×

অর্থনীতি

রেমিট্যান্সে অস্বাভাবিক চিত্র, এপ্রিলের শেষ দিনে বড় লাফ

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ১২:১২ এএম

রেমিট্যান্সে অস্বাভাবিক চিত্র, এপ্রিলের শেষ দিনে বড় লাফ

ছবি: সংগৃহীত

ঈদের আগে সাধারণত দেশের প্রবাসী আয় বাড়ে। আর ঈদের পরে কিছুটা কমে। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পুরো উল্টোটাই ঘটেছে। ঈদুল ফিতরের (১১ এপ্রিল) আগের ১২ দিনে গড়ে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। আর ঈদের পর এপ্রিলের শেষ তিনদিন গড়ে রেমিট্যান্স এসেছে ১২ কোটি ডলার। আর শুধুমাত্র শেষ দিনেই রেমিট্যান্স এসেছে ১৩ কোটি ডলারের বেশি। অর্থাৎ সদ্য বিদায়ী এপ্রিল মাসের শেষ দিকে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রেমিট্যান্সে ভয়াবহ পতনের কারণে ধারাবাহিক ক্ষয় হচ্ছিলো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পর্যাপ্ত ডলার সংগ্রহে ব্যর্থতার কারণে জরুরী পণ্য আমদানিতে রিজার্ভ থেকে সহায়তা দিতে হচ্ছে। তবে সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা অগ্রণীর বেহাল দশা হলেও জনতার দাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের রেমিট্যান্সে গতি ফিরেছে। অন্যদিকে ঈদের আগে অস্বাভাবিক কমে যাওয়া রেমিট্যান্স ঈদের পর অস্বাভাবিক উত্থান হয়েছে। ফলে ডলারের সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। 

জানা গেছে, কিছু বেসরকারি ব্যাংকের অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়ম মানতে গিয়ে বিপাকে আছেন তারা। তবে এপ্রিলে জনতা ব্যাংক বাজিমাত করেছে। অন্যদিকে হুন্ডিতে সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রের রেমিট্যান্স পাচার হলেও ভুতুরে আয় হচ্ছে আরব আমিরাত থেকে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স প্রবাহ এক তৃতীয়াংশ কমে গেছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই মাসে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছিলো ১৯৭ কোটি ডলার। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এসেছে ২৪ কোটি ডলার। অন্যদিকে গত জানুয়ারিতে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২১০ কোটি ডলার। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ জানুয়ারিতে সার্বিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে কমেছে ৭ কোটি ডলার। যা শতকরা হিসাবে জুলাইয়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে একই চিত্র বজায় ছিলো।  তবে আশার কথা হলো সদ্য সমাপ্ত এপ্রিলে ফের বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের রেমিট্যান্স। ২১ কোটি ডলার এসেছে এ মাসে। কিন্তু এখানেও অস্বাভাবিক চিত্র রয়েছে। 

জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনেক সময় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চাপ সৃষ্টি করে। কোন কোন ব্যাংক তখন এগ্রেসিভলি টাকা সংগ্রহ করে। তিনি বলেন, কিছু বড় বড় এজেন্ট এখানে ঢুকে গেছে। নেগোসিয়েশন করে একসঙ্গে অনেকগুলো টাকা নিয়ে পাঠিয়ে দেয়। দুবাইতে। সেখান থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। আর এজন্যই এখন সৌদি থেকে টাকা আসা কমে গেছে। আরব আমিরাত থেকে বেড়েছে। যদিও বিষয়টি সঠিক পথে আনা বলে না। কিন্তু রিটেইল যারা তারা এখন আর সরাসরি পাঠাতে পারে না বড় এজেন্টদের কারণে। মার্কেটের স্ট্রাকচার পরিবর্তন হয়ে গেছে। 

এদিকে ব্যাংকাররা বলছেন, সাধারণত রেমিট্যান্স সংগ্রহের সক্ষমতা বেশি অগ্রণী ব্যাংকের। ব্যাংকটিতে দীর্ঘদিন রেমিট্যান্সে মন্দা পরিস্থিতি চলছে। কিন্তু জনতা ব্যাংকে চলতি বছরের মার্চের তুলনায় এপ্রিলে প্রবাসী আয় বেড়েছে সাড়ে ৫ গুণ। মার্চ মাসে এসেছিল ২ কোটি ডলার। আর এপ্রিলে এসেছে ১১ কোটি ডলার।  

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডলার বাজারের অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে কয়েকটি ব্যাংক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে এসব ব্যাংক ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে রেমিট্যান্স কিনছে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে ঘোষিত দরে ডলার কিনতে হচ্ছে। তাই প্রত্যাশিতভাবেই ডলারের প্রবাহ কমে গেছে। কিন্তু এপ্রিলে বিশেষ কি ঘটেছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। 

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের মধ্যে বিডিবিএল ছাড়া বাকি পাঁচটি ব্যাংক রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে অগ্রণী ব্যাংকে। দীর্ঘদিন এ ব্যাংকটির অবস্থান সার্বিক খাতে শীর্ষ তিনে ছিলো। এক সময় ব্যাংকটি রেমিট্যান্স সংগ্রহে প্রথম স্থানেও ছিলো। কিন্তু ডলারের বাজার উত্তপ্ত হওয়ার পর অগ্রণী ব্যাংকের রেমিট্যান্স কমতে শুরু করে। গত অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে অগ্রণী ব্যাংকে রেমিট্যান্স এসেছিলো ১২ কোটি ডলার। আর চলতি এপ্রিলে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ ব্যাংকটির রেমিট্যান্স এক তৃতীয়াংশে নেমেছে। এদিকে গত জুলাইয়ে জনতা ব্যাংকে এসেছে ৬ কোটি ডলার। আর চলতি এপ্রিলে এসেছে প্রায় দ্বিগুণ বা ১১ কোটি ডলার। রুপালী ব্যাংকে এমনিতেই রেমিট্যান্স কম আসে। বর্তমানে কিছুটা বেড়েছে। জুলাইয়ে ১ কোটি ডলার আসলেও এপ্রিলে এসেছে ৩ কোটি ডলার। 

সরকারি পণ্য আমদানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সোনালি ব্যাংকের রেমিট্যান্সেও পতন হয়েছে। গত জুলাইয়ে আসা ৪ দশমিক ৫ কোটি ডলার এপ্রিলে নেমেছে ২ দশমিক ৭ কোটিতে। বেসিক ব্যাংকে সে অর্থে রেমিট্যান্স আসে না। তবে বিডিবিএলের মতো একেবারেই যে আসে না তা নয়। ব্যাংকটিতে দশমিক ১৬ মিলিয়ন প্রবাসি আয় এসেছিলো গত জুলাইয়ে আর চলতি বছরের এপ্রিলে এসেছে দশমিক শূন্য ৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ ব্যাংকের রেমিট্যান্স শূন্যের কোটায় নেমেছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করে কথা বলেছেন রেমিট্যান্স বিভাগের কর্মকর্তারা। এছাড়া দিন দিন রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতা বাড়ছে বলে মনে করেন ব্যাংকাররা।

একটি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নমনীয়তায় বেশি দামে ডলার কিনে কম দামে বিক্রির যে প্রথা চালু হয়েছে তা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে ভোগাচ্ছে।’ অনেক ব্যাংক কালোবাজারে ডলার ব্যবসায় মেতে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন এ কর্মকর্তা।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী এপ্রিল মাসে বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশিরা ২০৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার সমান ১১০ টাকা ধরে)। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ২১ কোটি ১২ লাখ ডলার, দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে ৯ কোটি ৭২ লাখ ডলার, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ১৭২ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৬৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার প্রবাসী আয় এসেছে দেশে।

অন্যান্য সময়ের মতো এবারে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। এপ্রিলে ব্যাংকটির মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৪ কোটি ১২ লাখ ডলার। এরপরেই রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান। ব্যাংকটির মাধ্যমে ১৪ কোটি ৮২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে ১২ কোটি ১৫ লাখ, জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ১১ কোটি ১৪ লাখ ডলার এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে ১১ কোটি ডলার এসেছে।

এদিকে গেলো এপ্রিলে এক টাকাও রেমিট্যান্স আসেনি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে কমিউনিটি ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, শরীয়াহ ভিত্তিক আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, বিদেশি খাতের হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে। 

তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ১৯৭ কোটি ৩১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এছাড়া আগস্টে ১৫৯ কোটি ৯৪ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ১৩৩ কোটি ৪৩ লাখ ডলার, অক্টোবরে ১৯৭ কোটি ১৪ লাখ ডলার, নভেম্বরে এসেছে ১৯৩ কোটি ডলার, ডিসেম্বরে ১৯৯ কোটি ১২ লাখ ডলার, জানুয়ারিতে ২১১ কোটি ৩১ লাখ ডলার,  ফেব্রুয়ারিতে ২১৬ কোটি ৪৫ লাখ এবং মার্চে ১৯৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App