×

মুক্তচিন্তা

মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের বিজয়

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:৩৭ এএম

বাংলাদেশের বিজয় একান্ন পাড়ি দিয়েছে। অনেক ক’টা বছর। একজন ব্যক্তির জীবনে বয়সের এই ধাপটা বেশ পরিণত এবং জীবন সায়াহ্নের প্রায় কাছাকাছি। মধ্যবয়সি ব্যক্তির জীবনে অভিজ্ঞতার ভার তাকে পরবর্তী জীবনে নিয়ন্ত্রণে ও পরিচালনায় সহায়তা করে। রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির জীবনের বয়সের তফাৎ থাকে। একটি রাষ্ট্রের বিজয় বা স্বাধীনতার বয়সের সঙ্গে ব্যক্তির বয়স তুলনা করা যায় না। কারণ ব্যক্তির জন্ম ও মৃত্যু বিধাতা কর্তৃক নির্ধারিত এবং বয়সের গড় আয়ু অনুমান ভিত্তিক, যা পরিসংখ্যানে ধারণা করা সম্ভব। একটি রাষ্ট্র শত শত বছর টিকে গেলেও একজন ব্যক্তি বেঁচে থাকার বয়স সেই অনুপাতে হয় না। সর্বোচ্চ দেড়শ বছর বাঁচতে পারে। এটাও একটি ব্যতিক্রম ঘটনা। মানবজাতির জীবিত অস্তিত্বের সময়সীমা খুবই কম। তবে রাষ্ট্র বা ব্যক্তি উভয়ই বিভিন্ন কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যে ঝুঁকি আবার অস্তিত্বের সংকট সৃষ্টি করে থাকে। ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের স্ব-স্ব অসঙ্গতি, অদূরদর্শিতা এর অন্যতম কারণ হতে পারে। ব্যক্তির অকাল মৃত্যু বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাহীনতা এর উদাহরণ। যাই হোক বিজয়ের এতটা বয়সে বা সময়ে পরিবর্তন এসেছে নাগরিকের জীবনাচরণ, দর্শন, সামাজিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে। একটা কথা না বললেই নয় যে, সব পরিবর্তন যে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বা অনুসরণ করে হয়েছে বা হচ্ছে তা কিন্তু নয়। কথাটা কঠিন হলেও সত্য। মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় আমাদের একটি পবিত্র সংবিধান দিয়েছে। সেই সংবিধান কতটা সব পরিবর্তনে অনুসৃত হয়েছে বা হচ্ছে, তা বলা মুশকিল। কিংবা অনেকের কাছে খুবই পরিষ্কার। যাই হোক, এই সংবিধানসম্মতভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালিত হওয়ার কথা। প্রতিটি নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এই পবিত্র সংবিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে, মেনে চলবে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিনিময়ে যে বিজয়, সেটা সেই বিজয়েরই কথা, তারই মর্ম কথা। তেমনটাই তো হওয়ার ছিল। তরুণ প্রজন্ম বলতে পারে কিনা সরল বাক্যে ও সহজে যে, কেন মুক্তিযুদ্ধের অবতারণা কিংবা এদেশের বিজয়টা কীভাবে অর্জিত হয়েছে। এমন একটি বিজয়ের পেছনে কোন মূলমন্ত্র কাজ করেছে, কে এই মহান স্বপ্নের বীজ বপন করেছেন এবং কারা এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে জীবনবাজি রেখেছেন, জীবন দিয়েছেন। যেটা বলবে, সেটা হবে নির্ঘাত দলীয় রাজনৈতিক মন্তব্য বা বিশ্বাস এবং প্রচারণা। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তো নয়ই যা বলবে। সবচাইতে দুঃখজনক ঘটনা হলো, কোন কোন রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে রচনা করেছে, করছে যা অনেকাংশেই সত্যের অবমাননা। প্রকৃত ইতিহাস তো নয়ই সেসব। ফলে এদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হয়ে আছে দ্বিখণ্ডিত। একটা স্বাধীন জাতির জন্য এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে। ব্যর্থতার কথা আর নাই বলি। যেসব ব্যক্তি একাত্তরের পরবর্তীতে জন্মেছে, তারা মুক্তিযুদ্ধ এবং বিজয়কে যেভাবে দেখে, দেখতে ও বুঝতে শিখছে এবং উপলব্ধি করছে, ষাট দশকে জন্মেছে এমন কেউ কিন্তু সেইভাবে মুক্তিযুদ্ধকে দেখে না, দেখতে চায় না। উপলব্ধি করা তো দূরের কথা। কারণ ষাট দশকের ব্যক্তিটি মুক্তিযুদ্ধকে নিজ চোখে দেখেছে। জয় বাংলা সেøাগান শুনেছে। শুনেছে মা-বোনের সম্ভ্রমহানির করুণ আর্তনাদ। ফলে মুক্তিযুদ্ধ তার চেতনা, আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় অবস্থান নিয়েছে অতিসহজে। সে হয়েছে আবেগাপ্লুত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে। বিজয় ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা প্রত্যক্ষ করে সে বেড়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতের মাত্রা ও পরিমাণ সে বুঝে। পরিমাপ করতে পারে। কিন্তু বিজয়ের পরবর্তী সময়ে জন্মগ্রহণেরা পরজীবীর মতো মুক্তিযুদ্ধকে চেনে, জানে ও বুঝে। তাদের যেভাবে বলা হয়, বুঝানো হয় তারা সেভাবেই চেতনায় জাগ্রত হয়। রাজনৈতিক মতানৈক্য ও বিভাজন প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধ বা বিজয়কে সঠিকভাবে বুঝতে না দেয়ার একটি অন্যতম কারণ বলে অনেকেই মনে করে। এই কাজটিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল ও তাদের রাজনৈতিক অনুসারীরা। তারা সুযোগ পেলেই স্বাধীন রাষ্ট্রকে পরাধীন করার পাঁয়তারা চালিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তারা হাতও বাড়িয়েছে। হস্তক্ষেপে অস্পষ্ট করেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করেছে, প্রকৃত ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গভীর সম্পর্ক, তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ইত্যাদি এমন অনেক মূল্যবান তথ্য তারা জানতে পারেনি, তাদের জানতে দেয়া হয়নি। তারা বাংলাদেশের জন্য ভিন্ন দেশপ্রেম বয়ে বেরিয়েছে এবং তা প্রকাশে মত্ত ও তৎপর থেকেছে। স্বাধীনতা বিরোধীদের অপতৎপরতায় দীর্ঘদিন যাবৎ বঙ্গবন্ধুর নাম ও তার অবদানের কথা প্রকাশ্যে আনা হয়নি, আসতে দেয়া হয়নি। তার নাম মুছে দেয়ার পাঁয়তারা ও চক্রান্ত চলেছে। কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাষ্ট্র, বাঙালি জাতিসত্তা এবং তার নিরাপত্তার বিষয়টি। এমন একটি রাজনৈতিক অপতৎপরতা ও অপসংস্কৃতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী বিকাশ ও বহমান হতে মারাত্মক বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি-গোষ্ঠী ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য নিয়ে নির্বিচারে পরিচালিত হয়েছে, হচ্ছে। বলাবাহুল্য যে, বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতিতেও এর আঘাত পড়েছে। কালোছায়া পড়েছে। ক্রমশ ভিন্ন সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে অসচেতন নাগরিক। বাংলা ও বাঙালি জাতিসত্তার বৈশিষ্ট্য ক্রমশ ধূসর হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে, গেছেও। পোশাক-আশাক, জীবনাচারণে ও বিশ্বাসে ভিন্ন আবেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি দৃশ্যমান। বিস্তার লাভ করছে। রাস্তায় বের হলে ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জন নারীকেই বোরকা, হিজাব পরতে দেখা যায়, যা বাঙালি কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির কথা বলে না। এই পরিবর্তন বলে দেয়, নাগরিক চেতনা ক্রমশ কোনদিকে প্রবাহিত হচ্ছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ¤øান করার জন্য এ ধরনের সামাজিক আচরণ কতটা নেপথ্যে সক্রিয় থাকে তা বুঝার কেউ আছে কিনা জানি না। তবে সুদূরপ্রসারি লক্ষ্য নিয়ে কোনো দল বা গোষ্ঠী এগুচ্ছে কিনা তা বুঝার বোধশক্তি না থাকলে প্রতিটি নাগরিকের ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে একটি রাষ্ট্রের পঞ্চাশোর্ধ বিজয় উৎসবের পরও, এমন ধারণা করা সম্ভবত অযৌক্তিক হয় না। এজন্য প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ জনসচেতনতা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের এক মহান মুক্তিযুদ্ধ। যে যুদ্ধে বাঙালি জাতি নিরস্ত্রভাবেই শত্রæর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বাঙালি জাতির মুক্তি হয়েছিল। বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি পেয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্ব। সেই বিজয়, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে রক্ষা করার দায় ও দায়িত্ব কিন্তু প্রতিটি নাগরিকের। যেভাবে তারা স্বাধীনতার সংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়েছিল সম্মিলিতভাবে সেইভাবে দায়িত্বশীল ও দায়বোধ থাকতে হবে। বিজয়ের মাসে একটি কথা না বললেই নয় যে, রাজনৈতিক বিভাজন বা বিভেদকে স্পষ্ট ও গাঢ় করার জন্য প্রচার মাধ্যম কতটা দায়ী, তা ভেবে দেখছি কিনা। রাজনৈতিক দলের অন্ধ সমর্থকদের মতো চ্যানেলের দর্শক কিংবা পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের ঝগড়া, বিবাদ প্রচারের মধ্য কী মহত্ত্ব বা দেশপ্রেম থাকে বা থাকতে পারে, তা তারাই ভালো বলতে পারে। তবে রাষ্ট্রের এতে কোনো উপকার হয় না, হয়নি এটা নিশ্চিত। বরং রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে রাজনীতিকদের ঝগড়া বিবাদ, মিথ্যে কথা, গালিগালাজ শুনিয়ে আর যাই হোক রাষ্ট্রের পরিবর্তন আসে না, কখনো আসেনিও। উপরন্তু মিথ্যাচার, অসত্য, অশ্রদ্ধার কায়দা, কানুন বিনামূল্যে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায় সাধারণ মানুষ, তরুণ সমাজ। নেতিবাচক বিষয়াদি প্রচার যে কতটা সুপ্তভাবে ধ্বংস করছে জাতির বিবেক, সেটা বুঝার ক্ষমতাও যেন মিডিয়ার মালিকদের নেই। পরিশেষে বলব, মুক্তিযুদ্ধের বিনিময়ে যে বিজয় আমাদের, তা রক্ষা করার দায়িত্ব সকলের। দলীয় রাজনীতিতে এই বিজয়কে মূল্যায়ন না করে জাতির কল্যাণ দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করি। এই অর্জন সুরক্ষিত করার দায় ও দায়িত্ব কিন্তু সকলের। আর যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করে না, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, স্বাধীন রাষ্ট্রের যাবতীয় সুবিধাভোগ করে আর যাই করুন নেমকহারামীপনা করবেন না। স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক। swapna.reza@gmail.com

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

জুম্মার দিন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সাইরেনের শব্দ

জুম্মার দিন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সাইরেনের শব্দ

খড় পোড়ানোর আগুনে ২০ বিঘা জমির গম পুড়ে ছাই

খড় পোড়ানোর আগুনে ২০ বিঘা জমির গম পুড়ে ছাই

পেট্রোল পাম্পে পুলিশ সদস্যের উপর হামলা

পেট্রোল পাম্পে পুলিশ সদস্যের উপর হামলা

কোটি টাকার মালামালসহ ডাকাত দলের ৮ সদস্য গ্রেপ্তার

কোটি টাকার মালামালসহ ডাকাত দলের ৮ সদস্য গ্রেপ্তার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App