×

জাতীয়

স্যানিটেশনে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ছে নারী ও কিশোরীদের

Icon

রুমানা জামান ও ইমরান রহমান, খুলনা থেকে

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:৫৮ পিএম

স্যানিটেশনে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ছে নারী ও কিশোরীদের

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজের পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহের কাজটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরাই করে থাকেন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সুপেয় পানির অভাব রয়েছে, সেখানে পানি সংগ্রহে নারীদের দায়বদ্ধতা পুরুষদের তুলনায় বেশি। এই কাজে দুর্ভোগের পাশাপাশি হয়রানিরও শিকার হতে হয় তাদের। একইসঙ্গে নারী ও কিশোরীরা স্কুলে ও বাড়ির বাইরে টয়লেট ব্যবহার করার সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনিরাপদ বোধ করেন এবং স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতির প্রভাব ও বৈষম্যর শিকার হন।

সুইডেন দূতাবাসের অর্থায়নে ‘ওয়াটারএইড’ এর করা ‘জেন্ডার অ্যাসেসমেন্ট : ফোকাসিং অন জেন্ডান ট্রান্সফরমেটিভ ওয়াশ’ বিষয়ক জরিপে দেখা গেছে জলবায়ু পরিবর্তন, সুপেয় পানির অভাব, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট না থাকা, অভিভাবকদের অসচেতনতা, সামাজিক রীতি, জেন্ডার বৈষম্য ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতায় নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সরকারের সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সমাজের সব স্তরের মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মনে করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়াটারএইড। 

মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে খুলনা শহরের হোটেল সিটি ইনে ‘জেন্ডার ট্রান্সফরমেটিভ ওয়াস’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এ বিষয়ে জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। খুলনা সিটি করপোরেশন ও পাইকগাছা পৌরসভার তথ্য নিয়ে আয়োজিত হয় এ বৈঠক, জরিপে উঠে এসেছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারী ও মেয়েদের পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যা তাদের পড়াশোনা, কাজ ও অবসর যাপনের সময় কমিয়ে দেয় এবং পথে তাদের শারীরিক আঘাত পাওয়া ও বিপদে পড়ার ঝুঁকিতে ফেলে। তাছাড়া খুলনা অঞ্চলের বস্তিতে বসবাসরত নারীরা এখনো অন্য পরিবারের সঙ্গে স্যানিটেশন সুবিধা ভাগাভাগি করে, যা এখানকার নারী ও কিশোরীদের গোপনীয়তা, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে।

এছাড়াও খুলনা জেলার পাইকগাছাসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় বাড়িতে বা স্কুলে অপর্যাপ্ত ‘ওয়াশ’ পরিষেবা নারী ও মেয়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে; নিরাপদে ও ব্যক্তিগতভাবে তাদের মাসিক ব্যবস্থাপনার সামর্থ্যকে সীমিত করে তুলছে। উপাত্ত পাওয়া যায় এমন ৫১টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারী ও কিশোরী এবং যারা শারীরিকভাবে অক্ষম তাদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক পরিচ্ছন্নতা ও পোশাক বদলের জন্য উপযুক্ত স্থান থাকে না।

ভোরের কাগজের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র-৩ অ্যাডভোকেট মেমোরি সুফিয়া রহমান শুনু, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা অফিসার আবিরুল জব্বার, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান সংরক্ষণ অফিসার মো. আনিসুর রহমান, খুলনা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মুনতাশায়ের মামুন, খুলনা সিটি করপোরেশনের সহকারী সংরক্ষণ অফিসার নুরুন্নাহার এ্যানি ও জেন্ডার এন্ড সোস্যাল ইনক্লুশন এক্সপার্ট হোসনে আরা বেগম।

এছাড়া জেলা সমাজকল্যাণ বিভাগের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রুহুল আমিন, খুলনার কোতোয়ালি থানার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুল মমিন, খুলনার খান জাহান আলী থানার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. রুমানা ইয়াসমিন, রুপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম, গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশনের আঞ্চলিক পরিচালক চাঁদ সুলতানা, (পি ডাব্লিউ ডি) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লিয়াকত হোসেন, খুলনা রেলওয়ে মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোনিয়া রহমান, দারুল কোরআন দাখিল মাদ্রাসার সুপার আশিক পারেজ শিল্পী, কমিউনিটি বেইজ অর্গানাইজেশন (সিবিও) সদস্য নাসিমা, সিবিও সদস্য মিকি, পাইকগাছা পৌরসভার প্যানেল মেয়র মাহাবুবুর রহমান রঞ্জু, পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (ইউএইচএফপিও) ডা. নীতেশ চন্দ্র ড. গোল্ডার, পাইকগাছা উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সাহাজাহান আলী শেখ, নবলোক নির্বাহী পরিচালক কাজী রাজীব ইকবাল, ওয়াটারএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান, উন্নয়ন সহযোগিতার প্রধান মারিয়া স্ট্রিডসম্যান, ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার (জলবায়ু ও পরিবেশ) মোস্তাফিজুর রহমান এতে অংশ নেন।

জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ৪১ দশমকি ৬ শতাংশ কারণ হিসাবে অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বলেছেন; যেমন অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য বা সীমিত সুযোগ। ৭ দশমিক ১ শতাংশ শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতাকে বৈষম্যের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাছাড়া ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা যারা নিজেদের প্রান্তিক মনে করেন; এই সব বৈষম্য তাদের জেন্ডার পরিচয় থেকে উঠে এসেছে। আবার জরিপে বলা হয়, ৭৫ শতাংশ নারী এবং কমবয়সি মেয়েরা পানি সংগ্রহের মূল বোঝা বহন করে এবং ৭৯ শতাংশ নারী তাদের পরিবারের স্বাস্থ্যবিধির দায়িত্ব পালন করে। এদের ৬৩ শতাংশেরই নারী-বান্ধব টয়লেট সুবিধা নেই। তাছাড়া প্রায় সব উত্তরদাতা (৯৩ শতাংশ) মাসিককালীন যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার অভাবের কথা জানিয়েছেন। নিকটবর্তী পানির উৎসে নারীদের সীমিত যাতায়াত (৫৭ দশমিক ৯ শতাংশ) একটি বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাছাড়া, পানির উৎস দূরে থাকা মেয়েদের স্কুল উপস্থিতির পথে বাধা সৃষ্টি করে (১৬ শতাংশ) এবং মাসিককালীন পণ্যসমূহের সাশ্রয়ীতা এবং প্রাপ্যতা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।

নারী ও পুরুষের সামাজিক ভূমিকার কথা মাথায় রেখে ৮৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন গৃহস্থালির কাজ এবং পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করা নারীদের মাসিক নিয়ে কথা বলা এখনো একটি লজ্জাজনক বিষয় হিসেবে দেখা হয়। উত্তরদাতাদের অধিকাংশই (৯৬ শতাংশ) পরিবারের বয়স্ক পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে মাসিক নিয়ে কোনো কথা বলেন না। নারী ও পুরুষ উভয়েই পরিবারের নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন; তবে এর মধ্যে পুরুষদের মতামতই অগ্রাধিকার পায় যা জেন্ডার বৈষম্যের দিকটিই চিহ্নিত করে। কমিউনিটি এবং স্কুল পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তেও নারীর সম্পৃক্ততা সীমিত।

জরিপ বলছে, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা। পানি সংগ্রহের সময় ৬৬% উত্তরদাতা অপব্যবহার এবং ১৪% উত্তরদাতা শারীরিক আক্রমণের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এর ৯৯% ঘটনাই কেউ কখন রিপোর্ট করেনি। ৭৫ দশমিক ৪৬% নারী উত্তরদাতা সঠিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত। তবে, ৬০ শতাংশই স্বাস্থ্যবিধি সচেতনতা প্রসারে নেতৃত্বমূলক কিংবা কোনো ক্যাম্পেইনে সক্রিয় অংশ নেয়ার জন্য সমর্থন পান না। ৭৫% উত্তরদাতার মতে, পুরুষরাই প্রধানত পানি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ এবং ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন। যার ফলে নারীদের প্রতি হয়রানি ও সহিংসতা বাড়ে এবং স্বাস্থ্যবিধির ক্ষেত্রে অভিগম্যতা হয় সীমিত। পানি সম্পদে নারী পুরুষের এই বৈষম্যের পেছনে কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে নারীদের দূরবর্তী উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করা, সমাজে তাদের চলাচলে নানা বিধিনিষেধ এবং দারিদ্র্যতা।

জরিপে পাওয়া তথ্য তুলে ধরে জেন্ডার এন্ড সোস্যাল ইনক্লুশন এক্সপার্ট হোসনে আরা বেগম বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ে নারী ও শিশুরা স্বাস্থ্যগত দিকে থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সামাজিক কাঠামোতে সব ধরনের বৈষম্য ও চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করেই আমাদের এ জেন্ডারভিত্তিকি জরিপটি করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ওয়াটার স্যানিটেশন হাইজিন, এটা কেবল একটি অধিকার নয়, আরো বেশ কিছু অধিকার রয়েছে যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাইজিন অধিকারের সঙ্গে জড়িত। 

হোসনে আরা বেগম বলেন, সুপেয় পানির জন্য তাদের দূর থেকে দূরান্তে ছুটতে হয়। খুলনা পাইকগাছায় কমিউনিটির বাইরে গিয়ে তাদের পানি আনতে হয়। দূরত্ব ৫শ থেকে ১ হাজার মিটারের মধ্যে। প্রতিবার পানি আনতে গিয়ে তাদের ৩০ মিনিট সময় লাগে। দিনে ৭ থেকে ৮ বার পানি আনতে হয়। স্যানিটেশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে এরা এখনো পুরনো আমলের ‘হাইজিং লেভেলের স্যানিটেশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। নারীদের সকাল বেলা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বাথরুমে যেতে হয়; এটা তাদের জন্য বিভ্রান্তিকর। কয়েকজন মিলে একই গোসলখানায় গোসল করতে হয়, এসব গোসলখানার দরজা নেই; থাকলেও ভাঙ্গা, ফলে তাদের নিরাপত্তার জায়গায় বেশ ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ে মেয়েদের মাসিকের সময় এখনো স্যানিটেশন প্যাড ব্যবহার করার মতো সামর্থ্য নেই।

তিনি বলেন, স্বল্প আয়ের কমিউনিটিতে স্যানিটেশনের সুবিধা এখনো পর্যন্ত নেই। টয়লেটে পানি না থাকায় মেয়েরা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বাথরুম না গিয়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বাথরুম চেপে থাকে। ফলে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। নানা রকম রোগব্যাধি বাসা বাঁধছে শরীরে। শুরু তাই নয় এ অঞ্চলের বাড়িতে গর্ভবতী মায়ের জন্য ভিন্ন টয়লেটের সুবিধা নেই, স্কুলে টয়লেট থাকলেও পানি নেই, বাইরে থেকে নিতে হয়। ফলে মেয়েদের টয়লেট বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। টয়লেট এমন জায়গায় স্থাপন করা হয় রাতের বেলা একটা মেয়ের জন্য অনিরাপদ। তাছাড়া সমাজ এখনো মনে করে, পিরিয়ড হলে এক মস্ত অসুবিধা। এ কথা পুরুষের সঙ্গে আলাপ করা করা যায় না। তাছাড়া পরিবারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তই নারীরা নিতে পারেন না। বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি, কোথায় কত খরচ হবে; এসব গুরত্বপূর্ণ বিষয়ে পুরুষ সিন্ধান্ত নারীর কাছে ছাড়েন না। সরকারের পলিসির সঙ্গে জেন্ডার ট্রান্সফরমেটিভের পলিসিগত অনেক দূরত্ব রয়েছে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৩ বছর। ১৯৭৭ থেকে ৮৮ পর্যন্ত আমি সিটি করপোরেশনের একজন কাউন্সিলর, তখন পুরো অঞ্চলে কোনো স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ছিল না। সে সময়ে এখানকার জনগণকে কেউ সচেতন করেনি, সবাই কাঁচা টয়লেট ব্যবহার করত। এখন সেই চিত্র আর নেই। তিনি বলেন, আমি সিটি কপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করছি, তবে জায়গার পরিমাণ কম। রাস্তার পাশে কম জায়গা থাকার কারণে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা সম্ভব হয় না। তবে আগামীতে নারী পুরুষ সবাই যেন নিরাপদ টয়লেট ব্যবহার করতে পারে- এটা মাথায় রেখেই আমরা পরিকল্পনা করছি।

মেয়র বলেন, ওয়াসার পানি বিভিন্ন বাড়িতে সংযোগ দেয়; কিন্তু যে বস্তিগুলো রয়েছে, সেখানেও সুপেয় পানির প্রয়োজন। অথচ বস্তিগুলো স্থায়ী না হওয়ার কারণে পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ওয়াসার পক্ষ থেকে বস্তিবাসীকে পর্যাপ্ত পানির সুবিধা দেয়া হচ্ছে। নগরবাসীর স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তায় জোর দিয়ে আগামী দিনের উন্নয়ন এগিয়ে নেয়া হবে বলেও নিশ্চয়তা দেন মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক।

ভোরের কাগজের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। ফলে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে; সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে চলছি আমরা। এই অগ্রযাত্রায় প্রতিটি কাজই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সবার খেয়াল রাখা জরুরি, আমরা যে কাজগুলো করছি, তা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদেরও কাজে আসবে তো? তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কেউ পিছিয়ে থাকবে না। ফলে খেয়াল রাখা অতি জরুরি- নতুন যে স্কুলটি নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে নারীর জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন টয়লেট রাখা হয়েছে কিনা। এমনকি বস্তিগুলোতেও সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সব এলাকার ভূমি একরকম নয়। কোথাও পাহাড়, কোথাও উপকূল। ভূমির এমন বৈচিত্র্য বিবেচনায় নিয়ে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা মাথায় রেখে দেশের সব জায়গায় সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে। এটি বিবেচনায় নেয়া হয় না বলেই, পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সুপেয় পানি থাকে না। হাসপাতাল আছে, ডাক্তার আছে, ওষুধ আছে, কিন্তু সুপেয় পানি নেই। এটা খুবই দুঃখজনক। এই বিষয়গুলো মাথায় রাখলে, উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে বিশ্বাস করি।

সিডার উন্নয়ন সহযোগিতার প্রধান পরামর্শদাতা মারিয়া স্ট্রিডসম্যান বলেন, প্রান্তিক নারীর স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- জলবায়ু পরিবর্তন। কারণ, প্রতিনিয়তই তারা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ‘ওয়াস’ ঝুঁকির কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ রোগাক্রান্ত হচ্ছে। তাই ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়নে ওয়াস সেক্টরে সঠিক পরিকল্পনা সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে দেখা গেল একটি অঞ্চলের ৮০ শতাংশ নারী পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে দুর্ভোগের শিকার হোন। অর্থাৎ একটি এলাকায় প্রায় সব নারীই এমন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

সিডার এই উন্নয়ন পরামর্শকের ভাষ্য- (correct it) পানি সংগ্রহের জন্য একটি মেয়ের একটি করে ধাপ এগিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো পড়াশোনা, খেলাধুলা ও নিরাপত্তা থেকে তার একটি করে ধাপ দূরে সরে যাওয়া। অনিরাপদ পানি, অনিরাপদ টয়লেট ও বাড়িতে হাত ধোয়ার অনিরাপদ ব্যবস্থা মেয়েদের কাছ থেকে তাদের সম্ভাবনা কেড়ে নেয়, তাদের সার্বিক কল্যাণকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং দারিদ্র্যের চক্রকে স্থায়ী করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে আরো জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। একইসঙ্গে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বলদাতে হবে।

ওয়াটারএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান বলেন, নারীকে এগিয়ে নিতে সবার আগে নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। পরিবারে সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। তবেই সমাজে সত্যিকারে পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, প্রান্তিক নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির দিকে জনপ্রতিনিধিদের নজর নেই। বস্তিতে একটা টয়লেট করতে গেলে টাকার সমস্যা দেখা দেয়, তখন এনজিওকে খোঁজা হয়; কিন্তু এনজিওর কাজ তো কেবল সরকারকে সহায়তা করা। স্কুলগুলোতেও একই অবস্থা; পানি নেই, অস্বাস্থ্যকর টয়লেট। যার ফলে শিক্ষার্থীরা দিন দিন স্কুল বিমুখ হচ্ছে। কাজেই শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যারা যুক্ত রয়েছেন- তাদের সচেতন হতে হবে। প্রতিটি স্কুলের সুপেয় পানি, টয়লেটসহ সব রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে সরকারি বরাদ্দ আসে সেটা যথাযথ জায়গায় ব্যবহার করতে হবে। ওয়াটারএইড, নবলোক ও সিটি করপোরেশন সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামীতে নারীর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আরো সুফল মিলবে।

নবলোকের নির্বাহী পরিচালক রাজীব ইকবাল বলেন, নবলোক ‘উইমেন ইন পাওয়ার’ নিয়ে কাজ করে। শুধু তাই নয়, এখানে সব ক্ষেত্রেই নারীকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়। তিনি বলেন, আজকের এই গোলটেবিল আলোচনা থেকে আসা সবার মতামত ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শগুলো নবলোকের আগামী দিনের পরিকল্পনায় কাজে আসবে।

সিডার জাতীয় প্রোগ্রাম অফিসার (জলবায়ু ও পরিবেশ) (correct it) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই প্রকল্পে তিনটি অবজেকটিভ ছিল- সামাজিক ইকোলিটি, সুবিধাগুলো নারী পুরুষভেদে সবাই কীভাবে পাবে, এই প্রকল্পে সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করানো। একই সঙ্গে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল কীভাবে পাওয়া যায় সে বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে। তবে যে সমস্যাগুলো সমানে এসেছে- সেগুলোর সমাধান আমাদের হাতেই রয়েছে। নারী-পুরুষ বিভেদহীন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App