×

সারাদেশ

বিশ্ব পরিবেশ দিবসেও থেমে নেই পাহাড় কাটাসহ বৃক্ষ নিধন

Icon

কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ০৭:৪২ পিএম

বিশ্ব পরিবেশ দিবসেও থেমে নেই পাহাড় কাটাসহ বৃক্ষ নিধন

ছবি: ভোরের কাগজ

বিশ্ব পরিবেশ দিবসেও দেশের অন্যতম কাপ্তাইয়ের প্রাকৃতিক বন (ন্যাচারাল ফরেস্ট) এর একাংশের বৃক্ষ নিধন ও পাহাড় কাটা থেমে নেই।  ৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। কাপ্তাইতেও  দিবসটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপন করা হলেও কাপ্তাইয়ের কোথাও পরিবেশ রক্ষায় বন থেকে কাঠ-বাঁশ পাচার ও পাহাড় ধস রোধে বনবিভাগ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়ার কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পার্বত্য কাপ্তাই সীতা পাহাড় ন্যাচারাল ফরেস্ট এলাকায় অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষ, হলুদ, আদা ও কচু চাষের কারণে পার্বত্য কাপ্তাইয়ের পাহাড়গুলো বিপন্ন হওয়ার পথে। এ ব্যাপারে বন বিভাগের কারো মতামত পাওয়া যায়নি।

এছাড়াও পার্বত্য কাপ্তাই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে ব্যাপক মাটি ক্ষয় ও ধস দেখা দিয়েছে। ফলে এসব পাহাড় ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়গুলো বিলীন হয়ে যাবে। মহাবিপর্যয় ঘটতে পারে পার্বত্যঞ্চলের পরিবশের। তাই পাহাড় ও বন রক্ষায় এখনই সরকারের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

প্রাকৃতিক বনের একাংশের বৃক্ষ নিধন। ছবি: ভোরের কাগজ

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, প্রতিবছর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে কাপ্তাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় বা টিলায় জুম চাষের জন্য বন জঙ্গল কেটে সাফ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ। মার্চ মাসব্যাপী রোদে শুকানোর পর এপ্রিলে আগুনে পোড়ানো হয় এসব বনজঙ্গল। পরে বৃষ্টি এলে পুরো পাহাড়ের গায়ে গর্ত করে রোপণ করা হয় ধান, তুলা, তিল, তামাক, ভুট্টাসহ বিভিন্ন শাক সবজির বীজ।মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যে জুম চাষের জন্য পাহাড়গুলো অগ্নিদগ্ধ করায় মাটি শুকিয়ে ইট হয়ে যায়। এতে ছোট বড় পাহাড় টিলাগুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়। ফাটলে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয়ে ভয়াবহ আকারে পাহাড় ধস শুরু হয়।

ভূমি অবক্ষয় পরিবীক্ষণ সম্পর্কীত টাস্কফোর্সের পরিচালিত এক জরিপ প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি ক্ষয়ের মুখে। তার মধ্যে কাপ্তাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা রয়েছে। অপরিকল্পিত চাষাবাদ বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষকে এ ভূমি ক্ষয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সস্টিটিউট পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন পার্বত্য জেলায় বছরে প্রতি হেক্টরে ১০০ হতে ১২০ মে.টন পর্যন্ত মাটি ক্ষয় হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে ভূমি ক্ষয়ের হার বিপজ্জনক মাত্রায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বর্ষা মৌসুমে অতিবর্ষণে প্রতি বছর তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণহানিও হয়। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১১ জুন হতে ১৩ জুন চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও মৌলভীবাজার জেলায় পাহাড় ধসের ঘটনায় ১৬৮ জনের মৃত্যু হয়। তন্মধ্যে রাঙ্গামাটিতেই মারা যায় ১২০ জন। এদিকে গত কয়েক বছর থেকে পার্বত্য এলাকায় ছোট, বড় ও মাঝারি সব ধরণের পাহাড় ও টিলায় অপরিকল্পিতভাবে কাসাভা, কচু, হলুদ ও আদা চাষাবাদ হচ্ছে। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাহাড়ের মাটি খুঁড়ে এসবের ব্যাপক চাষাবাদের কারণেও পাহাড়গুলো মারত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অশ্রেণীভূক্ত ও সংরক্ষিত বনভূমির গাছ কেটে বিক্রির দৃশ্য। ছবি: ভোরের কাগজ

ড. ফিরোজ আরো বলেন, এক ইঞ্চি পরিমান টপ সয়েল তৈরি হতে সময় লাগে প্রায় ১০০ বছর। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে মাটি ক্ষয়ের সাথে টপ সয়েল ছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান যেমন- ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম প্রভৃতিও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এতে পাহাড়গুলো উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এভাবে চাষাবাদের ফলে পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।

রামগড় পাহাড় অঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্র হতে সম্প্রতি মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে বদলী হওয়া মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ জুলফিকার আলি ফিরোজ বলেন, কাসাভা, হলুদ, আদা, কচু ইত্যাদি চাষাবাদ জুম চাষের চেয়েও অধিক ক্ষতিকর। তিনি বলেন, এসব লাগানোর সময় একবার এবং ফসল উঠানোর সময় আরেকবার পাহাড় ও টিলার মাটি কুপিয়ে উপড়ে ফেলা হয়। কাসাভার গাছের মূলই আলু হিসেবে ব্যবহার হয়। মাটির অনেক গভীরে থাকা এ মূল তোলার জন্য টিলার মাটি কোদাল দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়। হলুদ, আদা, ও কচু তোলার জন্যও একইভাবে এলোপাতারি খুঁড়াখুড়ির কারণে পুরো টিলার মাটিই আলগা হয়ে পড়ে। বর্ষার সময় অল্প বৃষ্টি হলেই আলগা মাটিগুলো ধুয়ে যায়। এতে মাটির উপরের অংশে থাকা টপ সয়েল বা উর্বর মাটির স্তরও পানির তোড়ে ভেসে যায়। এ টপ সয়েল ক্ষয়ের কারণে ঐ পাহাড় বা টিলা গুলো অনুর্বর হয়ে পড়ায় কোন ফসল ফলে না।

পাহাড় ধস ও মাটি ক্ষয়ের কারণে পাহাড়ের পাদদেশে প্রবাহিত ছড়া: ছবি: ভোরের কাগজ

অন্যদিকে, পাহাড় ধস ও মাটি ক্ষয়ের কারণে পাহাড়ের পাদদেশে প্রবাহিত ছড়া, খাল ও নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী এ মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফিরোজ বলেন, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পার্বত্য এলাকার পাহাড়গুলোতে চাষাবাদ এভাবে অব্যাহত থাকলে মাটি ধস ও ক্ষয়ের কারণে পাহাড়গুলো বিলীন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, এ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন করে পাহাড়ের চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এদিকে ২০১৮ সালে পাহাড় ধস সংক্রান্ত একটি জাতীয় কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়ের ‘মালিকনা‘ নির্ধারণ করে তাদের হাতে পাহাড়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব হস্তান্তর, পাহাড় রক্ষা কমিটি গঠন ও নীতিমালা প্রণয়নসহ একটি সুপারিশমালা সরকারের কাছে পেশ করে। কমিটির প্রধান ছিলেন তৎকালিন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সত্যব্রত সাহা। কিন্তু কমিটির এ সুপারিশমালা কার্যকর হয়নি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App