×

সারাদেশ

'ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ চাই'

Icon

অতুল পাল, বাউফল (পটুয়াখালী )প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৪, ০৫:৫৬ পিএম

'ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ চাই'

ছবি: সংগৃহীত

পটুয়াখালীর বাউফলের পনেরটি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়ন মেঘনার অববাহিকা প্রমত্তা তেঁতুলিয়া ও লোহালিয়া নদী বেষ্টিত। এই সাতটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ প্রতিনিয়ত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। এক দুর্যোগের ক্ষত না শুকাতেই আরেকটা দুর্যোগ এসে আঘাত হানছে। একের পর এক দুর্যোগের আঘাতে এ মানুষগুলো ক্ষতবিক্ষত ও অসহায়। অব্যাহত নদী ভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে সংগ্রাম করা এসব মানুষের নিত্যসঙ্গী। 

সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় রেমেলে বাউফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনকালে স্থানীয় এমপি দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি আ.স.ম ফিরোজের কাছে “ত্রাণ চাই না- টেকসই বেড়িবাঁধ চাই” বলে জোর দাবি জানিয়েছেন চরাঞ্চল ও নদী পাড়ের লক্ষাধিক মানুষ। 

ওই অঞ্চলের ছাত্রলীগের জনৈক এককর্মী “ত্রাণ নয়-টেকসই বেড়িবাঁধ চাই” শীর্ষক এক যুবকের বুকে লেখা একটি ছবি দিয়ে পরিদর্শক ও সংবাদকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। চেষ্টা করেছেন তাদের দুঃখের কথাগুলো ছড়িয়ে দেয়ার। মূলত: টেকসই বেড়িবাঁধ না হলে বসবাসরত মানুষ স্থানানন্তর হয়ে পড়বে। বিপর্যয় ঘটবে পরিবেশের। ব্যাহত হবে মৎস্য আহরণ ও চাষাবাদে। ক্ষতি হবে হাজার হাজার কোটি টাকার।  

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার তেঁতুলিয়া ও লোহালিয়া নদীতে ১৮টি চর এবং নদী তীরবর্তী কালাইয়া, নাজিরপুর, কেশবপুর, ধুলিয়া ও কাছিপাড়া ইউনিয়নের ২২টি গ্রামে লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছেন। এসব চরাঞ্চল ও নদী তীরের গ্রামগুলোতে নেই কোনো বেড়িবাঁধ, যার কারণে  নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৪/৫ ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হলেই লোকালয় লবন পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। পানি ঢুকে পড়ে ঘরে ঘরে। ডুবে যায় ফসল, ভেসে যায় পুকুর ও ঘেরের মাছ। পানির তোরে ভেঙে যায় গ্রামিণ সড়ক। 

সূত্র মতে, ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় এ এলাকায় হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। যার একমাত্র কারণ ছিল বেড়িবাঁধ না থাকা। ২০০৭ সালের সিডরেও বাউফলে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সিডরের তাণ্ডবে উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ, চরফেডারেশন ও মমিনপুর চরে ৫৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। 

এরকম প্রতিবছর এসব চরাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আয়লা, আম্পান, মোরা, মোখা, রেমালসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানীর সংখ্যা হৃাস পেলেও বসতঘর, ফসলাদি, মাছ, রাস্তা-ঘাট, গাছপালা ও বিদ্যুৎ লাইনের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। যার ক্ষত বছরের পর বছর বয়ে বেড়াতে হচ্ছে নদী পাড়ের মানুষের। সরকার দেশের উন্নয়নে মেগা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ণ  করলেও উপকূল রক্ষায় স্থায়ী (টেকসই) বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করায় ক্ষুব্ধ উপকূলের  বাসিন্দারা। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে চরাঞ্চল ও নদী পাড়ের গ্রামগুলোতে এখনো ধ্বংসের চিহ্ন জেগে উঠছে। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের  বাসিন্দা মো. আনোয়ার গাজী বলেন, নদীর মাঝে আমরা বসবাস করি। চারপাশে বেড়িবাঁধ না থাকায় ঝড়-বন্যা ও জোয়ারের পানিতে ঘর-বাড়ি ও ফসলের ক্ষেত তলিয়ে যায়। ছেলে সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের টেকসই বেড়িবাঁধ দরকার। আমাদের ত্রাণের দরকার নেই।  

চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির টিম লিডার মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এখানে ২২ হাজার মানুষ বসবাস করে। তাদের জীবনের নিরাপত্তায় সরকার উদাসীন। 

আমাদের কথাগুলো সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার অনুরোধ করে সিদ্দিক বলেন, বছরের পর বছর দুর্যোগে মানুষের জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার পরেও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে না। নেই নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রও। যা আছে তাও নড়বড়ে। মানুষ তাতে আশ্রয় নিতে শঙ্কিত। যেকোনো সময় ভেঙে দুঘর্টনা ঘটতে পারে। মানুষকে বাঁচাতে বেড়িবাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। আমরা চরাঞ্চলের মানুষ। আমাদের কথাগুলো সমাজের কাছে তুলে ধরুন। 

চন্দ্রদ্বীপ ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হক আলকাচ মোল্লা জানান, প্রমত্তা তেঁতুলিয়া নদীর বুকে ১১টি চর নিয়ে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের চারপাশে প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা নদী বেষ্টিত। মানুষের জীবন ও ফসলের রক্ষাকবজ ‘টেকসই বেড়িবাঁধ’ না থাকায় বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ভেঙ্গে যাচ্ছে বাড়ি-ঘর ও ফসলি জমি। বেড়িবাঁধের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছি। তবে বেড়িবাঁধ নির্মাণে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।  

ধুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মু. হুমায়ন কবির বলেন, বছরের পর বছর ধরে ধুলিয়া ইউনিয়নটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বেড়িবাঁধ না থাকায় জলোচ্ছ্বাসে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে ধুলিয়াকে রক্ষা করা যাবে না। 

উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও কাছিপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মরিয়ম বেগম নিশু বলেন, কাছিপাড়ার কারখানা, গোপালিয়া, অমরখালী ও বাহেরচর লোহালিয়া নদীর তীরে অবস্থিত। এখানে টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ফসলী জমি। অপরদিকে বন্যা জলোচ্ছ্বাসে পানি ঢুকে মানুষের জান মালের ক্ষতি হচ্ছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি আ.স.ম ফিরোজ এমপি ভোরের কাগজকে বলেন, চরাঞ্চল তথা চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের মানুষের জান মাল রক্ষায় এ বছরের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। আর বেড়িবাঁধের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অবগত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আবারো কথা বলবো, যাতে দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App