আদালত চত্বর থেকে জঙ্গি ছিনতাই একটি ক্ষুদ্র ‘মহড়া’ মাত্র

আগের সংবাদ

মাঠে নামলো ব্রাজিল ও সার্বিয়া

পরের সংবাদ

তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল ঠিক বিপরীত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৫, ২০২২ , ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৫, ২০২২ , ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

সাতচল্লিশের মধ্য আগস্টের দেশভাগে আসাম ছেড়ে ভাসানী পূর্ববঙ্গে এসেছেন; পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে সোহরাওয়ার্দী গেছেন পশ্চিম পাকিস্তানে। দুজনের রাজনৈতিক কাজের এলাকা দাঁড়িয়েছে ভিন্ন ভিন্ন। আসামের কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে ভাসানী আবারো একবার গিয়েছিলেন আসামের ধুবড়িতে। আসামের প্রতি তার টান ছিল, যাদের সেখানে রেখে এসেছিলেন ডাক ছিল তাদের। ১৯৪৯-এর মার্চে আসামে গেলেন; গিয়েই গ্রেপ্তার হলেন, ফিরলেন মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। জুন মাসের ২৩ তারিখে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ঘটে, তার সভাপতিত্বে। ঢাকায় তিনি অপরিচিতই ছিলেন, এমনকি কর্মীরাও তাকে চিনত না, এরই মধ্যে তিনি যুক্ত হলেন নতুন দল গঠনের সঙ্গে; যে দলের প্রতিশ্রæতি ছিল গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করবার। প্রতিষ্ঠার পরপরই সোহরাওয়ার্দীকে তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগে যোগ দিতে, অনেকটা সেভাবেই যেভাবে একদা সোহরাওয়ার্দীকে তিনি আমন্ত্রণ করেছিলেন সিরাজগঞ্জের কৃষক সম্মেলন উদ্বোধন করতে। এবার দূত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন শেখ মুজিবকে। সোহরাওয়ার্দীকে মুজিব সম্মত করতে চেষ্টা করেছেন, সোহরাওয়ার্দী কিন্তু সম্মত হননি। পরে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময়ে সোহরাওয়ার্দী নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন, অত্যন্ত কঠিন পরিশ্রম করেছেন এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ ভেঙে যখন ন্যাপের অভ্যুদয় ঘটে তখন সোহরাওয়ার্দীপন্থিরা প্রমাদ গুনেছিলেন, তাদের ভিত্তিভূমি বিপদগ্রস্ত হচ্ছে টের পেয়ে। তারা থামাতে চেয়েছেন। প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন জড়িত হয়ে পড়েছিলেন, তিনি স্মরণ করেছেন যে আবুল মনসুর আহমদ, যিনি তখন সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার মন্ত্রী, একদিন গভীর রাতে টেলিফোনে অনেকটা সময় ধরে আবু জাফর শামসুদ্দীনকে ‘আওয়ামী লীগ অটুট রাখা কেন আবশ্যক, বৈদেশিক নীতি কেন ঠিক’ প্রভৃতি বহু বিষয়ে বুঝিয়েছেন। পরে শামসুদ্দীন সাহেব টেলিফোনে এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছেন; হুমকি যিনি দিয়েছেন তার ‘বজ্রকণ্ঠ’ চেনা চেনাই ঠেকেছে। শুধু তাই নয়, তার বাসার সামনে বিক্ষোভও প্রদর্শিত হয়েছে; কারণ ঘটনাক্রমে ওই সময়ে মওলানা ভাসানী তার বাসাতেই অবস্থান করছিলেন। পরে সম্ভবত ব্যারিস্টার শওকত আলী খান কিংবা ইয়ার মোহাম্মদ খান ভাসানীকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান। শওকত আলী খান কিছুদিন ন্যাপে ছিলেন, পরে আওয়ামী লীগে প্রত্যাবর্তন করেন; ইয়ার মোহাম্মদ খান কিন্তু একজন অসাধারণ মানুষ, তিনি আওয়ামী লীগের গঠনে ছিলেন, দলের হয়ে কারাভোগ করেছেন এবং ন্যাপ গঠনেও জরুরি ভূমিকা গ্রহণ করেন। এবং কখনোই ন্যাপ থেকে চ্যুত হননি। অর্থের জোগানও দিতেন। ন্যাপ গঠিত হয় একটি সর্বপাকিস্তান কর্মী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে; সে জন্য একটি ইংরেজি প্রচারপত্র ছাপা হয়েছিল। সেটি প্রেস থেকে ছেপে বাইরে আনার সময়ে ওটির প্রকাশক খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস ন্যাপ-গঠনবিরোধীদের দ্বারা আক্রান্ত হন; তবে মারপিটের মধ্যে ব্যূহ ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে এটা ছিল সামান্য ঘটনা, বড় ঘটনা ঘটেছিল তিন দিনব্যাপী সম্মেলন শেষে সদ্যগঠিত নেতা ও কর্মীরা যখন বিরাট এক মিছিল করে পল্টনের মাঠের দিকে রওনা হন তখন। উদ্দেশ্য ছিল জনসভা করা। সুসংগঠিত গুণ্ডাবাহিনী দ্বারা মিছিল আক্রান্ত হয় এবং পরে সভাটিও পণ্ড করে দেয়া হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব প্রগতিশীল নেতাই সম্মেলনে, মিছিলে ও জনসভামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। তিন দিনের জন্য ঢাকা পরিণত হয়েছিল প্রগতিশীল আন্দোলনের কেন্দ্রভূমিতে, যেন নতুন এক রাজধানী, যে ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব। গুণ্ডাবাহিনীর আক্রমণে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত নেতাদের দুয়েকজন যে আহত হননি এমনো নয়। স্মরণীয় যে ওই সময়ে কেন্দ্রে এবং প্রদেশ উভয় স্থলেই কায়েম ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। পুলিশ তাই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা দেয়নি, নীরব থেকে আনুকূল্য সরবরাহ করেছে আক্রমণকারীদেরই।
এ ঘটনাকে মোটেই তাৎপর্যহীন বা কাকতালীয় বলা যাবে না যে, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন গঠিত হয় সরকার-সমর্থিত গুণ্ডারা তখনো তৎপরতা দেখিয়েছে। মওলানা ভাসানীকে নিয়ে তখন তার সমর্থকরা শঙ্কায় ছিলেন। পাছে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এই দুশ্চিন্তায় আগের রাতেই তাকে সম্মেলন স্থানে নিয়ে আসা হয়েছিল; আট বছর পরে আবার ঠিক একই ঘটনা ঘটল, সরকার-সমর্থক গুণ্ডারা আক্রমণ করবে এই আশঙ্কায় তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হলো। ইতোমধ্যে সরকার বদলেছে, মুসলিম লীগ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে, ভাসানীর গড়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসেছে, কিন্তু ভাসানী নিজেই নিরাপদে নেই, সরকারের কারণে। বোঝা গেছে আওয়ামী লীগ আর ভাসানীর নেই, সোহরাওয়ার্দীর হয়ে গেছে, ঠিক যেভাবে একদিন মুসলিম লীগ চলে গিয়েছিল লিয়াকত আলী-নাজিমুদ্দিনদের হাতে। ভাসানী রয়ে গেছেন ভাসানীর জায়গাতেই, নিপীড়িত মানুষদের সঙ্গে। ন্যাপের জন্য যে দলীয় পতাকাটি তৈরি করা হয়েছিল সেটাও লক্ষ্য করার মতো। তাতে সবুজ ও লালের পটভূমিতে ছিল ৫টি তারকা। সবুজ ও লাল যথাক্রমে কৃষক ও শ্রমিকের প্রতিনিধি (লাল আবার বিপ্লবেরও); ৫ তারকা ৫টি প্রদেশের (জাতিরও বলা চলে) স্বায়ত্তশাসনের প্রতীক। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শুরুর সময় কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তানের সব ভাষার সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে দাবি তুলেছিল, কিন্তু এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি, ন্যাপ তাকেই সামনে নিয়ে এসেছিল।
আওয়ামী লীগ যখন গঠিত হয় তখন মুসলিম লীগওয়ালারা যেভাবে চিৎকার করেছে, ন্যাপ গঠনের সময়ে তার চেয়েও অধিক কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার শোনা গেল আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে। সেবার শুধু মুসলিম লীগই ছিল, এবার লীগপন্থিদের সঙ্গে যুক্ত হলো স্বয়ং আওয়ামী লীগ। করাচির ‘ডন’ পত্রিকা ভাসানীকে আক্রমণ করবে এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল, ঢাকায় ‘আজাদ’ও যে বসে থাকবে না এটাও ছিল প্রত্যাশিত; কিন্তু যে ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভাসানীর শ্রমে এবং যার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন পত্রিকার বেতনভুক সম্পাদক, সেই পত্রিকার আক্রমণ ভাসানীর জন্য নিশ্চয়ই মর্মবিদারক ছিল। সব প্রতিক্রিয়াশীলেরই তখন এক রা। ন্যাপকে সোহরাওয়ার্দী অভিহিত করেছিলেন নেহরু এইডেড পার্টি বলে; পরিহাস এখানেই যে একদা সোহরাওয়ার্দী নিজেও অভিহিত হয়েছিলেন ‘ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর’ বলে; বলেছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন। আক্রমণের প্রতিউত্তর জবাবটা নাজিমুদ্দিনকে না দিয়ে সোহরাওয়ার্দী দিলেন ভাসানীকে, যে ভাসানীর গড়া আওয়ামী লীগই তাকে দিয়েছিল রাজনৈতিক ভরসা। পরিহাস আর কাকে বলে। বুর্জোয়ারা এমনো পারেন।
এক সময়ে ভাসানীকে ছাড়া সোহরাওয়ার্দীর চলার উপায় ছিল না। যেজন্য কেবল আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবের ওপর নির্ভর না করে তিনি নিজেই চলে গেছিলেন কলকাতায়, বিদেশ-প্রত্যাগত ভাসানীকে ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য। কেন না তখন, সেই ১৯৫৫ সালে ভাসানীর সমর্থন প্রয়োজন ছিল, মন্ত্রিত্বের স্বার্থে। ‘ইত্তেফাক’ মনে হয় কিছুটা কম ‘বাস্তববাদী’ ছিল, যে জন্য পরামর্শ দিয়েছিল ভাসানী যেন আপাতত দেশের বাইরেই থাকেন।
সারসংক্ষেপটা এই রকমের দাঁড়ায় যে, ভাসানীর সঙ্গে সোহরাওয়ার্দীর মৌলিক পার্থক্য ছিল বিশেষ করে দুটি ক্ষেত্রে : জাতীয়তাবাদের ও গণতন্ত্রের। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের সমর্থক ও সংরক্ষক, ভাসানী ছিলেন মনেপ্রাণে বাঙালি জাতীয়তাবাদী। আর গণতন্ত্রের প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর অবস্থান ছিল বুর্জোয়াসুলভ; মওলানার অবস্থান সমাজতন্ত্রীসুলভ। তাই দেখি যে, সোহরাওয়ার্দী বিশ্বাস করছেন দর কষাকষিতে, আর ভাসানী ভরসা করছেন আন্দোলনে।
১৯৬২-র তুমুল ছাত্র-আন্দোলনের সময় সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ঢাকায়। তিনি বুঝে ফেলেছেন যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে বামপন্থিরা; তাই তিনি আন্দোলন বেশি দূর এগিয়ে যাক এটা পছন্দ করেননি। তখনকার গভর্নর (আমলা) পাঠান গোলাম ফারুকের সঙ্গে দেখা করে তিনি পরামর্শ দেন তিন বছরের বিএ ডিগ্রির ব্যাপারটা স্থগিত রাখতে, আন্দোলন যাতে প্রশমিত হয়। আইয়ুব খান তখন দেশে নেই, ইউরোপ সফরে রয়েছেন, গোলাম ফারুক টেলিফোনে তার সম্মতি নিয়ে শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের ওই বিশেষ অংশটির বাস্তবায়ন স্থগিতের ঘোষণা দেন। তাতে অবশ্য আন্দোলন থামেনি, ততক্ষণে সেটা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ওই সময়ে ভাসানী ছিলেন বন্দি অবস্থায়, মুক্ত থাকলে আন্দোলনকে তিনি অবশ্যই সমর্থন জানাতেন। জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে দুজনের ভেতর ব্যবধানের আরো একটা ভিত্তি ছিল। সেটা এই যে বাঙালিরা যে একটি স্বতন্ত্র জাতি সোহরাওয়ার্দী সেটা মানতেন না; বাঙালিদের তিনি মনে করতেন একটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী (ৎধপব); আর ভাসানী তো এ ব্যাপারে আগাগোড়াই অত্যন্ত পরিষ্কার ছিলেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়