×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

মুক্তচিন্তা

যুদ্ধেই তো আজকের বাংলাদেশ

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৩, ১২:২৫ এএম

যুদ্ধেই তো আজকের বাংলাদেশ

‘মেইল ট্রেন একটানা ছুটে চলেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রথম শ্রেণির একটি কক্ষে আমি একা। সিলেট থেকে রংপুরে যাচ্ছি। মাঝখানে ট্রেন বদলির কারণে ঢাকায় কিছুক্ষণের জন্য যাত্রাবিরতি’ কিংবা ‘মেঘের আকারকে কল্পনার আঙ্গিকে সহজেই যে কোনো কিছুর সঙ্গে এক করে দেখা যায়। খোলা মাঠের ভেতর দিয়ে সারি বেঁধে হেঁটে যাওয়া গ্রামগুলো ভীষণ ভালো লাগছিল। এমন দৃশ্য দেখিনি গত এক বছর। এই একটি বছরের মতো আমার কেটেছে সেনা প্রশিক্ষণে পশ্চিম পাকিস্তানে। ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’ বইয়ের শুরুটা এ রকমই, যা প্রকাশিত হয়েছে ৩০ বছরেরও আগে। মেজর নাসির উদ্দিনের এই বইটি প্রথমে মনে হয়েছে কোনো গল্প কিংবা উপন্যাস। ওপরের বাক্যগুলোতে তাই প্রতীয়মান হয় প্রথম পাঠে। কিন্তু যতই এগোতে থাকি, ততই যেন বিস্ময় লাগে। শুধুই যুদ্ধ আর পাকবাহিনীর বাঙালি নিধনের নৃশংসতা দিয়েই তিনি আটকে থাকেননি। তোলে এনেছেন সেই সময়ের পাকিস্তানি সেনা সংস্কৃতিরও এক অদ্ভুত মূল্যবোধ (!), যা আজ ৫২ বছর পরও হয়তো এর ব্যত্যয় ঘটেনি। কমান্ডিং অফিসার কর্নেল সাগিরের সঙ্গে প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ তার সৈনিক জীবনে প্রথম আঘাত। রংপুর পৌঁছার পরদিনই তিনি সাগিরের রুমে যান। ‘তার রুমে ঢুকে সামরিক কায়দায় অভিবাদন সেরে বসার অনুমতির অপেক্ষায় থাকলাম। কিছুটা বিলম্বে আমার দিকে না তাকিয়ে তিনি বসার নির্দেশ দিলেন। এরপর টেবিলের ফাইলপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে ঠিক একই ভঙ্গিতে প্রথম প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার প্রিয় পানীয় কোনটি?’ তিনি ‘ফানটা স্কোয়াশ’ বললে সাগির পাল্টা উত্তরটা দিলেন সফট ড্রিংকস নয় হার্ড ড্রিংকস! রংপুরে চাকরিতে যুক্ত হওয়ার পর প্রথম সপ্তাহ শেষের (উইকএন্ড) মদ আর নারীদের ঝমকালো অনুষ্ঠানটি তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। সাগিরের স্ত্রীর সঙ্গে তরুণ অফিসার নাসিরের সাক্ষাৎ তার অনুভূতিতে আরেকটা নতুন কিছুর জন্ম দিয়েছিল সেদিন। হয়তো গল্পচ্ছলে নাসির উদ্দিনকে নিয়ে রসকৌতুক করেছিলেন সাগির তার স্ত্রী সাদেকার কাছে কোনো এক সময়। তাই অনুষ্ঠানের দিন সাদেকা নাসিরকে প্রথম দৃষ্টিতেই চিনে ফেলেন। নাসির উচ্ছ¡াস কিংবা ভয়-ভালোবাসা নিয়ে নয়, তিনি এ মহিলাকে আবিষ্কার করেছেন এক ভিন্ন মানুষ হিসেবে, যা শুধু গল্প আর উপন্যাসের চরিত্রগুলোতে দেখা যায়। কোনো অবজ্ঞা নয়, সাগিরের স্ত্রী তার সঙ্গে নিজে এসেই আলাপ করেছেন। না করুণা না ভালোবাসা- তার লেখায় অস্পষ্ট থাকলেও ফুটে উঠেছে চাকচিক্য আর জৌলসময় মাতাল জীবনে একজন সাদেকার নির্লিপ্ত জীবন। আর তাই নাসিরকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন হয়তো ভালোবাসায়, হয়তো স্নেহে। যদিও সাগির এসে একসময় সাদেকার সঙ্গে আবারো পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেছেন পানাসক্ত অবস্থায় এবং মনে করিয়ে দিয়েছেন সে এক বাঙালি অফিসার। সে সময়ে ইসলামি আদর্শবোধের সেøাগানেই পরিচালিত হচ্ছে দেশ। সেনারাই দেশটার নেতৃত্বে আছে। তরুণ অফিসার নাসির ওই ইসলামি মূল্যবোধের সেøাগানকে মেলাতে থাকেন এ সময় বেসামাল অফিসারদের মধ্যরাতের অবাধ যৌনাচারের সঙ্গে। আসা যেতে পারে তার প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ের সামান্য আলোকপাতে। সে সময় তিনি একজন বাঙালি হিসেবে যে আচরণ পেয়েছেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছ থেকে, তা তুলে ধরেছেন। শুধু অফিসাররাই নয়, এমনকি সংকটকালে জুনিয়ররাও চোখ বদলে ফেলেছে। দারোয়ানের দায়িত্বে নিয়োজিতরাও কীভাবে নৃশংস হয়ে উঠে বাঙালিদের প্রতি, তার বর্ণনাগুলো উঠে এসেছে বীভৎসভাবে। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলা, কথায় কথায় বাঙাল কিংবা বেজাত হিসেবে আখ্যা দেয়া এমনকি জাত-পাত তোলে গালি দিতেও কুণ্ঠিত হতো না তারা। তিনি তার একজন ড্রিল ইন্সট্রাক্টরের ন্যক্কারজনক আপত্তিকর শব্দপ্রয়োগে ‘কামিনে’ হিসেবে গালি দিয়ে তাকে বলেছে, তিনি যেন বাংলায় গিয়ে জলায় মাছ ধরার কাজে লেগে যান। অফিসাররা মনে করত মাছ ধরাটাই যেন বাঙালিদের মূল পেশা। নাসির উল্লেখ করেছেন, মেজর শাহেদ আহম্মেদ আতাউল্লাহ নামের এক প্রশিক্ষকের কথা, যিনি চরম বাঙালি বিদ্বেষকারীদের একজন। যদিও ওই ইনস্ট্রাকটর নাসিরকে কিছুটা হলেও স্নেহ করতেন বলেই তার বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাসের জোরেই একদিন তাকে বলেছিলেন, আপনি কি কখনো পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছেন? আতাউল্লাহ দাম্ভিক উচ্চারণে বলেছিলেন আল্লাহ যেন কোনোদিন সেখানে (পূর্ব পাকিস্তান) না নেন। প্রশিক্ষণ শিবিরে দুজন বাঙালি একত্রিত হয়ে বাংলায় কথা বললে পশ্চিম পাকিস্তানিদের আপত্তি উঠত, তখন শৃঙ্খলার কথা আসত, বলা হতো একাডেমিতে আলাপের ভাষা হবে শুধুই ইংরেজি। অথচ তারা নিজেদের মাঝে উর্দু, পাঞ্জাবি, পশতু এমনকি সিন্ধি ভাষায় কথা বলত। মাঝে মাঝে প্রশিক্ষকরা এমনকি উর্দু ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতেও দেখা যেত। কিন্তু রাজনৈতিক আর ধর্মীয় ঢাল ব্যবহার করে সেনা শিবিরেও সে কথাটাই উচ্চারণ করা হতো, উর্দুই হলো একমাত্র মুসলমানের ভাষা। এই ভাষা ছাড়া আর কোনো ভাষায় মুসলমানিত্ব নেই। জাতি হিসেবে পাকিস্তানিরা বাঙালিদের কীভাবে দেখত, তার বইয়ে সে চিত্রগুলো নির্মমভাবে ফুটে উঠেছে। বইটিতে শুধুই তোলে ধরা হয়নি যুদ্ধের নৃশংসতার কথা। বাংলা আর বাঙালি জাতির উত্থানের রাজনৈতিক পটভূমি এখানে উঠে এসেছে একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতো করেই। তার বইয়ের বিভিন্ন অংশজুড়েই আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কিংবদন্তিতুল্য নেতৃত্বের কথা। বিশেষত নির্বাচন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও ভুট্টুর বেইমানি আর প্রকারান্তরে যুদ্ধের মতো বিভীষিকা সৃষ্টির পেছনের ঘটনাগুলো উঠে এসেছে ইতিহাসের প্রধান আকর হিসেবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের লোকদের দাস বানানোর ইচ্ছের চিত্রটা তোলে ধরেছেন পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতির নেতাদের বিকৃত মন-মানসিকতার বিশ্লেষণ দিয়েই। আর এসব পর্যবেক্ষণের এক পর্যায়েই যুদ্ধের শুরু। তিনি বর্ণনা দিয়েছেন তার কর্মস্থল রংপুর সেনানীবাসের গণহত্যার লোমহর্ষক ঘটনাগুলো। ২৭ মার্চ কীভাবে স্থানীয় নেতাদের একটা উদ্ভট সিদ্ধান্তের বলি হলো ক্যান্টনম্যান্টে এলাকার শত শত স্থানীয় জনগণ। কারণ দা-বল্লম হাতে করে সাধারণ মানুষগুলো ঘেরাও করতে এসেছিল সে সময়ের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত একটা সেনানীবাস। এদের থেকে সেনানীবাস রক্ষা করতে স্থানীয় মানুষগুলোর ওপর কীভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাক হায়নারা। দিন-দুপুরে ৫-৬শ মানুষ হত্যা করে তারা। যেখানে বাঙালি সব অফিসাররা ছিলেন এক ধরনের বন্দি। এই বন্দিদশায়ই পাক আর্মি অফিসারদের নেতৃত্বে কীভাবে লাশগুলো জ্বালিয়ে দেয় তারা, তারও এক জীবন্ত সাক্ষী নাসির উদ্দিন। নাসির নিজেই স্বীকার করছেন একজন সাধারণ সৈনিক আতিয়ারের কথা, কীভাবে তিনি তার অফিসারকে (নাসির) বলছেন বিদ্রোহের কথা। তিনি বলছেন ‘একজন সাধারণ বাঙালি সৈনিক আতিয়ারের কাছে আমার মাথা নত হয়ে গেল’। বাস্তবতা, এই হলো প্রতিবাদ, আতিয়ার প্রতিবাদ করেননি, সরাসরি বিদ্রোহী হতে চেয়েছেন। নাসির যেটা পারেননি, আতিয়ার সেটাই তার অন্তরে লালন করেছেন। এবং একজন নাসিরকে বলেই ফেলেছেন, ‘শেখ সাহেব স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। আর বসে থাকার সময় নেই স্যার, কিছু একটা করুন।’ বিদ্রোহ মানেই দ্রোহের উচ্চারণ, লড়ে যাওয়ার শপথ। শুরু হয় নিচ থেকে। ওপর থেকে নয়। এখানেই নাসির ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসহীন হননি, যদিও তিনি ক্ষোভে-অপমানে-দ্রোহে ভেতরে ভেতরে জ্বলছিলেন, প্রতিবাদী হলেও প্রতিবাদ করতে পারেননি, তিনি উচ্চারণ করতে পারেননি অন্য অফিসারদের সঙ্গে আতিয়ারের মতো স্বাধীনতার কথা। নিঃসন্দেহে এখানে তিনি পরাজিত, বিদ্রোহী কিংবা বিপ্লবী কোনোটাই নন। কিন্তু এ নিয়ে তিনি লুকোচুরি খেলেননি। আর সেজন্যই তিনি বলেছেন, ‘সময় মতোই সাধারণ সৈনিকরা সব কিছুই বুঝে উঠতে পেরেছিল। কিন্তু তারা ছিল নেতৃত্বহীন আর আমরা ছিলাম মাঝখানে, যেখানে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ যেমন ছিল না, তেমনি আমাদেরও একটি সঠিক পথ নির্দেশনা দেবে এমন একজন ঊর্ধ্বতন বাঙালির দেখা কখনো মেলেনি।’ আর তাই যা হবার তা-ই হলো। বাঙালি সেনাদের ওপর নির্বিচারে আক্রমণ হলো। নিহত হলেন অফিসার-সাধারণ সেনারা। ধর্ষণ থেকে কোনো বাঙালি মেয়েই রক্ষা পেল না ওই মার্চের শেষ দিনগুলোতে। এই তো শুরু। তারপর প্রেম হোক আর স্নেহ হোক উগ্র এবং ঠাণ্ডা মাথায় বাঙালি হত্যাকারী সাগিরের স্ত্রী সাদেকার সহায়তায়ই একসময় নিরাপদে পালিয়ে আসা নাসির উদ্দিনের- পরের অধ্যায় রক্তঝরা ইতিহাস। যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা। আতিয়ারের মতো সাধারণ সৈনিকদের দ্রোহের উচ্চারণে এবং পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-শ্রমিক-খেটে খাওয়া মানুষের রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়ে যুদ্ধে যুদ্ধেই তো আমাদের আজকের বাংলাদেশ।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক। [email protected]

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App