মাদকের বিস্তার রোধে খেলাধুলাকে ছড়িয়ে দিতে হবে

আগের সংবাদ

সন্ধ্যার সংবাদ বিশ্লেষণ

পরের সংবাদ

গারোদের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান ‘ওয়ানগালা’ উদযাপিত

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২, ২০২২ , ৮:১২ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ২, ২০২২ , ৮:১২ অপরাহ্ণ

ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা ও আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে গারো সম্প্রদায়ের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক অনুষ্ঠান ‘ ওয়ানগালা’। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর লালমাটিয়া হাউজিং সোস্যাইটি স্কুল ও কলেজ মাঠে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবে আট সহস্রাধিক গারো নর-নারীর সমাগম ঘটে। শিশুদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। শহুরে জীবনের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে দিনভর তারা নিজেদের মতো করে আনন্দে মেতে থাকে।

স্কুল মাঠে গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী স্টল। ওই সব স্টলে স্থান পায় গারো সংস্কৃতি ও আবেগবিজড়িত পোশাক, খাবার, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ধরণের পণ্য। খাবারের দোকানে ঘুরে ঘুরে স্বাদ নেয় নিজেদের ঐতিহ্যবাহী নানা পদের খাবারের। কেউ কেউ বাসায় খাবার জন্য কিনে নেন জুমের আলু, কুমড়া, শামুক, কাঁকড়াসহ নিজেদের সংস্কৃতির বিভিন্ন পণ্য। দিনব্যাপী পূজা-অর্চনা, আলোচনা, নাচ-গানে এই উৎসবটি উদযাপন করেছে রাজধানীতে বসবাসরত গারো সম্প্রদায়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ানগালা উৎসবে আগত প্রায় সব নারীর শরীরে গারো সংস্কৃতির ছাপ। গারো পোশাক নকমান্দা ও টি শার্ট পরে স্কুল প্রাঙ্গণের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মঞ্চে চলছে গারো নাচ ও গান। মনের অজান্তেই নিজেদের সংস্কৃতির অতি পরিচিত গানের তালে তালে নেচেছে কেউ কেউ। বছরে একদিন এমন পোশাক পরার এবং সকলের সঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুযোগ পায় তারা।

ছবি: ভোরের কাগজ

ঢাকা ওয়ানগালার বিদায়ী নকমা (সমাজ প্রধান) উজ্জল আজিম জানান, ওয়ানগালা’ ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উৎসব। আদিবাসী গারোদের বিশ্বাস, শস্য দেবতা বা ‘মিশি সালজং’ পৃথিবীতে প্রথম ফসল দিয়েছিলেন এবং তিনি সারা বছর পরিমাণ মতো আলো-বাতাস, রোদ-বৃষ্টি দিয়ে ভালো শস্য ফলাতে সহায়তা করেন। তাই নবান্নে নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় ‘মিশি সালজং’কে ধন্যবাদ জানাতে উৎসবের আয়োজন করে গারোরা। ফসল দেবতাকে উৎসর্গ না করে তারা কোন খাদ্য ভোগ করে না। ‘ওয়ানগালা’ আদিবাসী মান্দি বা গারোদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। দেড় এক যুগ ধরে প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় বসবাসরত গারোরা আয়োজন করছে। যুগ যুগ ধরে গারোরা তাদের শস্য দেবতাকে এই ফসল উৎসর্গ করে আসছে। খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর গারোদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রথাটি এখন ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে একত্রে করে পালন করা হয়। অর্থাৎ এক সময় তারা তাদের শস্য দেবতা মিসি সালজংকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করলেও এখন তারা নতুন ফসল কেটে যিশু খ্রিষ্ট বা ঈশ্বরকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করেন। এ সময় সামাজিক নানা আয়োজনসহ ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠানাদিও পালন করা হয় বলে জানান পবিত্র মান্দা।

এদিন সকালে দেবতাদের পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘ওয়ানগালা উৎসব ’। ‘আমুয়া’, ‘রুগালা’র মতো ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। দুপুরের বিরতির পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে নিজস্ব ভাষায় গান গেয়ে শোনান গারো শিল্পীরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল গারোদের ঐতিহ্যবাহী জুম নাচ। উৎসবে উপস্থিত গারারো জানায়, ওয়ানগালা একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। ওয়ানগালা উৎসব পাহাড়ি জুমচাষকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হয়ে থাকে। নতুন ফসল তোলার পরে নকমা (গ্রাম প্রধান) সবার সঙ্গে আলোচনা করে অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করেন। ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে দেখা গেছে, নতুন ধানের চালের গুঁড়া পানিতে মিশিয়ে শস্য, বাড়ি ও মানুষের কপালে বা শরীরে ছাপ দেয়া হয়। ধূপ পুড়িয়ে, দামা বাজিয়ে রাজকীয় বেশে ‘নকমা’ বা সমাজ প্রধান ও ‘খামাল’ বা পুরোহিত নৃত্য করতে করতে গান গাইতে গাইতে দল বেঁধে রাজ্যের প্রজাদের নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ‘দু’ বা মুরগি এবং ‘চু’ বা মদ দিয়ে তাততারা রাবুকা বা বাঁশ দিয়ে বানানো প্রতিমা রাক্কাসীর প্রতি ধন্যবাদ জানান। আর পিছে থাকে কালো বা লম্বা বাঁশ দিয়ে বানানো বাঁশি, দামা বা লম্বা ঢোল, বোম বা মহিষের শিং দিয়ে বানানো বাঁশি নিয়ে রাজ্যের সাধারণ গারোরা। প্রচীন ঐতিহ্যবাহী জুম ওয়ানগালা আজ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি গারোদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার এক অনবদ্য আন্দোলন বলে দাবি করেছে উপস্থিত গারোরা। পরবর্তীতে আগামী ‘ ঢাকা ওয়ানগালা -২০২৩ ‘ এর নকমা নির্বাচিত হলেন সুইডিশ সাংমা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়