×

অর্থনীতি

খনিজ সম্পদ উত্তোলনে দরকার সরকারি বিনিয়োগ

দেশের অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে পারে খনিজ সম্পদ

মিজানুর রহমান সোহেল

মিজানুর রহমান সোহেল

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৯:২৫ পিএম

দেশের অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে পারে খনিজ সম্পদ

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদের প্রতীকী ছবি

বিশ্বমন্দার সময়ে বাংলাদেশে সম্ভাবনার অপর নাম হতে পারে প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ। দেশে প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদের মধ্যে গ্যাস উত্তোলনে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেয়া হয়। এরপর উত্তোলনের দিক থেকে কিছুটা গুরুত্ব পায় ব্ল্যাক ডায়মন্ড কয়লা। গ্যাস ও কয়লা কী পরিমাণ মজুত রয়েছে তার হিসাব থাকলেও দেশের অপার সম্ভাবনাময় অন্যান্য প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদের মজুতের ব্যাপারে সঠিক কোনো হিসাব নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খনিজ সম্পদ উত্তোলনে সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে দেশের অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে পারে। 

ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের সূত্র বলছে, সাত ধরনের খনিজের একটি সম্ভাব্য মজুত তারা নিশ্চিত হতে পেরেছে। তবে তা প্রমাণিত নয়। আর প্রমাণিত মজুত আবিষ্কারের আগে খনিজ সম্পদের সঠিক ধারণা দেওয়া কঠিন। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের (জিএসবি) হিসাবে যে খনিজগুলোর সম্ভাব্য মজুতের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো হলো— পিট, চুনাপাথর, সাদামাটি, কঠিন শিলা, কাচবালি এবং নুড়ি পাথর। এসব খনিজ কী পরিমাণ থাকতে পারে, তারও সম্ভাব্য পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি এমন খনিজ পদার্থ রয়েছে চারটি। এগুলো হচ্ছে ভারি খনিজ মাণিক, খনিজ বালি, নুড়ি মিশ্রিত বালি ও ধাতব খনিজ।

সমুদ্র সৈকতের বালি থেকে মাণিক পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলে আসছে জিএসবি। এছাড়া, খনিজ বালি আবিষ্কারের কথাও বলা হচ্ছে— যা নদীর অববাহিকার বালিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নুড়ি মিশ্রিত বালি এবং ধাতব খনিজ রয়েছে। দেশের কিছু স্থানকে এসব খনিজ সম্পদ পাওয়ার উপযোগী বলেও ঘোষণা করেছেন তারা। 

২০১৯ সালের ১৮ জুন ‘খনির জেলা’ হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলায় দেশের প্রথম লোহার খনির সন্ধান মিলে। উপজেলার ইসবপুর গ্রামে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) এ খনির সন্ধান পেয়েছে। জিএসবি জানিয়েছে, খনিটিতে উন্নত মানের লোহার আকরিক (ম্যাগনেটাইট) রয়েছে। এরপর চিরিরবন্দর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে এবং সর্বশেষ ২০২২ সালের আগস্টে পার্বতীপুর উপজেলার মোস্তাপুর গ্রামে এসব খনির সন্ধান পেয়েছে জিএসবি। 

দেশে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের কাজ করে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর -জিএসবি। আর খনির অর্থনৈতিক উন্নয়নের দায়িত্ব পেট্রোবাংলার। বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশনের (বিওজিএমসি) সঙ্গে অঙ্গীভূত হওয়ার আগ পর্যন্ত খনিজবিষয়ক কার্যক্রম বাংলাদেশ মিনারেল এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (বিএমইডিসি) এর ওপর ন্যস্ত ছিল। পেট্রোবাংলা এপর্যন্ত ভূগর্ভস্থ দুটি খনি উন্নয়ন করেছে। একটি হলো বড় পুকুরিয়ার কয়লা, যার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ২০০৫ সালে এবং অন্যটি মধ্যপাড়ায় গ্রানাইট মাইন, যার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ২০০৭ সালে। এছাড়া, সরকার ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্ট (বিএমডি) এর মাধ্যমে চুনাপাথর, হোয়াইট ক্লে ও বোল্ডার আহরণের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

দেশে প্রাকৃতিকভাবে মজুদ খনিজ সম্পদের বাজারমূল্য নিরূপণ করেছে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি)। তাদের হিসাব অনুযায়ী দেশে মোট প্রাকৃতিক মজুদ খনিজ সম্পদের মূল্য ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি (২ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন) ডলারের বেশি। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ২৪১ দশমিক ৯৭ ট্রিলিয়ন (২ কোটি ৪১ লাখ ৯৭ হাজার ৩০০ কোটি) টাকা। তবে জিএসবির এ হিসাবে দেশে মজুদ প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যকে ধরা হয়নি। জিএসবির হিসাবের সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যকে বিবেচনায় নেয়া হলে দেশে মজুদ খনিজ সম্পদের নিরূপিত মূল্য আরো কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জিএসবি দেশে আবিষ্কৃত আট ধরনের খনিজ সম্পদের আর্থিক বাজারমূল্য নিরূপণ করেছে ২ লাখ ২৬ হাজার ১৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে কয়লা রয়েছে ৭২৫ কোটি টনের বেশি। বাজারমূল্য টন প্রতি ১৭৫ ডলার হিসাব করলে এ পরিমাণ কয়লার দাম দাঁড়ায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৯০ কোটি ডলারে। এছাড়া পিট কয়লার সম্ভাব্য মজুদ রয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টন। প্রতি টন ৬০ ডলার হিসেবে এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৫৯০ কোটি ডলারে (৩৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন)।

এছাড়া চুনাপাথর রয়েছে ২ হাজার ৫২৭ কোটি টন। টন-প্রতি ৩০ ডলার হিসেবে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৫ হাজার ৮১০ কোটি ডলার। কঠিন শিলা আছে ২০ কোটি ১০ লাখ টন, যার আর্থিক মূল্যমান ৫৪২ কোটি ডলার। ২৩ কোটি টন সাদামাটির মূল্য ২ হাজার ৯৯০ কোটি ডলার। কাচবালি আছে ৫১১ কোটি ৭০ লাখ টন, যার মূল্য ৬ হাজার ১৪০ কোটি ডলার। ২২০ কোটি টন নুড়ি পাথরের মূল্যমান ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। এবং সাড়ে ৬২ কোটি টন লৌহের মূল্য ৬ হাজার ৮৮০ কোটি ডলার।

জিএসবির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খনিজ সম্পদ মজুদ সম্পর্কে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে ১০৫ কোটি ৩০ লাখ টন, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় ১০ কোটি ২০ লাখ, রংপুরের খালাসপীরে ১৪ কোটি ৩০ লাখ এবং দিনাজপুরের দীঘিপাড়ায় ৪০ কোটি ২০ লাখ টন কয়লার মজুদ রয়েছে। এছাড়া পিট কয়লা মজুদ রয়েছে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরে ২৮ কোটি ২০ লাখ টন, গোপালগঞ্জের বাঘিয়া-চান্দা বিলে ১৫ কোটি, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে সাড়ে ৭ কোটি, শাল্লায় ৫ কোটি ২০ লাখ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে ৩ কোটি ২০ লাখ ও খুলনার কলামৌজায় ৮০ খাল টন।

চুনাপাথর মজুদের বিষয়ে জিএসবি বলছে, দেশে সবচেয়ে বেশি চুনাপাথর মজুদ রয়েছে উত্তরের জেলা নওগাঁয়। জেলায় তাজপুর, বদলগাছি, ভগবানপুরে আড়াই হাজার কোটি টনের বেশি চুনাপাথর মজুদ রয়েছে। এছাড়া জয়পুরহাট জেলার জয়পুরহাট সদরে ১০, পাঁচবিবি উপজেলায় ৫ কোটি ৯০ লাখ এবং সুনামগঞ্জের বাঘালীবাজারে ১ কোটি ৭০ লাখ, টেকেরঘাটে ১ কোটি ২৯ লাখ ও লালঘাটে ১ কোটি ২৯ লাখ টন চুনাপাথরের মজুদ রয়েছে।

খনিজ সম্পদ হিসেবে মূল্যবান সাদামাটি রয়েছে টাঙ্গাইলের মধুপুরে সাড়ে ১২ কোটি টন, হবিগঞ্জের মাধবপুরে ৬ কোটি ৮০ লাখ টন, নেত্রকোনার বিজয়পুরে আড়াই কোটি টন। এছাড়া দেশের আরো কয়েকটি জেলায় সাদামাটির মজুদ চিহ্নিত হলেও এর পরিমাণ নিয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি জিএসবি।

দেশের ছয় জেলায় বিপুল পরিমাণ নুড়ি পাথর মজুদের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। এসব জেলায় নুড়ি পাথরের মোট মজুদের পরিমাণ ২২০ কোটি টন। দিনাজপুরের হাকিমপুরে আকরিক লৌহ মজুদ রয়েছে ৬৫ কোটি টন। এছাড়া কাচবালির মজুদ রয়েছে ৩ হাজার ২০০ কোটি টনের বেশি।

যদিও বাংলাদেশের এমন সম্ভাবনাময় মহামূল্যবান খনিজ সম্পদ উত্তোলনে সরকারি বিনিয়োগ খুবই কম। বছরের পর বছর দেশের অভ্যন্তরে খনিজ সম্পদের প্রকৃত মজুদ, প্রমাণিত মজুদ ও রিজার্ভের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো পরীক্ষা করা হয়নি বলে এখাতে আশাব্যঞ্জক বিনিয়োগও হয়নি। অথচ এসব খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে পারলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস হতে পারে। আবার এগুলো দিয়ে চলমান জ্বালানি সংকটের সমাধান এমনকি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।

বাংলাদেশের সমুদ্র ও স্থলভাগে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ মজুদ রয়েছে। বিশেষত গ্যাস ও কয়লার মজুদের বিষয়টি প্রমাণিত। দেশে মজুদ খনিজ সম্পদের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসই বড় পরিসরে উত্তোলন করা হচ্ছে। এখন এ গ্যাসের প্রমাণিত মজুদ নিঃশেষ হয়ে আসছে। দেশে আরো গ্যাস আছে এবং তা উত্তোলন করা যাবে। এসব সম্পদ উত্তোলনে যথাযথ অনুসন্ধান ও বিনিয়োগ হয়নি। যে কারণে বছরের পর বছর গ্যাসের সরবরাহ কমার বিপরীতে আমদানি নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। কয়লা উত্তোলনের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিচ্ছে না। উত্তরবঙ্গে পাঁচটি খনি আছে। 

১৯৬৩ সালে জয়পুরহাট জেলায় চুনাপাথর খনি আবিষ্কৃত হয়। ওই খনিতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন টন চুনাপাথর মজুদ থাকলেও আজ পর্যন্ত এক টনও উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। জিএসবি-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ৬০ বছর আগে খোঁজ পাওয়া সেই খনির চুনাপাথর অত্যন্ত উঁচুমানের। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেখান থেকে চুনাপাথর উত্তোলন সম্ভব। ভারতসহ অনেক দেশই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক গভীরের খনি থেকে চুনাপাথর তুলছে। কিন্তু অর্থায়নের উৎস না পাওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রা ও ভূগর্ভস্থ পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জের কারণে খনি থেকে চুনাপাথর উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৯৮২ সাল থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়োজিত রয়েছেন। চুনাপাথর উত্তোলন না হলেও প্রতি মাসে তাদের বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে। 

দেশের কক্সবাজার, ব্রহ্মপুত্র নদে খনিজ বালি আছে। বড় নদীগুলোয়ও আছে মূল্যবান খনিজ বালি। এটিও উত্তোলনে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তবে সাদামাটি স্থানীয়ভাবে কিছুটা উত্তোলন হচ্ছে। সঙ্গে কিছু কাচবালিও উত্তোলন হচ্ছে। তবে সেটিও সামান্য পরিসরে। 

ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম ভোরের কাগজকে বলেন, ‘যে পরিমাণ সম্পদ আমাদের আছে আমরা তা ব্যবহার করি না। ব্যবহার করলে আমাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো ভালো হতো। একারণেই আমাদের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশীয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেহেতু দেশের মজুদ খনিজ সম্পদের অংশীদার দেশের জনগণ। অতএব সংবিধান অনুসারে খনিজ সম্পদ সংরক্ষণ ও উত্তোলনের দায়ভার রাষ্ট্রের। এজন্য রাষ্ট্রকেই ভূমিকা রাখতে হবে। তবে যথাযথ সরকারি বিনিয়োগে অভাবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদের ব্যবহার ও অর্থনৈতিক সুফল ভোগ করা যাচ্ছে না। খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বারবার মহামূল্যবান খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহারের জন্য তাগাদা দিলেও সে অর্থে গুরুত্ব পাচ্ছে না সরকারি আমলাদের কাছে। অথচ এই খনিজ সম্পদই এদেশের অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে পারে। যেমনটা খনিজ সম্পদ বদলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে।  

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App