মেসি ম্যাজিকে সম্মোহিত বিশ্ব

আগের সংবাদ

গুজরাটে নির্বাচন: নিরাপত্তাকর্মীর গুলিতে ২ সহকর্মী নিহত

পরের সংবাদ

ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসছেন কারা?

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৮, ২০২২ , ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৮, ২০২২ , ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি- এই স্লোগানকে হৃদয়ে ধারণ করে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষ আর বাঙালি জাতীয়তাবাদকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে পথচলা শুরু ছাত্রলীগের। গৌরবের ৭৪ বছরে লড়াই-সংগ্রামের পায়ে পায়ে অর্জিত সাফল্য শুধু ছাত্রসমাজকেই নয়, বাংলাকে করেছে মহিমান্বিত। বিভিন্ন সময় কিছু নেতাকর্মীর বিতর্কিত ভূমিকাও অর্জনকে কালিমালিপ্ত করেছে। তবে হার না হার গলায় পরেই এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া ছাত্রলীগ। আগামী ৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হবে সংগঠনটির বহুল প্রতীক্ষিত ৩০তম জাতীয় সম্মেলন।

কারা আসবেন নেতৃত্বে- এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা বিশ্লেষণ। কারণ ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকেই উঠে আসে জাতীয় নেতৃত্ব। এসব জেনেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল রবিবার পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে জানান, ছাত্রলীগের অভিভাবক আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ৬ ডিসেম্বর সম্মেলন আয়োজনে সম্মতি দিয়েছেন। প্রথমে এই সম্মেলনের জন্য ৩ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরে তা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্থগিত করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান যাওয়ার কথা ছিল, যদিও পরে সফর বাতিল করা হয়েছে। সেই সফর থেকে প্রধানমন্ত্রীর ফেরার কথা ছিল ৩ ডিসেম্বর। পরে নতুন করে ৮ ও ৯ ডিসেম্বর এই সম্মেলন আয়োজনের কথাও জানানো হয়েছিল। আগের সিদ্ধান্ত থেকে দুই দিন এগিয়ে ৬ ডিসেম্বর সম্মেলনের নতুন সময় জানালেন ওবায়দুল কাদের।

এ ব্যাপারে ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ছাত্রলীগের যে কোনো কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তার দেশের বাইরে যাওয়ার শিডিউল পরিবর্তন হওয়ার কারণে আমাদের সম্মেলন এগিয়ে আনা হয়েছে। শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সম্মেলন আয়োজনে কাজ করছি।

দৌড়ে দেড় শতাধিক : এদিকে পদ পেতে নেতাকর্মীদের নানামুখী কর্মতৎপরতা বেড়েছে। ছাত্র রাজনীতির সূতিকাগার মধুর ক্যান্টিন এখন সরগরম। আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় ধানমন্ডি, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলীয় কার্যালয়, সন্ধ্যায় টিএসসির আড্ডাসহ রাজনৈতিক আড্ডাস্থলে জমে উঠেছে কমিটি গঠন নিয়ে নানামুখী আলোচনা। এতেই থেমে নেই, পদপ্রার্থীরা ধরণা দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে। যোগাযোগ করছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গেও। সম্মেলন যতই কাছে আসছে ততোই বিভিন্নভাবে লবিং-তদবিরে ব্যস্ত আছেন তারা। চেষ্টা-তদবিরের কমতি রাখছেন না কেউই। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে নিজেদের সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন অনেকেই। একাধিক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, বিগত কয়েক বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। যারা ভালো কাজ করছে তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তারপরও নেতা হওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের হিসাব মিলাতে হয়। নেতৃত্ব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশনাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তবে নেতৃত্ব নির্বাচনে পারিবারিক পরিচয়, সংকটে দলের পাশে থাকা, শিক্ষার্থীবান্ধব পদপ্রত্যাশীদের প্রাধান্য দেয়া হবে। এদিকে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সংগঠনটির নেতাদের বয়সসীমা অনূর্ধ্ব ২৭ বছর। তবে বিগত তিন কমিটির সম্মেলনে প্রার্থীদের বয়স অনূর্ধ্ব ২৯ বছর করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আশার আলো দেখছেন অনেকেই।

এদিকে নেতৃত্বের দৌড়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। এছাড়া সহসভাপতি রাকিব হোসেন, কামাল খান, মাজহারুল ইসলাম শামীম, তিলোত্তমা শিকদার, ফরিদা পারভীন, সাংগঠনিক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম বাঁধন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাহসান আহমেদ রাসেল, আরিফুজ্জামান আল ইমরান, আইনবিষয়ক সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন শাহাদাত, মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক নাহিদ হাসান শাহিন, শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ লিমন, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সম্পাদক ইমরান জমাদ্দার, উপবিজ্ঞান সম্পাদক সবুর খান কলিন্স, কর্মসংস্থানবিষয়ক উপসম্পাদক খাদিমুল বাশার জয়, গণশিক্ষাবিষয়ক উপসম্পাদক সোলাইমান ইসলাম মুন্না, ক্রীড়া সম্পাদক আল আমিন সিদ্দিক সুজন, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক হায়দার মোহাম্মদ জিতু, উপদপ্তর সম্পাদক আহসান হাবীব, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস, পরিবেশ উপসম্পাদক শাকিল আহমেদ, তথ্য প্রযুক্তিবিষয়ক উপসম্পাদক রাশিদ শাহরিয়ার উদয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি সনজিত দাসের নাম জোরালো আলোচনায় রয়েছে।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আবদুর রহমান বলেন, ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বয়সসীমা থাকতে হবে, অবিবাহিত থাকতে হবে, ছাত্র হতে হবে। নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্যতা আছে, ছাত্রসমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন নেতৃত্ব উঠে আসুক, এটি আমরা চাই।

মাতৃভাষা আন্দোলন থেকে কোভিড মোকাবিলা : ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পরপরই মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ভূমিকা, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভুত্থানে ছাত্রলীগের অনন্য ভূমিকা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করেছে ছাত্রলীগ। মহান বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী শহীদ হয়। একাত্তরের পর পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের পরিবর্তে হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। স্বাধীন দেশেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা ছাত্রলীগের। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১/১১’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় ছিল ছাত্রলীগ। কোভিডকালে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি দরিদ্রদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ, মোবাইল ফোনে চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যসেবা, অসুস্থ মানুষের বাড়িতে ওষুধ পৌঁছে দেয়া, বিনা পয়সায় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু, ক্যাম্পাস, মসজিদ, বাজার ও মোড়ে মোড়ে হাত ধোয়ার জন্য সাবান ও পানির ব্যবস্থা করা, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে কৃষকদের ধান কেটে দিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

তবে সমালোচনাও কম নয়। ২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু বকর হত্যাকাণ্ডে সমালোচনার শিকার হয় ছাত্রলীগ। ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ হত্যাকাণ্ডে ছাত্রলীগের পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। পুরান ঢাকায় দর্জি বিশ্বজিৎ দাস হত্যামামলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২১ জন কর্মীর মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডেও ফাঁসির আদেশ হয় ২০ ছাত্রলীগ নেতার।

আগামী নেতৃত্বে যোগ্য, বিতর্কমুক্ত এবং যারা আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান- তাদেরই বিবেচনা করা হবে বলে মনে করছেন সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। তবে এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ১১-১২ মে ছাত্রলীগের ২৯তম সম্মেলন হওয়ার পরের বছর ৩১ জুলাই সভাপতি পদে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক পদে গোলাম রাব্বানীকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগে পূর্ণাঙ্গ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের আগেই ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তাদের অব্যাহতির পর সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান লেখক ভট্টাচার্য। ৩ মাস ভারপ্রাপ্ত থাকার পর ছাত্রলীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তাদের পূর্ণাঙ্গ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। আগামী ৬ ডিসেম্বর সম্মেলনে নতুন কমিটি ঘোষণা করবেন সংগঠনটির আদর্শিক নেত্রী শেখ হাসিনা।

কেএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়