচালনা ও নিয়োগের জন্য গঠন করা হয় ‘ইড়ধৎফ ড়ভ ঈড়হঃৎড়ষ ণড়ঁঃয ঈধসঢ়ং’। অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। সদস্য ছিলেন (১) ড. মফিজ চৌধুরী, (২) ক্যাপ্টেন করীম, (৩) শ্রী গৌর চন্দ্র বালা। সচিব ছিলেন তৎকালীন সিএসপি নূরুল কাদের খান। ডিজি ছিলেন উইং কমান্ডার এস আর মির্জা, ডাইরেক্টর ছিলেন আহামদ রেজা। এর অফিস ছিল ৮নং থিয়েটার রোড, মুজিবনগর কেন্দ্রীয় অফিস ভবনে।

ত্রাণমন্ত্রী কামারুজ্জামান সাহেব এবং অধ্যাপক ইউসুফ আলী প্রায় এই ‘যুব অভ্যর্থনা শিবির’ এবং ‘যুব শিবিরগুলো’ পরিদর্শন করতেন। এ জন্য সার্বক্ষণিকভাবে একটি হেলিকপ্টার নির্দিষ্ট করা ছিল। চব্বিশ পরগনা জেলার হাসনাবাদ টাকী থেকে শুরু করে পূর্বাঞ্চলের আরগতলা সাবরুম পর্যন্ত সীমান্ত বরাবর দীর্ঘ এলাকাব্যাপী এই সব শিবির স্থাপিত ছিল। সুতরাং এগুলোর পরিদর্শন কাজ খুব সহজসাধ্য ছিল না।

লেখক : সংগঠক-মুক্তিযোদ্ধা, মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার একজন সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জনসংযোগ অফিসার, শরণার্থী বিষয়ক বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

:: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী

বিজয় দিবস : বিশেষ আয়োজন ২০১৪'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj