×

সারাদেশ

ভুয়া সনদে দুই যুগ শিক্ষকতা!

Icon

মসিউর ফিরোজ, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৪, ০৯:৩২ এএম

ভুয়া সনদে দুই যুগ শিক্ষকতা!

অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজী। ছবি: ভোরের কাগজ

ভুয়া সনদে সাতক্ষীরা সদরের নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের (ইন—১১৮৮০৯) প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীর (ইনডেক্স— ৫১৫১০০) চাকরি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরেও বহাল তবিয়তে তার কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন। তদন্তে বেরিয়ে এলো প্রায় দুই যুগ ধরে শিক্ষা কর্মকর্তাদের বুড়া আঙ্গুল দেখিয়ে অর্থ লুটপাটের কর্মকাণ্ড। ইতিমধ্যে তিনি গড়ে তুলেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। রাম রাজত্ব,অর্থ লুটপাট,ইচ্ছামত কমিটি তৈরীসহ নানা অপকর্মে স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে।

ছবি: ভোরের কাগজ

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তার সহকর্মী, একই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মালেক গাজীর নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে যশোর বোর্ডে অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম ভূঁইয়া অনিয়ম তদন্তের দায়িত্ব দেন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সঞ্জীব কুমার দাসকে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে দাখিল করেন।

ছবি: ভোরের কাগজ

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৯৯ সালের জুনে কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (ভুয়া কম্পিউটার সনদ ও স্নাতকে ৩য় শ্রেণি) তথ্য গোপন রেখে সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) হিসেবে যোগদান করেন মালেক গাজী। ওই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালার জনবল কাঠামো ১৯৯৫ অনুযায়ী প্রার্থীকে এসএসসি, এইচএসসি ও স্নাতক শ্রেণিতে দ্বিতীয় বিভাগে পাস থাকতে হবে। কিন্তু সে সময় তিনি বেসরকারি অনুমোদহীন প্রতিষ্ঠান থেকে ভুয়া কম্পিউটার সার্টিফিকেট দাখিল করেছেন। এছাড়া তার স্নাতক ডিগ্রীও ছিল ৩য় শ্রেণির। সব কিছু গোপন রেখে শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের চোখে ধুলো, অভিযুক্ত মালেক গাজী সকল পরীক্ষায় ২য় বিভাগে পাশ উল্লেখ করে ২ হাজার ৫৫০ টাকা স্কেলের পরিবর্তে ৩ হাজার ৪০০ টাকার স্কেলে বেতন ভাতা গ্রহণ করা শুরু করেন।

ছবি: ভোরের কাগজ

দেখা গেছে, প্রতিটি শিক্ষকের ক্ষেত্রে নিয়োগের পর, আবেদন সাপেক্ষে বিষয় অনুমোদন ও এমপিওভুক্তির আইন আছে। কিন্তু ২০০১ সালের ২০ নভেম্বর কারিমা স্কুল কর্তৃপক্ষ কম্পিউটার বিষয় খোলার আবেদন করেন। ২০০২ সালের ৩১ জুলাই যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ডের উপ—পরিচালক নবম ও দশম শ্রেণিতে কম্পিউটার বিষয় খোলার অনুমতিতে সাক্ষর করেন। মজার ব্যপার হলো , বিষয় অনুমোদন হওয়ার আগেই মালেক গাজী নিয়ম বহির্ভূতভাবে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর এমপিওভুক্ত হন।

ছবি: ভোরের কাগজ

নিজের বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ নিয়েই ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সাতক্ষীরা সদরের নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রে জনবল কাঠামোর শর্তানুযায়ী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি) থেকে বিএড সনদ অর্জন করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু তিনি নিয়ম না মেনে ‘রয়েল ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা’ থেকে ভুয়া বি এড সনদ দাখিল করেন। ওই সনদে রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও সিরিয়াল নং খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেটি পরবর্তীতে তদন্ত প্রতিবেদনে দেখো গেছে।

ছবি: ভোরের কাগজ

এদিকে অভিযোগ আছে ২০১৪ সালের জুনে নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়টি সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (সেকায়েপ) থেকে ১ লাখ টাকা উদ্দীপনা পুরস্কার পায়। কিন্তু মালেক গাজী সেকায়েপ নীতিমালার শর্তভেঙ্গে ২০২১ সালে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন। এ বিষয়ে তদন্তের সময় তিনি অর্থ কোন কাজে ব্যয় করেছেন তা দেখাতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যোগদানের পর বিদ্যালয়টিতে তিনি কোন অর্থ কমিটি করেন নি, ফলে বিদ্যালয়টির কোন আর্থিক হিসাব লিপিবদ্ধ নেই। 

ছবি: ভোরের কাগজ

সরকারি নিয়ম-নীতি না মেনে (২০২২ সালে কমিটির সিদ্ধান্তে) মালেক গাজী (অতিরিক্ত) প্রতি শ্রেণিতে দুইটি বাড়তি শাখা খুলে ও ২৫ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন, এটির কোন অনুমোদন নেই। কোচিংয়ের নামে ৩ শতাধিক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি হাতিয়ে নিচ্ছেন ৬০০-৭০০ টাকা, যেটি মোট হিসেবে প্রায় ৩ লক্ষ। যদিও এই কোচিংয়ের সরকারি কোন অনুমোদন নেই। 

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। কিন্তু প্রভাবশালী মালেক গাজী এখনো নিজের দায়িত্বে আছেন এবং নিয়মিত বেতন-ভাতাও তুলছেন।

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীর সঙ্গে কথা বললে তিনি ভোরের কাগজকে জানান- ‘ভাই আপনার সাথে আমার কোন ঝগড়া নেই, ভাল সম্পর্ক আছে। কোন কিছু জানা লাগবে না, দেখা হলে ঠিক হয়ে যাবে।’

এছাড়া স্কুলের অর্থ লুটপাট ও জাল সার্টিফিকেট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন ভাই কিছু শোনা লাগবেনা, দেখা হলে ঠিক হয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে যশোর বোর্ডর চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আহসান হবিব বলেন- ‘এ ধরনের কাজে অভিযুক্ত শিক্ষকে বেতন-ভাতা বন্ধে আমি শীঘ্রই কমিটিকে চিঠি দিবো। পাশাপাশি তার সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশও করবো। পরে আমরা তাকে স্থায়ী বরখাস্ত করবো।’

বেতন-ভাতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার চাকুরী জীবনের সমগ্র বেতন-ভাতা ফেরত পূর্বক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App