বিশ্বকাপে শুভ সূচনা বেলজিয়ামের

আগের সংবাদ

ঢাকার সঙ্গে ইইউর প্রথম রাজনৈতিক সংলাপ আজ

পরের সংবাদ

ভিত্তিহীন গুজবে ব্যাংকিং খাত

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৪, ২০২২ , ৮:১২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৪, ২০২২ , ৯:৩১ পূর্বাহ্ণ

ব্যাংকে জনগণের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে : বাংলাদেশ ব্যাংক

ফেসবুক দেখতে গিয়ে হঠাৎ নজরে এলো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কথা। এমন সংবাদ শুনে খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আজমী রাহমান ও তার দুই বোন ব্যাংকে রাখা টাকা তুলে আনেন। পরে জানতে পারেন, এটা ছিল শুধুই গুজব।

সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার গুজব ছড়িয়েছে। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশের ব্যাংকারদের ফোন করে জিজ্ঞেস করছেন, তারা দেশে টাকা পাঠাবেন কিনা। আবার দেশেই থাকেন এমন অনেকে জানতে চাচ্ছেন, ‘ব্যাংকে এখন টাকা রাখা কতটা নিরাপদ। ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে না তো!’ অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা স্পষ্ট বলছেন, এসব তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। এমন ভিত্তিহীন গুজবে কান না দিতে গ্রাহকদের পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ব্যাংকে জনগণের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে। গুজব বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি এবং স্থানীয় ব্যাংক-কর্মকর্তাদের আশ্বাসে এখনো ব্যাংক ব্যবস্থায় আস্থা রাখছেন গ্রাহকরা। প্রাথমিকভাবে দুয়েকজন ব্যাংক থেকে টাকা তুললেও তারা পরে আবার জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা।

গত সোমবার রাজধানীর মতিঝিল ও কারওয়ান বাজারে কয়েকটি ব্যাংকের শাখায় সরজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, অন্যান্য দিনের মতোই গ্রাহকরা প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা তুলছেন, জমা দিচ্ছেন। কারো মধ্যে কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা যায়নি। মতিঝিলে পূবালী ব্যাংকের একটি শাখায় কথা হয় হাসান মেহেদি নামের এক গ্রাহকের সঙ্গে। তিনি বলেন, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে ঠিক। মানুষের কষ্ট হচ্ছে। ক্ষোভ-আতঙ্ক আছে।

এই সুযোগ নিয়েই সুযোগসন্ধানীরা এসব গুজব ছড়াচ্ছে বলে আমার মনে হয়। কারওয়ান বাজারে আইএফআইসি ব্যাংকের শাখার গ্রাহক নুরুজ্জামান বলেন, ফেসবুকে এমন গুজব আমিও দেখেছি। প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। পরে শুনতে পেলাম, এসব গুজব।

জানতে চাইলে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের রামপুরা শাখার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশিস বসাক বলেন, ব্যাংক থেকে টাকা তোলা নিয়ে গুজবের বিষয়টি আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। কিন্তু আমার শাখায় বা মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অন্য কোনো শাখায় এর প্রভাব পড়েছে এমন তথ্য পাইনি। তবে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে টাকা কিছুটা বেশি তোলা হয়েছে। অর্থাৎ আগে যেখানে ১ কোটি টাকা উত্তোলন হতো সেখানে হয়তো ২০ লাখ টাকা বেশি উত্তোলন হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানত ১৪ লাখ ৮২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা, যা আগের মাসের চেয়ে ১১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা বেশি। বর্তমানে মোট তারল্যের পরিমাণ ৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট নেই।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট নেই। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে সুযোগসন্ধানী চক্র ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। মানুষ যাতে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারে বিশ্বাস না করে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে কোনো ব্যাংকে যদি তারল্য বা অন্য কোনো সংকট দেখা দেয় তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকট সমাধানে সহায়তা দেবে বলে জানান তিনি।

এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী সেলিম আর এফ হোসেইন বলেন, ‘দেশের কিছু ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট রয়েছে। কিন্তু তারল্য সংকট নেই। সংকট তৈরি হওয়ারও আশঙ্কা নেই। কিছু দুষ্ট লোক ব্যাংকের তারল্য নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে। তাতে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। স্বাধীনতার পর কোনো ব্যাংক গায়েব হয়ে যায়নি। দুয়েকটি ব্যাংকে সংকট তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে তার সমাধান হয়েছে। ভবিষ্যতেও সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশ ব্যাংক এগিয়ে আসবে।’ গুজবে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মানুষ যদি বিশ্বাস করে তাহলে হয়তো কিছু প্রভাব পড়তে পারে। তবে আমার বিশ্বাস, মানুষ ব্যাংক ব্যবস্থায় আস্থা রাখবে। গুজবে বিশ্বাস করবে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অর্থনীতিবিদ সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সংকটের সময় একটি মহল সুযোগ বুঝে নানা গুজব ছড়ায়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ভুল করেছে। তারা প্রকাশ করেছে যে, ১০টি ব্যাংকের অবস্থা খারাপ। এটা প্রকাশ করার দরকার ছিল না। এটা প্রকাশ পাওয়ার পরই সাধারণ মানুষ ভয় পেয়ে গেছে। এটা সাধারণত ব্যাংকগুলোই জানে।’

তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যাংক দুর্বল থাকতেই পারে। তাদের হাতে কী পরিমাণ অর্থ আছে, ক্রেডিট রেটিং কী- সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক জানবে। জনসমক্ষে বলা হবে কেন? লোকজন বোঝে না তারল্য কী। কিন্তু লোকজন মনে করেছে, না জানি কী হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংক নতুন ঋণ দিচ্ছে না। এসব কারণে আস্থায় কিছুটা চিড় ধরেছে। তার মধ্যে আবার রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের বিষয়ে বলা হচ্ছে, তাদের ঋণখেলাপি অনেক বেশি। লোকজন হয়তো কিছু টাকা তুলে ফেলেছে। কেউ কেউ হয়তো সঞ্চয় ভেঙেছে।’
আমানত নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের : গুজবের ডালপালা যখন বেশ জেঁকে বসার চেষ্টা করছিল, তখনই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ‘ব্যাংকে গচ্ছিত আমানত নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ় অবস্থায় রয়েছে। দেশের ব্যাংকগুলোতে রক্ষিত আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ। এরপরও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকের আমানত তুলে নেয়ার জন্য ষড়যন্ত্রমূলক খবর প্রচার হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ় অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্যের কোনো সংকট নেই।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫১ বছরে কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়নি। আশা করা যায়, আগামী দিনেও বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক বন্ধ হবে না। ব্যাংকগুলোতে জনগণের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে।’

পরের দিন ১৪ নভেম্বর একই বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে কোনো তারল্য সংকট নেই। তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো ও অ্যাসিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট নীতি সর্বদা চালু রয়েছে। ব্যাংকের পরিদর্শন ও সুপারভিশন বিভাগ ব্যাপকভাবে তৎপর।

এমকে

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়