সীমান্তে মিয়ানমারের গোলাগুলি : বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে

আগের সংবাদ

আমলার চোখে সত্তরের নির্বাচন

পরের সংবাদ

উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে

অজয় দাশগুপ্ত

কলাম লেখক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৩ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ২১, ২০২৩ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

আমার বয়স এখন চৌষট্টি। আমরা সে প্রজন্মের মানুষ যখন দোয়াতের কালি আর কলম ছিল ভরসা। প্রাইমারি ক্লাসে চক-খড়ি পরে পেন্সিল। অতপর কলমে উন্নতি। এই ছিল আমাদের জীবন। দিনে দিনে দোয়াতের কালির জমানা শেষ হয়ে এলো বল পেনের যুগ। কলমের নাম হয়ে গেল বলপেন। এখন এই ওয়ান টাইম বলপেনও তার বাজার হারিয়েছে। আমি যখন সিডনি এসে থিতু হই তখন আমার লেখালেখির বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কাগজ-কলম আর ফ্যাক্সের খরচ। দিস্তা দিস্তা কাগজ লাগত। সবাই যখন বিদেশে বড় টিভি সেট, দামি গাড়ি কিনতে ব্যস্ত তখন আমি কম করে হলেও তিনখানা ফ্যাক্স মেশিন কিনে ফেলেছিলাম। যাতে আমার লেখা পাঠানোর কাজ হয়। এরপর এলো সামাজিক মিডিয়ার যুগ। আমার স্ত্রী দীপা এসব বিষয় ভালো বোঝে। আমি সব সময় বলি সে প্রকৌশলী হলেই ভালো করত। সেই আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল। তারপর শুরু হলো বিপত্তি। রোমান হরফে টাইপ করি বটে মানুষ তার কিছুই বুঝত না। পারত না পাঠোদ্ধার করতে।
আমার কিছু বিজ্ঞ বন্ধু আছে সারা দুনিয়ায়। তাদের একজন ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন। কানাডা প্রবাসী রিটনের সঙ্গে প্রায়ই কথা হয় আমার। সেই মূলত আমাকে একরকম বাধ্য করে বাংলা টাইপ শিখতে। তার একটাই কথা ছিল তখন, দোস্ত তুমি পারবা। অভ্র ডাউনলোড করো তারপর শুরু করো। বলাবাহুল্য এর আগে যে কিবোর্ডে চেষ্টা করেছিলাম তা যেমন ছিল কষ্টসাধ্য তেমনি জটিল। অভ্র ডাউনলোডের পর থেকে আমাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। বলতে গেলে মহাবিখ্যাত ছড়াকার রিটনের চেয়েও বেশি লেখা পোস্ট করি আমি। যার কারণ অভ্র।
আচ্ছা এত বছর কেন এই অভ্র নিয়ে লিখছি, এর কারণ কী? কারণ আপনারা সবাই জানেন। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সব অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে বিজয় কিবোর্ড ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে আমদানিকরা ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সব অ্যান্ড্রয়েড ফোনে বিজয় অ্যান্ড্রয়েড এপিকে ফাইল ব্যবহারের লক্ষ্যে কমিশনের স্পেকট্রাম বিভাগ থেকে বিনামূল্যে বিজয় অ্যান্ড্রয়েড এপিকে ফাইল সরবরাহ করা হবে। আরো বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সব অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন কমিশন থেকে বাজারজাতকরণের অনুমতি গ্রহণের পূর্বে বিজয় অ্যান্ড্রয়েড এপিকে ফাইল ইনস্টল করে কমিশনে তা প্রদর্শন করতে হবে। তা না হলে বাজারজাতকরণের অনাপত্তি প্রদান করা হবে না। এতেই স্পষ্ট বিজয়কে পপুলার করার এটা একটা সরকারি চেষ্টা। বহু বছর ধরে বিজয় প্রতিযোগিতা করেও পারেনি। কারণ মানুষের মনে, মানুষের মগজে আর হাতের আঙুলে জায়গা করে নিয়েছে মেহেদীর অভ্র। তার সম্পর্কে নতুন কিছু বলার নেই। নিচে তার কাজ ও অভ্র আবিষ্কারের যে ঘটনা তুলে ধরলাম তার সূত্র বিভিন্ন লেখায় উঠে আসা অভ্র ও তার জনকের কাহিনী। এই উদ্ধৃত অংশের জন্য কুম্ভিলক বৃত্তির দায় নিতে রাজি নয় এই লেখাটি।
অভ্রর আবিষ্কারক মেহেদী হাসান। তার আবিষ্কৃত সফটওয়্যার যত সহজে কম্পিউটারে বাংলা লেখার দীর্ঘ ঝক্কি-ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে, অভ্র তৈরির পথটা কিন্তু ততটা সহজ আর মসৃণ ছিল না। ২০০৩ সাল। বাংলা একাডেমিতে চলছিল বইমেলা। সেই বইমেলায় বাংলা ইনভেনশ থ্রæ ওপেন সোর্স, সংক্ষেপে বায়োস একটি সংগঠন অংশ নিয়েছিল। সংস্থাটি বইমেলায় এসেছিল একটি প্রদর্শনী করতে। এই সংগঠনের সদস্যরা মেলায় বাংলায় লোকালাইজ করা বাংলা লিনাক্স একটি লিনাক্স ডিস্ট্রোর প্রদর্শনী করেছিল। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কম্পিউটারে বাংলা লেখাসহ টাইটেল মেনু ও ট্যাবের নামকরণ বাংলায় লেখা। ওই সিস্টেমটি নজর কাড়ে সবার, পরিচিতি পায় বায়োস।
সেদিন সেই প্রদর্শনী একজন খুদে দর্শনার্থী ছিলেন মেহেদী। বায়োসের প্রদর্শনী দেখে তার মাথায় আসে এক অন্যরকম চিন্তা। কীভাবে এমন একটি সহজ সমাধান বের করা যায় যার মাধ্যমে কম্পিউটারে কোনো ঝামেলা ছাড়াই বাংলা লেখা যাবে। ২০০৩-এর বইমেলার সেই ছোট্ট ছেলেটিই ২০১৪ সালে অভ্র সফটওয়্যারের আবিষ্কারক ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র মেহেদী হাসান।
অভ্রর আবিষ্কারে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে মেহেদী হাসানকে। তার কম্পিউটার উইনডোজ বেজড হওয়ায় লিনাক্স নিয়ে কাজ করাটা তার জন্য দুরূহ হয়ে ওঠে। বাংলা লিনাক্সের ওই ফন্টটি ইনস্টল করেন তিনি। এ সময়ই তার চোখে পড়ল অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড কিবোর্ডের ইনসার্ট ক্যারেক্টার ব্যবহার করে ওই ফন্টের ক্যারেক্টারগুলোকে বেশ ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এটি খুবই যন্ত্রণাদায়ক এবং সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আরো কষ্টকর ছিল যুক্তাক্ষর লেখা।
এবার তিনি ভাবলেন, একটি কিবোর্ড এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে। তিনি ভেবেছিলেন কোথাও থেকে একটি কিবোর্ড নামিয়ে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু তা আর হলো না। তিনি বুঝতে পারলেন, এমন কিবোর্ড পেতে হলে তাকে কিবোর্ড তৈরি করতে হবে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব সেটা? সমস্যা সমাধানে তিনি ক্ল্যাসিক ভিজুয়্যালের ওপর ভিত্তি করে নতুন আরো একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করলেন। ফলে ক্রাশের হাত থেকে মুক্তি পেল প্রোটোটাইপটি। সার্থক হলো তার সেই বইমেলায় বায়োসের তৈরি ফন্ট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে শুরু করা দীর্ঘযাত্রা।
অভ্রর যাত্রা শুরুতে মেহেদী একা থাকলেও শেষে ধাপে ধাপে যুক্ত হয়েছেন অনেকেই, তৈরি হয়েছিল অভ্র টিম। অভ্রর ম্যাক ভার্সন প্রস্তুতকারী রিফাত উন নবী, অভ্রর কালপুরুষ ও সিয়াম রুপালি ফন্টের জনক সিয়াম, অভ্রর বর্তমান ওয়েবসাইট ও লিনাক্স ভার্সন প্রস্তুতকারী সারিম, ভারতের নিপন এবং মেহেদীর সহধর্মিণী সুমাইয়া নাজমুনসহ অনেকের কষ্টের ফসল আজকের অভ্র।
আমরা এমন এক দেশ ও সমাজের মানুষ যেখানে কেউ কাউকে সম্মান করি না। এ লেখা যখন লিখছি তখন পাঠ্য বইয়ের ভুলভ্রান্তির দায়ে জাতি হামলে পড়েছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর। যেন সব দোষ তার। অন্যদিকে অভ্রের জয়রথ থামানোর চেষ্টা যদি ফলবতী হয় তো আমরা হারাব মেহেদী হাসানের মতো প্রতিভাবান তরুণের জয়গাথা। মেহেদীকে আমি কখনো দেখিনি। চিনিও না। কিন্তু তার আবিষ্কৃত ফন্টটি খোলার সময় প্রতিবার যখন দেখি ভাষা হোক উন্মুক্ত নামের লোগো তখন আমার মন ভরে যায়।
রবীন্দ্রনাথ তার গানে লিখেছেন, উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে ওই যে তিনি ওই যে বাহির পথে… অভ্রভেদী বাঙালি আবিষ্কারক মেহেদী হাসানের অভ্র বেঁচে থাকুক। মেহেদী ও তার অভ্র হোক পুরস্কৃত।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়