×

অর্থনীতি

ফসল পুড়ছে সেচের অভাবে, উৎপাদনে বিপর্যয়ের শঙ্কা

Icon

হরলাল রায় সাগর

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম

ফসল পুড়ছে সেচের অভাবে, উৎপাদনে বিপর্যয়ের শঙ্কা

ছবি : সংগৃহীত

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার বদলপুর গ্রামের কৃষক আবু সামার একটি ভুট্টা ভাঙার মেশিন এবং একটি স্যালো ইঞ্জিন আছে। নিজের ৬-৭ বিঘা জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসল রয়েছে। এছাড়া তার স্যালো মেশিনের আওতায় অন্যরাও চাষ করে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন তার। সপ্তাহখানেক আগে ১০ লিটার ডিজেল পেয়েছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় নিজের জমি ও অন্যের জমিতে সেচ দিতে পারছেন না বলে জানান আবু সামা। তিনি জানান, ২০-২৫ দিন পরে ধান কাটা যাবে। এখন জমিতে পানির খুবই প্রয়োজন। পানি দিতে না পারলে ফলন অনেক কমে যাবে। পাওয়ার ট্রিলার ও ভুট্টা ভাঙা মেশিন তেলের অভাবে পড়ে আছে। 

পুরাতন বাস্তপুর গ্রামের আবু তালেব, আব্দুল মান্নান, আব্দুল আলিম ও হাকিম বলেন, ১০ দিন আগে তারা ৫ লিটার করে তেল পেয়েছেন। সেই তেলে ক্ষেতে একবারের সেচ হয়েছে। বুধবার তেল কার্ড নিয়ে তপ্ত গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বিক্রেতা জানায়- তেল শেষ হয়ে গেছে। তেল না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরেন তারা। তারা জানান, ধানক্ষেতে কমপক্ষে ৩-৪টি সেচ দিতে হবে। এখন সেচ দিতে না পারলে ফলন অনেক কমে যাবে, খরচও উঠবে না।

দামুড়হুদা উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ কুমার বিশ্বাস বলেন, যেসব জমির ধান এখনো পূর্ণতা পায়নি, সেসব ক্ষেত্রে অন্তত ২ থেকে ৩ বার সেচ দেয়া জরুরি, না হলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও তেল না পাওয়ার কথা জানান ফরিদপুরের সালথা উপজেলার সোনাপুর গ্রামের কৃষক তারা শেখ। তিনি বলেন, এক দিন সামান্য ডিজেল পেলেও তা দিয়ে সেচ দেয়া সম্ভব হয়নি। সময়মতো পানি দিতে না পারলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। সতেরো বছর পর আবার ধান লাগিয়েছেন, কিন্তু এখন তেলের অভাবে জমিতে পানি দিতে পারছেন না। পানি দিতে না পারলে ধান ও পাটের চারা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

শুধু কৃষকরাই নয়, ট্রাক্টরচালকও পড়েছেন বিপাকে। ট্রাক্টরচালকদের অভিযোগ, একেকজনকে মাত্র ১০ লিটার করে ডিজেল দেয়া হচ্ছে। 

একদিকে তাপপ্রবাহ, আরেকদিকে ডিজেল-বিদ্যুতের চরম সংকটে দেশের কৃষি খাতে অশনিসংকেত দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাতে বিশ্বের উত্তাল তেলবাজারের ঢেউ এখন বাংলাদেশের কৃষকের বোরো খেতে এসে পড়েছে। এখন দেশের মাঠজুড়ে সেচনির্ভর বোরো ধান। কিছু এলাকায় ধান পাকলেও বেশির ভাগ জমিতেই এখনো ২-৩টি সেচ প্রয়োজন। এছাড়া ফরিদপুর, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় পাটের আবাদ শুরু হয়েছে। ক্ষেতে আছে তরমুজসহ নানা ফসল। আমনের বীজতলাও শুরু হচ্ছে। এসব ফসল সেচনির্ভর। আর সেচ কার্যক্রমের প্রায় ৮০ শতাংশ ডিজেলনির্ভর।

এছাড়া ধান, গম ও ভুট্টা কাটা ও মাড়াই মেশিন এবং জমি চাষের ট্রাক্টরও সচল থাকে এই সময়ে। কৃষি আধুনিকতার এই সময়ে ক্ষেত প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত ডিজেল প্রয়োজন। অথচ কৃষক চাহিদা মতো ডিজেল পাচ্ছেন না। সেচ পাম্পের মালিকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত তেল পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎও। এপ্রিলের এই প্রচণ্ড খরা ও গরমে দিন-রাত সেচযন্ত্রগুলো চালু রাখা দরকার। একদিকে, সংকট অন্যদিকে ডিজেলের মূল্য লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি খাতে।

তীব্র দাবদাহের কারণে পানির স্তরও দিন দিন মাটির নিচে নেমে যাচ্ছে। জলাধার শুকিয়ে গেছে। অনেক জলাধার বা খাল মরে গেছে। ফলে পানির অভাব তীব্র হয়েছে। এখন বোরো ধান গাছে ফুল আসা ও দানা বাঁধার সময়ে সেচ দিতে না পারলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসবে বলে জানান কৃষকরা। বোরো ধানসহ ফসল উৎপাদনে বিপর্যয়ের আশংকা করছেন কৃষক, কৃষি অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা। 

কৃষকদের দাবি, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে চলতি মৌসুমে ধান ও পাট উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। তারা কৃষি বাঁচাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। 

যদিও সরকার বলছে, সেচব্যবস্থা চালু রাখার জন্য কৃষকদের চাহিদা মতো ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে। সেচব্যবস্থা সচল রাখার জন্য শহরে লোডশেডিং বাড়িয়ে গ্রামে বিশেষ করে পাম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। 

জ্বালানির সংকট নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। অথচ  উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলচালিত পাম্পগুলোর বেশির ভাগই জ্বালানিসংকটের কারণে অচল হয়ে পড়ে আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এছাড়া হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও ডিজেলসংকট ও মূল্য বাড়ানোর কারণে সময়মতো ধান কাটতে না পারার আশঙ্কার পাশাপাশি বাড়তি খরচের চাপে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। 

অন্যদিকে গ্যাসসংকটে একের পর এক সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুদ্ধের কারণে আমদানিনির্ভর সারের বড় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে- যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, আগামী বোরো মৌসুম শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় সার আমদানি ও উৎপাদন নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর প্রায় ২৪ শতাংশ অর্থাৎ ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহার হয় কৃষিকাজে। দেশের ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম ডিজেলনির্ভর। প্রতিদিন ডিজেলের চাহিদা সাড়ে ১২ হাজার টন। 

সরকারের হিসাবে, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য ডিজেল মজুত ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৩ টন। আরো প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টন ডিজেল খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এই চালান যুক্ত হলে মজুত প্রায় দুই সপ্তাহ বাড়বে। ১ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেল বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৯০৪ টন। দৈনিক গড় বিক্রি ১১ হাজার ১৬১ টন। সরকারের হিসাবেই ডিজেলের দৈনিক চাহিদার ঘাটতি আছে প্রায় দেড় হাজার টন। কৃষক যে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছে না সরকারের হিসাবে তার প্রমাণ মিলে।  

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ ও ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে। এসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। এছাড়া ১০ হাজার কম্বাইন হার্ভেস্টার, কয়েক লাখ রিপারসহ মাড়াই-ঝাড়াই এবং অন্য যন্ত্র রয়েছে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি। সব মিলিয়ে প্রায় ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি আছে, যার ৭৫ শতাংশই ডিজেলচালিত। লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎচালিত পাম্পের সঙ্গে ইঞ্জিনও রাখতে হয়।

সরকারি হিসাব মতে, দেশে ৫৩ লাখ হেক্টর জমির অর্ধেকের বেশি সেচ হয় ১৪ লাখ শ্যালো মেশিনে এবং এক-চতুর্থাংশ দুই লাখ লো লিফট পাম্প দিয়ে। শ্যালো মেশিনের তিন-চতুর্থাংশ এবং লো-লিফট পাম্পের বেশির ভাগ চলে ডিজেল দিয়ে। অর্থ্যাৎ দেশের মোট সেচের আওতাধীন জমির প্রায় ৬০ শতাংশ সেচ হয় ডিজেল দিয়ে। 

দেশের বেশির ভাগ এলাকার খাল ভরাট হয়ে গেছে। কিছু খাল থাকলেও তাও শুকিয়ে গেছে। এতে পানির অভাব তীব্র হয়েছে। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামের কৃষক সাদেক আলী বলেন, ধানে পানি দিতে পারছেন না। পানির অভাবে সেচ দিতে না পারায় ধান মরে যাচ্ছে। পানির স্তর অন্তত ৪০ ফুট নিচে নেমে গেছে। টিউবওয়েলেও পানি ওঠে না, মেশিনেও পানি ওঠে না। খাল, নালায় কোথাও পানি নেই। খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

দাকোপ উপজেলার চুনকুড়ি গ্রামের কৃষক জীবানন্দ মণ্ডল এ মৌসুমে চার বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ফলন মোটামুটি ভালো হলেও কয়েক দিনের দাবদাহের কারণে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। মেশিনে পানি উঠছে না। আশপাশের খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। যার কারণে তরমুজের সাইজ ছোট হয়ে যাচ্ছে। দুই-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে এবার লোকসানে পড়তে হবে।

রাজশাহীর বিভিন্ন তেলের পাম্পে বোরো চাষিরা তেল নিতে মাথায় করে শ্যালোমেশিন (সেচযন্ত্র) নিয়ে যাচ্ছেন। এমনই একজন কৃষক রাকিব হোসেন। তিনি জানান, ফিলিং স্টেশন থেকে ২০০ টাকার তেল দেয়া হচ্ছে। এই তেলে খুব বেশি তিন ঘণ্টা মেশিন চলবে। তার জমিতে ৯ ঘণ্টা পানি লাগে। উপজেলার বালানগর, কালচিকার বোরো চাষি কালাম ও কোরবান আলী জানান, পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় বাড়িতে পানি তোলা মোটর চালিয়ে জমিতে সেচ দিতে হয়। কোনো কোনো সময় জমিতে পাইপ বিছানোর পরে দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ নেই। এ অবস্থায় সেচ দিতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের দক্ষিণ কড়ৈতলী এলাকায় সেচখালে পানির স্বল্পতার কারণে আবাদ করা কৃষিজমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে সেচখালে পানি থাকায় যোগীকান্দি সেচ পাম্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়। তখন কৃষকরা কোনোভাবে চারা রোপণ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে এসে সেচখালে পানি কমে যাওয়ায় পাম্প দিয়ে আর পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিপাকে পড়েছেন শতাধিক কৃষক। জমিতে পর্যাপ্ত সেচ না থাকায় মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার স্থানীয় কার্ডধারী কৃষক আজমত আলী, দিদার আলী, মোফাজ্জল হকসহ একাধিক বার কৃষক অভিযোগ করে বলেন, কয়েক দিন ধরেই কৃষি কার্ড নিয়ে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরেও প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছেন না। সেই ভোররাত থেকে পাম্পে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক সময় তেল না পাওয়ায় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। আবার লাইনে দাঁড়িয়ে যে টুকুও তেল পাওয়া যায় তা একেবারে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তারা জানান, এখন জমি চাষ, সেচ এবং কৃষিযন্ত্র চালাতে ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তেলের সংকটে শাকসবজি, পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা ও ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র, পাওয়ার টিলার, ধান কাটার মেশিন ও ট্রাক্টর বন্ধ থাকায় অনেক জমির কাজ করতে পারছেন না। 

ফরিদপুরের পাটচাষি বেলায়েত হোসেন বলেন, তীব্র তাপদাহ চলছে, এখন সেচ দিতে পারছি না, পাট ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিও নেই, একারণে মাঠজুড়ে পাট ক্ষেত পুড়ে যাচ্ছে, আবার পোকার আক্রমণও হয়েছে। ডিজেল পাচ্ছি না, ডিজেল না পাওয়ায় মেশিন চালাতে পারছি না, এ কারণে সেচ দিতে পারছি না।

গৃহবধূ রাহেলা বেগম বলেন, সেচ দিতে না পারায় এ বছর পাট পুড়ে যাচ্ছে, পোকাও লেগেছে। এখন ঠিকমতো সেচ দিতে না পারলে ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাবে। সারা বছরের সংসার খরচ চলে এই পাট চাষাবাদ করে। 

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের আব্দুল করিম জানান, আগে দিনে ২-৩ বার পানি দিতে পারতাম, এখন বিদ্যুৎ না থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ডিজেল দিয়ে সেচ দিতে গিয়ে খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। ঠিকমতো তেলও পাওয়া যায় না। 

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির মূল্য বাড়ানোর ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া আরো কঠিন হবে। আবার বাজারে খাদ্যের দাম বাড়ায় গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের খরচ বাড়বে। বিশেষ করে চালের দাম বেড়ে গেলে গরিব মানুষের কষ্ট যেমন বাড়বে তেমনই অন্য খরচেও এর প্রভাব পড়বে- যা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেবে। তাছাড়া খরচ বাড়লে কৃষকের লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়। এমনিতেই বর্তমানে ভারত থেকে চাল আমদানি চালু থাকায় আমন ধানের দাম কমেছে। ফলে বোরো ধানের ভালো দাম পাওয়া নিয়েও তারা শঙ্কায়। এর মধ্যে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব কৃষি খাতসহ সবকিছুতেই পড়বে। নিশ্চিতভাবে কৃষকের খরচ বড় আকারে বেড়ে যাবে। মাঠে থাকা বোরো ঘরে তোলা, মাড়াই ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে চালের দামও বাড়বে। কৃষকদের বর্ধিত এ ব্যয় ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে পুষিয়ে দিতে হবে। না হলে পরবর্তী উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। কারণ কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে আগামীবার উৎপাদন করবেন না এটাই স্বাভাবিক।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের কৃষি ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দাম বাড়লেও ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের বর্ধিত খরচ সমন্বয়ে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেয়া জরুরি। তিনি বলেন, দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৫৪ শতাংশই উৎপাদিত হয় বোরোর মৌসুমে। এ সময় উৎপাদন বিঘ্নিত হলে তা খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। তাছাড়া বর্তমানে কৃষকদের নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। এতে ধানের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া উচিত। 

কৃষি অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক উপাচার্য এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, সরকারের যত যুক্তই থাকুক না কেন, এই মুহূর্তে ডিজেল সরবরাহ-সংকট ও মূল্য বাড়ানোর ফলে চলমান বোরো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, পৌনে দুই কোটি কৃষকের সবার জন্য ডিজেল নয়, সেচের ডিজেল সরবরাহ করতে হবে কেবল ১৬ লাখ পাম্পমালিকের জন্য। তাদের তালিকা বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে আছে। তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল কার্ড চালু করার পরামর্শ দেন। 

এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, বর্তমান বোরো ধানের আবাদ রক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে একেবারে অপরিহার্য নয়Ñ এমন সরকারি পরিবহন খাত থেকে আগামী এক মাস অর্থাৎ মে মাস পর্যন্ত কিছু ডিজেল স্থানান্তরিত করে কৃষকদের কাছাকাছি পাম্পগুলোয় সরবরাহ বাড়ানো যায়। এর জন্য শক্ত তদারকি ব্যবস্থাও থাকতে হবে, যাতে উদ্দিষ্ট পাম্পমালিকের কাছে জরুরি ডিজেল পৌঁছায়। এসব করতে হয়তো বোরো মৌসুম চলে যাবে। কিন্তু এক মাঘে শীত যায় না। কৃষকের ডিজেলসংকট উত্তরণে এখন থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী আমন মৌসুমে একই সমস্যায় পড়তে হতে পারে বলেও আশঙ্কার কথা জানান তিনি। 

তিনি জানান, বর্তমানে আমাদের ইউরিয়া সারের ব্যবহার প্রায় ২৭ লাখ টন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি ১৭ লাখ টনের বেশিরভাগই আসে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। বর্তমান সংঘাতের কারণে আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে মোট পাঁচটি ইউরিয়া উৎপাদন ফ্যাক্টরি আছে। এর চারটিই গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় সারের প্রায় ৮০ শতাংশই এখন আমদানি করতে হয়। বর্তমানে বোরো মৌসুমের জন্য সারের কোনো সমস্যা নেই। তবে আগামী আউশ ও আমন মৌসুম এবং পরবর্তী রবি মৌসুমের জন্য সার সরবরাহ বাড়ানো দরকার।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশের জন্য ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ৫৭ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিকটন। এর মধ্যে জুলাই থেকে এপ্রিলে ইতোমধ্যে ৫৪ লাখ ৭৯ হাজার মেট্রিকটন সার বিতরণ হয়ে গেছে। মে মাসের জন্য আগাম ৬৩ হাজার টন সার বিতরণ করা হয়েছে এবং জুন মাসের জন্য চাহিদা এসেছে ৭১ হাজার টন। এই পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে বড় সংকট না হলেও আগামী বোরো মৌসুমের আগেই পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।

অন্যদিকে, কৃষকদের পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।  তিনি বলেন, কৃষি খাতের জন্য জ্বালানি তেলের সমস্যা হবে না। হার্ভেস্টারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সরবরাহ রয়েছে। হাওরাঞ্চলের ধান যথাসময়ে কাটার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। 

কৃষকদের সেচ খরচ কমাতে ধাপে ধাপে সোলার সিস্টেমে রূপান্তর করা হবে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এতে জ্বালানি নির্ভরতা কমবে এবং কৃষি উৎপাদন আরো লাভজনক হবে। কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকার ডিপ টিউবওয়েল ও শ্যালো মেশিনে সোলার সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি। এ জন্য কৃষকদের ভর্তুকি দেয়া হবে, ফলে অর্ধেক খরচে সোলার সুবিধা পাবেন তারা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘আন্তঃনগর ট্রেনের ৮০ শতাংশ পুরোনো কোচ পরিবর্তন করা হয়েছে’

‘আন্তঃনগর ট্রেনের ৮০ শতাংশ পুরোনো কোচ পরিবর্তন করা হয়েছে’

রংপুরে মোমবাতি জ্বালিয়ে এসএসসি পরীক্ষা, কেন্দ্রসচিবকে দায়ী করলেন ইউএনও

রংপুরে মোমবাতি জ্বালিয়ে এসএসসি পরীক্ষা, কেন্দ্রসচিবকে দায়ী করলেন ইউএনও

এতদিন ভুল পথে ছিলাম

জামায়াতে যোগ দিয়ে জাপা নেতা এতদিন ভুল পথে ছিলাম

জ্বালানি সংকট পেরিয়ে শরণখোলায় বোরোর বাম্পার ফলন

জ্বালানি সংকট পেরিয়ে শরণখোলায় বোরোর বাম্পার ফলন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App