ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা, কে এই মুজতবা খামেনি?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি। ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিনেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এরপর তার দ্বিতীয় ছেলে মুজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
৫৬ বছর বয়সী কট্টরপন্থী এই ধর্মীয় নেতার বাবা নিহত হওয়ার সময় হামলায় তার মা, স্ত্রী ও এক বোনও মারা যান। তবে মুজতবা খামেনি ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না এবং এখন পর্যন্ত চলমান তীব্র বোমাবর্ষণ থেকে তিনি বেঁচে গেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনকারী ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় পরিষদ ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস দেশবাসীকে ঐক্য বজায় রাখা এবং মুজতবা খামেনির নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।
রোববার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে পরিষদটি জানায়, নির্ণায়ক ভোটের মাধ্যমে তাকে নির্বাচিত করা হয়েছে। এতে ইরানিদের, বিশেষ করে মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেম ও বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়।
মুজতবা খামেনি কখনো নির্বাচনে অংশ নেননি বা জনভোটের মুখোমুখি হননি। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি সাবেক সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে প্রভাবশালী ছিলেন এবং আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকে তার বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবেও দেখা হচ্ছিল। প্রায় আট বছর প্রেসিডেন্ট থাকার পর এবং ৩৬ বছর ধরে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থাকার পর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তার বাসভবনে হামলায় নিহত হন।
মুজতবা খামেনির ক্ষমতায় আসার বিষয়টিকে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোয় কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এখনও শক্তিশালী বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে স্বল্পমেয়াদে কোনো সমঝোতা বা আলোচনায় যাওয়ার ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ কম থাকতে পারে।
উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে মুজতবা খামেনি কখনো প্রকাশ্যে কথা বলেননি। কারণ তার নেতৃত্বে আসা হলে তা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগে বিদ্যমান পাহলভি রাজতন্ত্রের মতো এক ধরনের পারিবারিক শাসনের ধারণা তৈরি করতে পারে।
তিনি সাধারণত খুব নিচু প্রোফাইল বজায় রাখেন। প্রকাশ্যে খুব কমই বক্তৃতা দেন, জুমার খুতবা বা রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন না। ফলে বহু ইরানি তার নাম জানলেও তার কণ্ঠস্বর পর্যন্ত কখনো শোনেননি।
প্রায় দুই দশক ধরে দেশি-বিদেশি বিরোধীরা মুজতবা খামেনির বিরুদ্ধে ইরানের বিক্ষোভ দমনে সহিংস ভূমিকার অভিযোগ করে আসছে। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গড়ে ওঠা গ্রিন মুভমেন্ট চলাকালে সংস্কারপন্থীরা প্রথম তার বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ বাহিনী ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনের অভিযোগ তোলে। ওই নির্বাচনে জনতাবাদী রাজনীতিক মাহমুদ আহমাদিনেজাদ পুনর্নির্বাচিত হন।
এরপর বিভিন্ন সময়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ দমনে বাসিজ বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দুই মাস আগে হওয়া আন্দোলনে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ৮ ও ৯ জানুয়ারির রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত হয়। অন্যদিকে ইরানের সরকার ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা এসব ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজদের দায়ী করে এসেছে।
মুজতবা খামেনি তরুণ বয়সেই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৯৮০ এর দশকে ইরান–ইরাক যুদ্ধ চলাকালে তিনি বাহিনীর হাবিব ব্যাটালিয়নে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেন। তার অনেক সহযোদ্ধা পরবর্তীতে ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান।
মুজতবা খামেনির বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন দেশে সম্পদ জড়িত একটি বড় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কও তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তার নাম সরাসরি কোনো লেনদেনে দেখা না গেলেও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ক্ষমতাসীন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বহু বছর ধরে বিপুল অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে।
আরো পড়ুন : ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে তাকে ব্যবসায়ী আলি আনসারির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। গত বছর আনসারির ব্যাংক আয়ান্দেহ দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ব্যাংকটির লোকসান মেটাতে সরকারি অর্থ ব্যবহার করতে হওয়ায় ইরানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে খামেনি বা আনসারি কেউই এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে অস্বীকার করেনি বা কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় মর্যাদার দিক থেকেও বিতর্ক রয়েছে। তিনি হুজ্জাতুল ইসলাম পদমর্যাদার মধ্যম পর্যায়ের আলেম, আয়াতুল্লাহ নন। তবে তার বাবাও ১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় আসার সময় আয়াতুল্লাহ ছিলেন না; পরে আইন পরিবর্তন করে তাকে সেই পদে বসানো হয়। মুজতবা খামেনির ক্ষেত্রেও এমন সমাধান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র বোমা হামলার মধ্যেই ইরানে আবারও দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ ও তথ্যপ্রবাহে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
