×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

জাতীয়

রাসেল ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া কোথা থেকে এলো, কিভাবে ছড়ালো, কতটা ভয়ঙ্কর এই সাপ

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৪, ০৮:৪৩ পিএম

রাসেল ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া কোথা থেকে এলো, কিভাবে ছড়ালো, কতটা ভয়ঙ্কর এই সাপ

দেশের ২৭ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে রাসেল ভাইপার। ছবি: সংগৃহীত

দেশের ২৭ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে রাসেল ভাইপার। সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে পদ্মা নদীর তীরবর্তী জেলাগুলোতে। ইতোমধ্যে রাজশাহী, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ, চাঁদপুর, হাতিয়া, ভোলাতে এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এতে গ্রামগঞ্জে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সবমিলিয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় উঠে এসেছে বিষধর সাপটি।

যেসব দেশে রাসেল ভাইপার দেখা যায়

চট্টগ্রামের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারত, ভুটান, থাইল্যান্ড, নেপাল, কম্বোডিয়া, চীন ও মিয়ানমারে রাসেল ভাইপারের উপস্থিতি রয়েছে। সাধারণত ঝোপ, ঝাড়, বন, জঙ্গল ও ফসলের খেতে বিচরণ করে এই সাপ।

যেভাবে নামকরণ হলো রাসেল ভাইপার

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে আসেন স্কটিস সার্জন প্যাট্রিক রাসেল। ১৭৯৬ সালে সাপ সম্পর্কে গবেষণা করেন তিনি। তার নাম অনুসারে এই সাপের নামকরণ করা হয় ‘রাসেল ভাইপার’। তবে স্থানীয়ভাবে চন্দ্রবোড়া ও উলুবোড়া নামে পরিচিতি এটি। বাংলাদেশে প্রায় ১০০ বছর ধরে এই সাপের অস্তিত্ব রয়েছে। ২০১৩ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা রাসেল ভাইপারের কামড় খাওয়া প্রথম রোগী পান।

রাসেল ভাইপারের ব্যুৎপত্তি

ভারতের অনেক সাপের বর্ণনা করেছিলেন প্যাট্রিক রাসেল। যার মধ্যে অন্যতম চন্দ্রবোড়া ও উলুবোড়া। হিন্দি শব্দ থেকে এসেছে এটি। যার অর্থ ‘যা লুকিয়ে আছে’, বা ‘লুক্কায়িত’।

রাসেল ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপ। ছবি: সংগৃহীত

রাসেল ভাইপার চিনবেন যেভাবে

রাসেল ভাইপারের মাথা চ্যাপ্টা, ত্রিভুজাকার এবং ঘাড় থেকে আলাদা। থুতু ভোঁতা, গোলাকার ও উত্থিত। নাকের ছিদ্র বড় এবং চোখ বড় ও হলুদ। শরীরে বাদামী দাগ থাকে। এই দাগের প্রত্যেকটির চারপাশে একটি কালো বলয় রয়েছে। রাসেল ভাইপারের দেহ ও লেজ ১৬৬ সেন্টিমিটার (৬৫ ইঞ্চি) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে গড় প্রায় ১২০ সেন্টিমিটার (৪৭ ইঞ্চি)। দ্বীপগুলোতে এটি গড়ে কিছুটা ছোট।

আরো পড়ুন: আতঙ্কের নাম 'রাসেল ভাইপার', দংশন করলে কী করবেন কী করবেন না

রাসেল ভাইপারের আচরণ ও বাস্তুবিদ্যা

রাসেল ভাইপার প্রাথমিকভাবে নিশাচর প্রাণী হিসেবে পরিচিত। তবে শীতল আবহাওয়ায় এটি দিনের বেলা সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রাপ্ত বয়স্ক এই সাপ ধীরগতির ও অলস হয়। সাধারণত, প্ররোচিত না হলে আক্রমণ করে না। এটি বিদ্যুৎ গতিতে আঘাত করতে পারে। রাসেল ভাইপার এত বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, যে প্রক্রিয়ায় বড় ব্যক্তিরা মাটি থেকে উঠতে পারে। এই আচরণ প্রায়ই ভুল ধারণার জন্ম দেয়, এটি মানুষকে ‘তাড়া’ করে ও কামড়ায়।

রাসেল ভাইপারের খাবার

রাসেল ভাইপার প্রাথমিকভাবে ইঁদুর খায়। যদিও এটি ছোট সরীসৃপ, ভূমি কাঁকড়া , বিচ্ছু এবং অন্যান্য আর্থ্রোপডও খেতে পারে। ছোট অবস্থায় ক্রেপাসকুলার হয়। সেসময় টিকটিকি খায়। যখন তারা বড় ও প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তখন ইঁদুরের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে ইঁদুর ও টিকটিকির উপস্থিতি মানুষের বাসস্থানের প্রতি তাদের আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ।

আরো পড়ুন: রাসেলস ভাইপার দেখলেই যোগাযোগ করবেন যেসব নাম্বারে

রাসেল ভাইপার যেভাবে বাংলাদেশে এলো

বর্ষাকালে ভারতের নদ-নদী থেকে ভেসে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে রাসেল ভাইপার। ছবি: সংগৃহীত

২০১৮ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বল্প সংখ্যক রাসেল ভাইপার রয়েছে। কিন্তু বংশবিস্তারের মতো পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত খাদ্য না থাকায় এই সাপের উপস্থিতি তেমন বোঝা যায়নি।

গবেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে রাসেল ভাইপারের সংখ্যা বেড়েছে। যার অন্যতম কারণ একই জমিতে একাধিক ফসল ফলানো। আগে বছরে একবার বা দুইবার ফসল ফলানো হতো। আর বাকি সময় পানির অভাব থাকায় পরিত্যক্ত থাকতো। ’৯০ দশকে সেচ পদ্ধতির উন্নতিতে প্রতিবছর দুই থেকে তিনটি ফসল ফলানো শুরু করেন কৃষকরা। ফলে জমি কম সময় পরিত্যক্ত থাকে। তাতে সারা বছর খেতে ফসল থাকে। সঙ্গত কারণে জমিতে ইঁদুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যা রাসেল ভাইপারের প্রধান খাদ্য। ফলে বিষধর সাপের সংখ্যা বেড়ে যায়। মূলত, বেশিরভাগ সাপ ডিম পাড়ে। তবে রাসেল ভাইপার বাচ্চা দেয়। একটি স্ত্রী ভাইপার ২০ থেকে ৪০টি বাচ্চা দেয়। তবে ৮০টি পর্যন্ত দেয়ার রেকর্ডও রয়েছে।

রাসেল ভাইপার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বর্ষাকালে ভারতের নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। এসময় সেগুলো থেকে ভেসে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে রাসেল ভাইপার। সাধারণত, যেসব জায়গায় কচুরিপানা রয়েছে, সেসব স্থানে বাসা বাঁধে এটি। তাদের ধারণা, কচুরিপানার ওপরে ভেসে বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছেছে এই সাপ।রাসেল ভাইপার কতটা ভয়ঙ্কর বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে রাসেল ভাইপারের দংশনের হার তুলনামূলক কম। তবে ভারতে প্রতিবছর মোট সর্প দংশনের অন্তত ৪৩ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ রাসেল ভাইপার ঘটায়।

চিকিৎসকরা বলছেন, এই সাপের বিষক্রিয়া মারাত্মক। এটি দংশনের পরে শরীরে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। পাশাপাশি আক্রান্ত জায়গা দ্রুত ফুলে যায়। দ্রুত চিকিৎসা না করলে নিম্ন রক্তচাপ, কিডনি অকার্যকর হতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০১৯ সালে এক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর অন্তত ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। আর কমপক্ষে ৬ হাজার মানুষ মারা যান। সংস্থাটি বলেছে, গোখরো-কেউটের চেয়েও বিষধর রাসেল ভাইপার। এই সাপের দংশনে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও প্রতি তিনজনে একজন মারা যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। 

রাসেল ভাইপারের অ্যান্টিভেনম আছে কি?

বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর কিংবা বিষ নিষ্ক্রিয় করার উপাদানকে ‘অ্যান্টিভেনম’ বলে। ছবি: বিবিসি
বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর কিংবা বিষ নিষ্ক্রিয় করার উপাদানকে ‘অ্যান্টিভেনম’ বলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের (এসেনশিয়াল ড্রাগ) তালিকাভুক্ত এটি। তবে বাংলাদেশে উৎপাদন হয় না। ভারত থেকে আনতে হয় এটি। সংস্থাটি জানিয়েছে, স্থানীয় সাপ থেকে তৈরি অ্যান্টিভেনম সবচেয়ে কার্যকর। একেক দেশের সাপের প্রকৃতি একেক রকম। ফলে অন্য দেশের অ্যান্টিভেনম এদেশে শতভাগ কার্যকর নাও হতে পারে। 

রাসেল ভাইপার কামড়ালে করণীয়

রাসেল ভাইপারের কামড়ে দাঁত বসে গেলে শরীরের ক্ষতস্থানসহ ওপর-নিচের জায়গা হালকা করে ব্যান্ডেজ দিয়ে পেঁচিয়ে দিতে হবে। ছবি: বিবিসি

রাসেল ভাইপার দেখতে অনেকটা ছোট অজগরের মতো। এটি শুকনো পাতার নিচে ও ঝোপ–জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। এজন্য ধানখেত বা ফসলি জমিতে কাজে নামার আগে কৃষকদের লম্বা বাঁশ দিয়ে জায়গাটি নাড়িয়ে নিতে হবে। এছাড়া গামবুট ও জিনসের ট্রাউজার পরে নামলে নিরাপদ থাকা যাবে। চিকিৎসকদের মতে, রাসেল ভাইপারের কামড়ে দাঁত বসে গেলে শরীরের ক্ষতস্থানসহ ওপর-নিচের জায়গা হালকা করে ব্যান্ডেজ দিয়ে পেঁচিয়ে দিতে হবে। নড়াচড়া করা যাবে না। রোগীকে সাহস দিতে হবে। হাঁটা-চলাচল একেবারেই বন্ধ করতে হবে। যাতে রক্ত চলাচল কম হয়। সর্বোপরি, যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে। 

রাসেল ভাইপার ভিডিও :



টাইমলাইন: রাসেলস ভাইপার

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App