মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ঢাবি শাখার নেতৃত্বে জয়-উদয়

আগের সংবাদ

ফিলিপাইনে বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ২

পরের সংবাদ

রাজ্যে রাজ্যে মোদিকে নিয়ে তৈরি বিবিসির ডকুমেন্টারি প্রদর্শনীর উদ্যোগ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২৩ , ৬:৩৩ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২৫, ২০২৩ , ৬:৩৩ অপরাহ্ণ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জড়িয়ে বিবিসি একটি ডকুমেন্টারি (তথ্যচিত্র) প্রকাশ করেছে। এ ডকুমেন্টারিটিতে গুজরাটের ২০০২ সালের হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় রাজ্যটির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূমিকা কী ছিল তা দেখানো হয়েছে। দুই পর্বের ‘ইন্ডিয়া : দ্য মোদি কোয়েশ্চেন’ নামের ডকুমেন্টারিটার প্রদর্শনী, লিংক শেয়ারিং ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেছে মোদি সরকার। কিন্তু সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ডকুমেন্টারিটা প্রতি রাজ্যে প্রদর্শনীর ঘোষণা দিয়েছে দ্য স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া ( এসএফআই)।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী বুধবার (২৫ জানুয়ারি) দিল্লির বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া ইসলামিয়া মিল্লিয়ায় ডকুমেন্টারিটা প্রদর্শনীর আয়োজন শুরু করে এসএফআই। কিন্তু তাদের কাজে বাধা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ডেকে আনা হয় দাঙ্গা পুলিশ। খবর রয়টার্সের।

বাংলাদেশ সময় বিকাল ৫টার দিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জামিয়া মিল্লিয়ায় ডকুমেন্টারিটার প্রদর্শনী সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে এসএফআইয়ের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘দেশে অঘোষিতভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু তারা এভাবে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে পারবে না। ডকুমেন্টারিটা প্রতি রাজ্যে প্রদর্শনীর পরিকল্পনা করছে এসএফআই।’

আগের দিন মঙ্গলবার ডকুমেন্টারিটা দিল্লির আরেক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতেও প্রদর্শনীর ঘোষণা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হুমকি সত্ত্বেও স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে নিজেদের কার্যালয়ে ডকুমেন্টারিটার প্রদর্শনীর আয়োজন প্রায় শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের সংগঠন জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন।

কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের ঠিক আগ মুহূর্তে শুরু হয় ব্যাপক লোডশেডিং। ফলে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীরা ডকুমেন্টারিটা আর দেখতে পারেননি।

ইউনিয়নটির নেতা ঐশী ঘোষ অভিযোগ করে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষই যে লোডশেডিংয়ের ব্যবস্থা করেছে, তা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরও মোবাইল ও ল্যাপটপে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী ডকুমেন্টারিটা দেখেছে। আমরা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ডকুমেন্টারিটা প্রদর্শনীর আয়োজন করার জন্য আহ্বান জানাই। সরকারের সেন্সরের বিরুদ্ধে এটা এক ধরনের প্রতিরোধ।’

অন্যদিকে নিজেদের কার্যালয়ে ডানপন্থি শিক্ষার্থীদের সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ ইট-পাটকেল ছুড়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ঐশী ঘোষ।

নিষেধাজ্ঞা

‘ইন্ডিয়া : দ্য মোদি কোয়েশ্চেন’ নামের ডকুমেন্টারিটার প্রদর্শনী ও লিংক শেয়ারিং শনিবার (২১ জানুয়ারি) থেকে নিষিদ্ধ করেছে বিজেপি সরকার। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ‘বৈরি প্রচারণা ও ভারতবিরোধী আবর্জনা’ আখ্যা দিয়ে ডকুমেন্টারিটির প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়।

বিজেপি সরকারের উপদেষ্টা কাঞ্চন গুপ্তা গত শনিবার এক টুইটে জানান, ‘বিবিসি ওয়ার্ল্ড বৈরি প্রচারণা ও ভারতবিরোধী আবর্জনার ছদ্মবেশে একটি ভিডিও শেয়ার করে ডকুমেন্টারির নামে চালাচ্ছে। ভারত সরকারের আইটি আইন ও বিধিনিষেধ অনুযায়ী ডকুমেন্টারিটার ইউটিউব ও টুইটার শেয়ারিং লিংক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউটিউব ও টুইটার কোনো কোম্পানিই ভারতের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে রবিবার (২২ জানুয়ারি) পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।

দুই পর্বের এই ডকুমেন্টারির প্রথম পর্ব ১৭ জানুয়ারি মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এতে দাঙ্গায় গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৮ জানুয়ারি) বিবিসির ডকুমেন্টারিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে মন্তব্য করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই দিন নিউইয়র্কভিত্তিক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ভ্যারাইটিকে নিজেদের ডকুমেন্টারিটি নিবিড় গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিবিসির এক মুখপাত্র।

বিজেপি সরকারের আপত্তি

১৭ জানুয়ারি ডকুমেন্টারিটি ইউটিউবে মুক্তি পাওয়ার পর ভারতে হইচই পড়ে যায়। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী বলেন, ‘এই ডকুমেন্টারি পক্ষপাতমূলক। এতে নৈর্ব্যক্তিকতার অভাব রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এতে ঔপনিবেশিক মানসিকতা নগ্নভাবে ধরা পড়েছে। এটা স্রেফ প্রোপাগান্ডা।’

বিবিসির জবাব

বিবিসির মুখপাত্র ভ্যারাইটি ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘এই ডকুমেন্টারি তৈরি করতে উচ্চ পর্যায়ের সম্পাদকীয় মান বজায় রেখে ব্যাপক গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। এটা তৈরির জন্য বিভিন্ন পক্ষ, প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এমনকি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতাদের মত নেওয়া হয়েছে। সংগ্রহ করা হয়েছে নানা ধরনের নথিপত্র।’

তবে বিবিসি মুখপাত্রের অভিযোগ, ডকুমেন্টারিটি তৈরি করতে ভারত সরকারের মত জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা মত দিতে রাজি হয়নি।

ডকুমেন্টারির উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওই মুখপাত্র বলেন, ‘ডকুমেন্টারিটির দুই পর্বে ভারতের সংখ্যাগুরু হিন্দু ও সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যকার উত্তেজনাকে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। আর বুঝতে চেষ্টা করা হয়েছে, এই দুই সম্প্রদায়ের উত্তেজনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির রাজনীতির সম্পর্কইবা কী?’

ডকুমেন্টারির মূল রসদ

দুই পর্বের ‘ইন্ডিয়া : দ্য মোদি কোয়েশ্চেন’ ডকুমেন্টারিতে নানা নথিপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং বিশেষজ্ঞ মতের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য সরকারের একটি প্রতিবেদন ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার পরপরই ঘটনা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাজ্য একটি বিশেষজ্ঞ দল পাঠায়। তারা খেটেখুঁটে প্রতিবেদনটি তৈরি করে। তবে প্রতিবেদনটি কখনও প্রকাশ করা হয়নি।

ডকুমেন্টারিতে কী বলা হয়েছে

যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতিবেদনের সারমর্ম ছিল, ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সহিংসতা যতটা বলে প্রচার করা হয়ে থাকে, প্রকৃতপক্ষে তা তার চেয়ে অনেক ভয়াবহ। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এটাও স্পষ্ট যে, দাঙ্গা চলাকালে ২৭ ফেব্রুয়ারি শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি বৈঠক করেন। দাঙ্গা বন্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ না নিতে তিনি তাদের আদেশ দেন।

পরবর্তী সময়ে দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরির পেছনেও মোদি সরাসরি জড়িত। কিন্তু দাঙ্গার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা বারবার অস্বীকার করেছেন তিনি।

ডকুমেন্টারির ভাষ্যমতে, যুক্তরাজ্য সরকারের তদন্ত দলে ছিলেন এমন এক সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক বলেন, ‘গুজরাট দাঙ্গার পরিকল্পনা করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। এটি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।’

গুজরাট দাঙ্গা

জানা যায়, গুজরাটের পঞ্চমহল জেলার গোধরা থেকে একটি ট্রেন হিন্দু পুণ্যার্থীদের নিয়ে রওনা করে। এটি ২৭ ফেব্রুয়ারি অযোধ্যায় পৌঁছালে মানুষের একটি দঙ্গল বা মব তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে অন্তত ৫৮ জন হিন্দু নিহত হন। তবে, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর গুজরাটে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়। মার্চ পর্যন্ত তা চলে। সরকারি প্রতিবেদন মতে, দাঙ্গায় ৭৯০ জন মুসলমান ও ২৫৪ জন হিন্দু নিহত হন।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, রাজ্য সরকার চাইলেই অল্প সময়ে দাঙ্গার লাগাম টানতে পারতেন। কিন্তু গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তা করেননি।

সুপ্রিম কোর্টের দায়মুক্তি

গুজরাট দাঙ্গা খতিয়ে দেখতে ২০০৮ সালে একটি বিশেষ তদন্ত দল (সিট) গঠন করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দাখিল করা সিটের প্রতিবেদনে বলা হয়, মোদি ও আরও ৬৩ জনের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার বিচারযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই। ২০১৩ সালে প্রতিবেদনটি একজন ম্যাজিস্ট্রেট গ্রহণ করেন।

২০১৩ সালেই সিটের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে জাকিয়া জাফরি নামের এক নারী সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ করেন। ২০২২ সালের ২৪ জুন তা বাতিল করে দেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। জাকিয়া গুজরাট দাঙ্গায় নিহত কংগ্রেস নেতা এহসান জাফরির স্ত্রী।

২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের আহমেদাবাদের গুলবার্গ সোসাইটিতে এক মবের শিকার হয়ে ৬৯ জন নিহত হন। এহসান জাফরি তাদের একজন।

ডকুমেন্টারির দ্বিতীয় পর্ব

ইন্ডিয়া : দ্য মোদি কোয়েশ্চনের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব ২৪ জানুয়ারি রাতে যুক্তরাজ্যে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ভারতের গণমাধ্যম দ্য ওয়্যারের এক প্রতিবেদনে।

দ্বিতীয় পর্বে ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর হিন্দু-মুসলমান উত্তেজনাকে মোদি সরকার কীভাবে ব্যবহার করেছে, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে। এই পর্বের মূলকথা, ২০১৯ সালে মোদি টানা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারতে হিন্দু-মুসলমান উত্তেজনা বেড়েছে।

এসএম

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়