জলবায়ু সম্মেলনে প্রত্যাশা ও অর্জন

আগের সংবাদ

ডিসেম্বর নিয়ে ভাবনা-দুর্ভাবনা

পরের সংবাদ

লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড কি হবে?

ড. মাহবুব হাসান

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৩, ২০২২ , ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৩, ২০২২ , ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ

গত ১৮ নভেম্বর মিসরের শার্ম আল শেখে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন শেষ হয়ে গেল। কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজের (কপ) ২৭তম সম্মেলন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য একটি তহবিল গঠনের যে প্রতিশ্রæতি পাবে বলে আশা করেছিল গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলো, সে ব্যাপারে ধনী দেশগুলোর কোনো সাড়া মেলেনি। অথচ তারাই মূলত বৈশ্বিক ক্লাইমেট চেঞ্জের জন্য দায়ী। পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণে প্রধান ভূমিকা রাখছে। তারা যে ক্ষতি করেছে এর মধ্যেই তার দায় স্বীকার করলেও দায়িত্ব নিয়ে তা মিটিগেশন করতে এগিয়ে আসছে না। মিটিগেশনের মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবে না ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো। তাই অভিযোজনা বা অ্যাডাপটেশন জরুরি বিবেচনা করে এগিয়ে আসার জন্য নিজেদের উচ্চকিত কণ্ঠ তুলে ধরেছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের নেতারা। মিটিগেশন ও অ্যাডাপটেশনের জন্য যে পরিমাণ অর্থ দরকার তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে, কিন্তু সেই অর্থ কে কতটা দেবে সেই প্রতিশ্রæতি আসেনি।
ক্লাইমেট চেঞ্জের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক ক্ষতির মধ্যে যেসব বিষয় আমরা ভোগ করছি, এর মধ্যেই তা আমাদের চলমান জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। তার একটি হচ্ছে গেøাবাল ওয়ার্মিং। হিমবাহগুলো গলে যাচ্ছে আর বাড়ছে সমুদ্র-মহাসমুদ্রের পানি বিভিন্ন দেশের উপকূলবর্তী আবাদি জমি, বসতি ডুবে যাচ্ছে বা যাওয়ার কিনারায় এসে পৌঁছেছে। বাড়ছে নারকীয় ঘূর্ণিঝড়। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় আমাদের জনজীবনকে তছনছ করে দিচ্ছে। অতিসম্প্রতি সিত্রাং তার এক উদাহরণ। বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে গত কিছু দিন আগে। তা নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ভারতের জনবসতির ওপরে আঘাত হানবে- আবহাওয়া দপ্তর এ রকমটাই বলেছে। আমাদের মনে আছে আইলা, সিডরসহ অনেক ঘূর্ণিঝড় জনজীবন তছনছ করে দেয়ার কথা। কোস্টাল এলাকার সহায়-সম্পদ বিনষ্ট করেই কেবল ক্ষান্ত হয়নি সেই সব ঘূর্ণিবার্তা, লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে উদ্বাস্তুতে পরিণত করেছে। আজকে এই ঢাকা মহানগরে যে ২ কোটিরও বেশি মানুষ বাস করছে তার অধিকাংশই বাস্তুচ্যুত উপকূলীয় এলাকা থেকে বাঁচতে রাজধানীতে ছুটে এসেছে। তারা এই মহানগরের কেবল নিম্নমানের বস্তিজীবনই যাপন করছে না, তাদের আয়-রোজগারের বিষয়টি চরমভাবে অনিশ্চিত ও মানবেতর স্তরে ঝুলে আছে। তারা বাস্তুচ্যুত হয়ে এসেছিল রাজধানীসহ দেশের বিভাগীয় ও জেলা সদর শহরে- বাঁচার জন্য, কাজের জন্য, পরিশ্রমের বিনিময়ে কর্মজীবনকে শান্তিপূর্ণ করতে। কিন্তু সে স্বপ্ন তারা রচনা করতে পারেনি, পারবে না। কারণ আরো বহুরকম বাধার কারণে সেটা সম্ভব নয়। তার জন্য কি ক্লাইমেট চেঞ্জ দায়ী নয়? আবার ওই ক্লাইমেট চেঞ্জের জন্য প্রধানত দায়ী ধনী, শিল্পোন্নত দেশগুলো।
বিষয়টি সোজা মনে হলেও যাদের হাত ধরে বৈশ্বিক জলবায়ু বা আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে আমাদের মতো দেশের অপরিসীম ক্ষতি হয়েছে এবং আরো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব, কিন্তু দ্রুত কিছু হবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) রাশিয়া কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার। কার্বন নিঃসরণে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত সব থেকে উপরে আছে বলেই তারা লস এন্ড ড্যামেজ তহবিল জোগাতে তারাই বড় চাঁদা দেয়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে যতটা সক্রিয় ও উৎসাহী, তার ধারে কাছেও নেই কার্বন নিঃসরণের ব্যাপারে তৎপর। কারণ কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করতে হলে, শিল্প সেক্টরে বড় ধরনের বিনিয়োগ দরকার। দ্বিতীয়ত পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও শিল্প সেক্টরে তার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল কার্বন কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাদের তৎপরতা তেমনভাবে গতি পায়নি। এবং তারও চেয়ে ঝুঁকিতে আছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। কপ-এর প্রতি বছরের সম্মেলনের মাধ্যমে দেয়া প্রতিশ্রæতি যতটা সহজে মিলেছিল, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তারা ততটা আন্তরিক নয়। সেটা কপ-২৭ সম্মেলনের শেষেই বোঝা গেল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল ওয়ার্মিং রেট ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নামিয়ে আনবে তারা। কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না। ইতোমধ্যেই যে পরিমাণ ক্ষতি হয়ে গেছে, তা থেকে উদ্ধার পেতে হলে ঝুঁকিতে পড়া উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোকে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অর্থ তহবিল দরকার। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্পর্কিত সংস্থা সেই বিবেচনায়ই কপ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিশ্রæতি ভাঙছে অনেক দেশ।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ অ্যান্টিগা এন্ড বারমুডার পরিবেশমন্ত্রী সোজাসাপটা বলেছেন এবার যদি তহবিল গঠিত না হয়, তা হবে গরিব দেশগুলোর সঙ্গে প্রতারণা। বলা হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল, আসলে আমরা এখনো অনুন্নত দেশ এবং হিমালয়ান ঢালের একটি উপকূলবর্তী ক্লাইমেটের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ২০/৩০ শতাংশ ভূমি ডুবে যাবে। কক্সবাজার বা সেন্টমার্টিন থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত কোস্টাল জনবসতি জীবন ও সহায়-সম্পদ সব হারাবে। তারই কিছু নমুনা আমরা দেখতে পাচ্ছি ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপে, কোস্টাল এরিয়ার নদ-নদীতে ঢুকে পড়ছে লবণাক্ত পানি। তাতে করে ফসলি জমি উৎপাদন হারাচ্ছে। আর উৎপাদন হারানোর মানে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ঘাটতি দেখা দেয়ার ভয়। বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়বে বা এর মধ্যেই বেড়ে চলেছে। এসব মানববিরোধী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে অবশ্যই কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবেই। কারণ দোষ ও দায় তাদেরই। লোভ, অতিলোভ পৃথিবীর মানুষের কথা না ভেবে উন্নত দেশগুলো নিজেদের লাক্সারি জীবনের শোভাকেই কেবল বাড়িয়ে চলেছে। এ ধরনের লোভ থেকে ফিরে আসতে হবে। এবং তা কেবল কথায় নয়, তার পদক্ষেপের ভেতরে থাকতে হবে মানুষ বাঁচানোর ইতিবাচক কর্মসূচি, ওয়াদা মোতাবেক ফান্ড তৈরি এবং শিল্প বিনিয়োগ। সেই বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য গ্রিন হাউস গ্যাস কমিয়ে আনা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ব্যবহার বাড়ানো ও তার সম্প্রসারণ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে সব প্রান্তে। এর আগে অ্যাডাপটেশন ফান্ড, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড দেয়ার কথা বলেছিল উন্নত ও সম্পদশালী দেশগুলোর পক্ষ থেকে। প্রস্তাব মোতাবেক তারা পর্যাপ্ত ফান্ড দেয়নি, যা তেমন কোনো উপকারেই আসেনি। ফলে ক্লাইমেটের শিকার বাংলাদেশের মতো দেশ ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে ভাঙা কোমর সোজা করতে পারছে না।
গরিব ও ক্লাইমেটের শিকার প্রান্তিক/গরিব উপকূলবর্তী দেশগুলোর নেতারা ‘লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড’ নামে আলাদা ফান্ড চেয়ে আসছে ধনী ও ক্লাইমেট চেঞ্জের জন্য দায়ী দেশগুলোর কাছে। সে ব্যাপারে তারা তেমন উৎসাহী নয় এ বছরও। এই লস এন্ড ড্যামেজ বিষয়টিতে যদি চুক্তিবদ্ধ হয় ধনী দেশগুলো তাহলে তাদের ওপরে আইনি খবরদারি করবে গরিব দেশ বা প্রান্তিক দেশের নেতারা। এই ভয়ে তারা ওই ফান্ড চুক্তি করতে চাইছে না বা যে স্বপ্ন দেখছে ক্লাইমেট ভিকটিম দেশগুলো, তা মানছে না। কিন্তু তারা মানুষ হত্যায়, মানুষের বসবাসের ক্ষতি, উৎপাদনের ক্ষতি, বৈশ্বিক জলবায়ু বিপর্যয় ঘটাতে কসুর করেনি, করছে না। এই যে নীতি মানবতার প্রতি অবহেলা, মূলত এটাই মূল সংকট। মিটিগেশন, অ্যাডাপটেশন বা অভিযোজনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানে পৌঁছাতে পারবে না। সত্যিকার অর্থে মানুষের আসন্ন দুর্বিপাক মোকাবিলা করতে হলে বৈশ্বিক ইমব্যালান্স অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আনতে হবে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সমতার মধ্যে। ধনী ও গরিবের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। বাঁচার অধিকারকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। অবশ্যই লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড ক্রিয়েট করে, চুক্তিতে সইয়ের মাধ্যমে নিজেদের অন্যায় থেকে ধনী ও সম্পদশালীরা বেরিয়ে আসতে পারেন। আজ মানবতা রক্ষার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।

ড. মাহবুব হাসান : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়