যে কারণে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের কাছে মার খেল বিজেপি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ০৫:৩৩ পিএম
পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত
ভারতে সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে ৭ দফায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। নির্বাচন শুরুর দেড় মাস পর মঙ্গলবার প্রকাশিত হয় ফলাফল। শীর্ষস্থানীয় সব বুথফেরত সমীক্ষায় বিজেপিকে রাজ্যের একক বৃহত্তম দল হিসেবে দেখানো হলেও বিভিন্ন বুথফেরত সমীক্ষাকে ভুল প্রমাণ করে রাজ্যের ৪২ আসনের মধ্যে ২৯টি আসনে জয় পেয়েছেন মমতা। জয় পাওয়া প্রতিটি আসে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ভোটের ব্যবধানও অনেক। রাজ্যটিতে বিজেপি জয় পেয়েছে মাত্র ১২টি আসনে।
কলকাতায় সুবিধা করতে পারেনি বিজেপি। ছবি: সংগৃহীতযেভাবে বেড়েছে তৃণমূলের আসন
২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূল জোর ধাক্কা খায়, উত্থান হয় বিজেপির। তখন ২২টি আসনে জয় পায় ঘাসফুল শিবির। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেই ঘুরে দাঁড়ায় তারা। পরবর্তীতে সেই ধারা বজায় রেখে লোকসভা ভোটেও জয় পায় তারা।
এই ভোটে প্রায় ৩০টি আসনে জয় পেয়েছে তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের প্রাপ্ত ভোটের হারও তুলনামূকভাবে বেড়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনে তাদের ৪৩ শতাংশ ভোট বৃদ্ধির পর এবার ভোট বেড়েছে ৪৬ শতাংশ।
খারাপ ফল বিজেপির
বিজেপি গত লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসনে জয় পায়। ২০১৪ সালের থেকে ১৬টি বেশি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে তাদের ফল সবচেয়ে ভালো হবে। এই দাবিও এবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
বিজেপি গতবারের তুলনায় ৮টির মতো আসন কম পেতে চলেছে। তাদের মোট প্রাপ্ত ভোটও অনেকটাই কমেছে। গত লোকসভায় বিজেপি ৪০ শতাংশ ভোট পেলেও এবার তাদের ভোট কমে হয়েছে ৩৮ শতাংশ। যে উত্তরবঙ্গে তৃণমূলকে একরকম মুছে দিয়েছিল বিজেপি, এবার সেখানেই ঘাসফুলের ভেলকি দেখলো সবাই।

বাম-কংগ্রেসের নিষ্প্রভতা
বাম ও কংগ্রেস জোট বেঁধে ৪০টি আসনে ভোটে লড়েছে। প্রচারে বেশ সাড়াও জাগিয়েছিল তারা। কিন্তু মাত্র একটি আসনে জয় পেয়েছে বামরা।
গত লোকসভা নির্বাচনে বাম ও কংগ্রেস আলাদাভাবে লড়েছিল। সেবার তারা মোট ৯ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছিল। বামেরা কোনো আসনে জেতেনি, কংগ্রেস দুটি আসনে জিতেছিল। এবার একসঙ্গে লড়ে তারা ১১ শতাশের মতো ভোট পেয়েছে। বামেরা খাতা খুলতে পারেনি এবারও। কংগ্রেস একটি আসন হারিয়েছে।
বড় জয়-পরাজয়
লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ইন্দ্রপতন। পাঁচবারের সংসদ সদস্য ও প্রদেশের কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী হেরে গেছেন বহরমপুর কেন্দ্র থেকে। তাকে হারিয়েছেন সাবেক ক্রিকেট তারকা ইউসুফ পাঠান। মুর্শিদাবাদ আসনে আশা জাগিয়েও হেরে গেলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম। অবশ্য জোটের মুখ রেখেছে মালদহ দক্ষিণ। এখানে কংগ্রেসের ঈশা খান চৌধুরী নিজের জয় তুলে নিয়েছেন।
উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক হেরে গেছেন তৃণমূলের কাছে। বিদায়ী মন্ত্রিসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ডেপুটি ছিলেন তিনি। সাবেক কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুভাষ সরকার পরাজিত হয়েছেন বাঁকুড়া আসনে। বালুরঘাটের বিদায়ী সংসদ সদস্য সুকান্ত মজুমদারও পড়েছেন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। তিনি বিজেপির রাজ্য সভাপতি।
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি পদ থেকে অবসর নিয়ে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়েন। তিনি রয়েছেন তমলুক কেন্দ্রে জয়ের পথে। একইভাবে অধিকারী গড় অটুট রেখে কাঁথিতে পদ্ম প্রতীকে জিতেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ভাই সৌমেন্দু।
আসন বদলেও জয়ের দেখা পাননি বিজেপির সাবেক রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। তাকে হারিয়েছেন সাবেক ক্রিকেট তারকা তৃণমূল প্রার্থী কীর্তি আজাদ। আসানসোলে জিতেছেন বলিউডের সাবেক তারকা তৃণমূলের শত্রুঘ্ন সিনহা। তিনি হারিয়েছেন বিজেপির প্রার্থী ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়াকে।
তারকাদের মধ্যে লড়াইয়েও সর্বোচ্চ জয় তুলে নিয়েছে তৃণমূল। ঘাটালে দেব ও হুগলি আসনে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতেছেন। কৃষ্ণনগর আসন থেকে জিতে ফের লোকসভায় যাচ্ছেন মহুয়া মৈত্র। তিনি সংসদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন কয়েকমাস আগে।
তবে মতুয়া ভোটের সৌজন্যে বনগাঁ অঞ্চল নিজেদের দখলে রাখতে পেরেছে বিজেপি। এখানে তাদের প্রার্থী বিদায়ী মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর।
সিপিএমের টিকিটে লড়া তরুণ বাম প্রার্থীরা প্রচারে সাড়া জাগালেও প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারেননি। যাদবপুরে সৃজন ভট্টাচার্য, শ্রীরামপুরে দীপ্সিতা ধর, ডায়মন্ড হারবারে প্রতীক উর রহমান, তমলুকে সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যুদস্ত হয়েছেন।

রেকর্ড জয় অভিষেকের
দেশের মধ্যে রেকর্ড ভোটে জয়ের নজির গড়তে চলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ডায়মন্ড হারবার আসনে ৭ লাখেরও বেশি ভোটে জিতেছেন তিনি। ২০০৪ সালে লোকসভা ভোটে ৫ লাখ ৯০ হাজার ভোটে আরামবাগে জিতেছিলেন সিপিএমের অনিল বসু।
বিরোধীদের অভিযোগ, ডায়মন্ড হারবার আসনে ভোটের দিন অধিকাংশ বুথে এজেন্ট বসাতে দেয়নি তৃণমূল। এদিন ভোট গণনার সময়ও সর্বত্র বিরোধী এজেন্টদের বসতে দেয়া হয়নি।
জয়ের পেছনের ফ্যাক্ট
তৃণমূলের জয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে দেখা হচ্ছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পকে। এই প্রকল্পে নারীরা প্রতি মাসে ৫০০ টাকা পেতেন। নির্বাচনের আগে তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়। ভোটের মুখে সেই টাকা অ্যাকাউন্টে পাঠানো শুরু করে তৃণমূল সরকার। দুই কোটির বেশি নারী এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছেন। তাদের ভোট তৃণমূলের পক্ষে গেছে।
রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটে থাবা বসাতে পারেনি বাম ও কংগ্রেস জোট। দাগ কাটতে পারেনি আইএসএফ। তাই মুসলমান ভোটের প্রায় পুরোটাই তৃণমূলের সঙ্গে থেকেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও দেশের অন্যত্র ভোটপ্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরাসরি মুসলমানদের নাম করে যেসব মন্তব্য করেছিলেন, তাতে এ রাজ্যে মেরুকরণ আরো প্রবল হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘ভোটের আগেই প্রতি ৩ জন মানুষের একজন বিজেপির সঙ্গে নেই। সংখ্যালঘুরা পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ ৭০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে বসেছে বিজেপি, তৃণমূল কিন্তু ১০০ নম্বরের পরীক্ষা দিচ্ছে। ২ কোটি ১৮ লাখ ভোটার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যান্য প্রকল্পও আছে। এতেই অংক পরিষ্কার হয়ে যায়।’
বিজেপির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও সংগঠনের দুর্বলতা হারের বড় কারণ হয়ে উঠে এসেছে। নিয়োগ দুর্নীতি, একশো দিনের কাজ বা আবাস যোজনায় দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি বিরোধীরা। সন্দেশখালি নিয়ে তোলপাড় হলেও ভোটে তা দাগ কাটতে পারেনি। বসিরহাট আসনে তৃণমূল বিপুল ভোটে জিতেছে। এমনকি সন্দেশখালি বিধানসভাতেও বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র এগোতে পারেননি।
তাই বুথফেরত সমীক্ষা যাই বলুক, বাস্তবে রাজ্যের মানুষ অন্যরকম ভেবেছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সাংবাদিক নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়নি, যেটা মনে করা হচ্ছিল। সেখানেই হিসেবে ভুল হয়ে গেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাই মানুষ বিশ্বাস করেছে। বিজেপি এখনো পশ্চিমবঙ্গের দল হয়ে উঠতে পারেনি। কোথাও একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ রয়ে গেছে।’
আরো পড়ুন: শনিবার শপথ নেবেন মোদি
আর দুই বছর পর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। সেখানে বিরোধীদের খুব একটা আশা দেখছেন না রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও পর্যবেক্ষক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘আর বছর দুয়েক সময় হাতে আছে। এর মধ্যে বিজেপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে হয় না। এবার প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রচার করার পরেও যে ফল হলো, তাতে বোঝা যাচ্ছে, তৃণমূলকে বিধানসভা ভোটে হারানো খুবই কঠিন।’
