উন্নয়নে ম্যাজিক : স্বপ্ন পূরণে সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আগের সংবাদ

ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ জরুরি

পরের সংবাদ

বিজয়ের মাস, তবুও গন্তব্য নিয়ে ভাবনার শেষ নেই!

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৪, ২০২২ , ২:২৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০২২ , ২:২৫ পূর্বাহ্ণ

ক্যালেন্ডারের পাতায় এসেছে ডিসেম্বর। ডিসেম্বর এসেছে বিজয়ের বারতা নিয়ে। বিগত ৫১ বছর ধরে বাববার ডিসেম্বর এসে আমাদের বিজয়ের আনন্দে উদ্বেল করেছে। গত বছর আমরা উদযাপন করেছি বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী! এবারো বিজয় দিবসকে ঘিরে শুরু হবে নানা উৎসব, আয়োজন। উদ্দীপনামূলক এসব উৎসব আয়োজনের অভিপ্রায় একই লক্ষ্যাভিমুখী হলে প্রকাশিত হতো জাতীয় ঐক্য। জাতীয় সব বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারা দুঃখজনক, লজ্জাজনকও বটে। বাস্তবতা হলো আমরা কোনো আনন্দ বা জাতীয় কোনো উৎসব একই লক্ষ্যাভিমুখী উদ্দেশ্যে উদযাপন করতে পারি না। স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ, তবু দেশের স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের আনন্দকেও আমরা নানাভাবে দ্বিধা-বিভক্ত করে রেখেছি! একটি স্বাধীন দেশে নানা মত, নানা পথ থাকবেই। কিন্তু জাতীয়ভাবে স্বীকৃত এবং ঐতিহাসিক বিষয়ের দ্বিধা-বিভক্তি স্বাধীনতা লাভের ৫২ বছর পর কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। পৃথিবীতে এমন স্বাধীন রাষ্ট্র কমই আছে, যেখানে জাতির পিতাকে মানা হয় না। এমন স্বাধীন রাষ্ট্র নেই, যেখানে জাতীয় স্লোগানকে অসম্মান করা হয়! জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ব্যাঙ্গ করা হয়! কিন্তু সব সম্ভবের দেশ এই দুঃখিনী বাংলাদেশ। এখানে একটি মহলের পক্ষ থেকে নিয়মিত এসবই করা হয়!
তামাম দুনিয়ায় বাংলাদেশের মতো দুঃখিনী দেশ খুব কমই আছে, যেখানে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশত বছর পরও ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি’ এরূপ ব্যানারে রাজনীতির নানা স্লোগান ও বক্তব্য-ভাষণ শুনতে পাই, রাজনীতিচর্চাও দেখতে পাই! যখন ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি’ বলে কিছু দেখি তখন ‘স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি’র অস্তিত্বকেও স্বীকার করতে হয়। অবশ্য, এটি স্বীকার করা, না করার প্রশ্নও ওঠে না। কেননা স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রকটরূপে বিদ্যমান, যদিও তারা প্রকাশ্যে ‘স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি’ শব্দগুলো বলার সাহস দেখায় না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তিকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়ে দেশে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার দাবিদার দলটি জন্মের পর থেকেই রাজনীতির মাঠকে কৌশলের কুরুক্ষেত্র বানিয়ে ছেড়েছে! এখনো দলটি সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করলেও দল ভারি করার লক্ষ্যে, সমর্থন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে, ভোট বাড়ানোর লক্ষ্যে, এককথায় নিজেকে ক্ষমতার শীর্ষে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে সেসব বিতর্কিত ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে কৌশলে নিজের ছত্রছায়ায় নিয়ে আসেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এটি ছিল এক চরম বিপর্যয়। এই ঘটনাই বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার মেরুকরণ। পরবর্তী সময়ে তার দলের লোকেরা অদ্ভুত এক ফতোয়া নিয়ে জাতিকে বোঝাতে চাইল ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষের কথা বলে বিভেদ সৃষ্টি না করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’ আশ্চর্য! এদের ফতোয়া প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি তথা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষেই কাজ করেছিল। শুধু তাই নয় জামায়াত, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীকে রীতিমতো প্রমোটও শুরু করেছিল তারা। যুদ্ধাপরাধীদের বাড়িতে ও গাড়িতে পতপত করে উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা! যে পতাকা ও রাষ্ট্রটি অর্জনের জন্য ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, প্রায় ৪ লাখ নারী নির্যাতিত হয়েছেন। স্বাধীনতা অর্জন ও বিজয়ের ৫১ বছর পরও দুঃখের সঙ্গে দেখতে হয় স্বাধীন হলেও এক অদৃশ্য মেরুকরণে আজো সমগ্র জাতি দ্বিধা-বিভক্ত!
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি আরেক কুরুক্ষেত্র সৃষ্টির প্রয়াস চালানো শুরু করেছে। আগেও দল ও দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা রাজনৈতিক মেরুকরণের পাশাপাশি সর্বজন-স্বীকৃত ইতিহাস, দেশের আইন ও সংবিধান কর্তৃক গৃহীত এবং মীমাংসিত কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য নানারূপ ‘কু-তর্ক’ উস্কে দিত। আমাদের মনে আছে, বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জনসমক্ষে তির্যক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। অথচ ২৫ মার্চ পরিচালিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এ এক রাতেই নিহত হয়েছিল ৮০ হাজারের বেশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে অল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। ২৫ মার্চের পর থেকে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। বিএনপি নেত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের বক্তব্যের কোনো পার্থক্যই ছিল না! যেন পাকিস্তানিদের কণ্ঠেই তিনি কথা বলেন, বিএনপিও যেন পাকিস্তানি কায়দায়ই চলতে চায়! আমাদের মনে আছে, বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক বক্তব্য রেখে ঘৃণিত হয়েছিলেন। এসব ছাড়াও বিএনপির নানা কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানপ্রীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তুলেছেন কিন্তু এখন পর্যন্ত পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক নারী নির্যাতনের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। না জানি এ বিষয়ে ভবিষ্যতে কী বক্তব্য বা কী তথ্য প্রকাশ করে! এখনও বিএনপি মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, ৭ মার্চের ভাষণকে কটাক্ষ করে যে রাজনীতিচর্চা, তা কখনোই বর্ণিত ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি’ নয় সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এভাবে উক্ত রাজনৈতিক দল এবং তার সঙ্গে জোটভুক্ত অন্যরাও যে প্রগতিশীল চিন্তার ধারক, তাও কোনোভাবে বলা যাবে না। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ এবং তাদের আদর্শ অনুসারী কিছুসংখ্যক দল বিএনপির সঙ্গে একদা ‘২০ দলীয় জোট’ নামে গোত্রভুক্ত হয়েছিল। সেটির কার্যকারিতা হারালে বর্তমানে আবার ভিন্নমাত্রায় জোট গঠনের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এদের কীভাবে ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি’ বলে জাতি শনাক্ত করবে? যেসব রাজনৈতিক দল আদর্শগতভাবে জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, বুদ্ধিজীবী শহীদের সংখ্যা প্রভৃতি বিষয় স্বীকার করতে চায় না- তারা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিরূপে নিজেদের প্রকাশ ও প্রমাণ করবে, তাও সাধারণের বোধগম্য নয়। আসছে ১৬ ডিসেম্বর সবাই যার যার মতো বিজয়ের আনন্দে মেতে উঠবে সন্দেহ নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করে এভাবে বিভিন্ন জাতীয় দিবস আর কত উদযাপন করা হবে? সুতরাং এই দ্বিধা-বিভক্তি নিয়েই এবারের বিজয় দিবসের আনন্দের দিনটিও অতিক্রান্ত হয়ে যাবে। পাশাপাশি ২০১৪ সালে বিএনপির জ¦ালাও-পোড়াওয়ে অভিজ্ঞ দেশবাসী ১০ ডিসেম্বর বিএনপি আহুত ঢাকার মহাসমাবেশ নিয়েও শঙ্কার মধ্যে আছে। এই শঙ্কা বিজয়ের উদযাপনকেও নেতিবাচকভাবে আচ্ছন্ন করতে পারে।
জাতীয় মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণের মীমাংসা ঘটিয়ে ঐক্যবদ্ধ না হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাজাত প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না। আদর্শগতভাবে জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, বুদ্ধিজীবী শহীদের সংখ্যা প্রভৃতি বিষয় স্বীকার না করলে সেসব রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন বাতিলের বিষয়েও চিন্তাভাবনার সময় এসেছে বলে আমরা মনে করি। নতুন প্রজন্মের দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের নিকট আমরা এরূপ প্রত্যাশা রেখে গেলাম।
ইতোমধ্যে আমরা স্বাধীনতা এবং বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি’ সেই উৎসবের আয়োজন করেছে! আরেকটি পক্ষ নিজেদের দেশপ্রেমিক দাবি করেও স্বাধীনতা এবং বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন থেকে বিরত থেকেছে! স্বাধীনতা এবং বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষেও আমরা এক হতে পারিনি। অথচ সাধারণের প্রত্যাশা ছিল জাতীয় ইতিহাসের একটি শুভ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাব বৈষম্যহীন একটি শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি সম্পন্ন এক বাংলাদেশ! শিক্ষিত জনসংখ্যার হার বহুলাংশে বৃদ্ধি পেলেও দক্ষ জনশক্তির অভাব এখনো আমাদের বড় এক সংকট। দক্ষ জনশক্তি আমদানির মাধ্যমে জাতীয় অর্থের ব্যাপক অপচয় সামগ্রিক অর্থনীতিতেই বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক এই অপচয়কে রোধ করতে হবে। রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার সংস্কার বিগত ৫১ বছরে যতটুকু প্রত্যাশিত ছিল, আমরা তার দোরগোড়ায়ও পৌঁছাতে পারিনি। আবার বিপরীতক্রমে আমরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের আগে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলো থেকে অনেকটা এগিয়ে যেতেও সক্ষম হয়েছি। তবে এ কথাও সত্য, আমাদের দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক কাঠামোর সক্ষমতা এবং আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হলে আমরা আরো বহুদূরে এগিয়ে যেত পারতাম।
আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গৌরব করে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের বয়ান দিতে চাই, তারা কিন্তু তরুণদের কাছ থেকে প্রায়ই বিব্রতকর এরূপ প্রশ্নের মুখোমুখি হই যে, স্বাধীনতার ৫১ বছর পরও কেন এই দ্বিধা-বিভক্তি? যারা স্বাধীনতাকেই সম্মান দেবে না, যারা স্বাধীনতাকে মেনে নেবে না, তারা কেন স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করবে? ৫১ বছরেও কেন আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জনে পিছিয়ে আছি? কেনই বা আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত নেই? কেনই বা প্রশাসনিক কাঠামো এখনো দুর্বল? নতুন প্রজন্মের কাছে প্রশ্নের কোনো শেষ নেই। সব প্রশ্নের মীমাংসা সম্ভব হতো, যদি মৌলিক কিছু জাতীয় বিষয়ে আমাদের রাজনৈতিক দ্বিধা-দ্ব›দ্ব দূর করতে সমর্থ হতাম। সব দুর্ভাবনাকে পশ্চাতে ঠেলে নতুন প্রজন্মের নিকট এই এক ইতিবাচক ভাবনায় নিজেকে যুক্ত ও নিবেদন করে বলি তোমাদের কাছেই রেখে গেলাম বিশ্ব, তোমাদের কাছেই রেখে গেলাম বাংলাদেশ- আমার সোনার বাংলা। ইতিহাস থেকে প্রাণিত হয়ে বিজয়ের মাসে তোমরাই তোমাদের প্রতিজ্ঞা স্থির কর। স্থির কর নিজ নিজ ভবিতব্য।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়