মেঘনা তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের কাজ অনিশ্চিত

আগের সংবাদ

‘গান শোনাতে চাই, দেখাতে নয়’

পরের সংবাদ

আইনি জটিলতায় চেয়ারম্যান

জাপার কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা, নেতাকর্মীরা হতাশায়

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৩, ২০২২ , ৮:৫১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৩, ২০২২ , ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে সরকারের সমালোচনা করে আসা জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের হঠাৎ করেই আটকে গেছেন আইনি জটিলতায়। দল থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধার একটি মামলায় গত ৩১ অক্টোবর জি এম কাদেরের ওপর দলীয় সিদ্ধান্ত নেয়ায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেন ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ মাসুদুল হক।

শুধু সিদ্ধান্ত নেয়াই নয়, চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয় কার্যক্রম থেকেই বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাকে। নিষেধাজ্ঞার কারণে গত ৩১ অক্টোবর থেকে কার্যত দলীয় কার্যক্রম থেকে বিরত রয়েছেন কাদের। জাপা চেয়ারম্যানের ওপর দেয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চেয়ে করা আবেদনের ওপর শুনানি শেষে গত ১৬ নভেম্বর তা খারিজ করে দেন আদালত। যদিও বিচারিক আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের কথা বলছেন তার আইনজীবীরা।

ফলে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে জি এম কাদেরকে। এ অবস্থায় দলটির কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। হতাশ নেতাকর্মীরা বলছেন, জাতীয় পার্টিকে চাপে রাখার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত।

জানা যায়, আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকায় ২১ দিন ধরে দলীয় কার্যক্রমে অংশ নেননি জি এম কাদের। বনানী কার্যালয়ে মাঝেমধ্যে গেলেও দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। নিষেধাজ্ঞার মধ্যে গত ৬ নভেম্বর সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা হিসেবে ২০তম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য দিয়েছেন। আর ৭ নভেম্বর জি এম কাদেরের উত্তরার বাসভবনে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। গত ৪ অক্টোবর দলের বহিষ্কৃত নেতা জিয়াউল হক মৃধা জি এম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে অবৈধ ঘোষণার ডিক্রি চেয়ে প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করেন।

মামলায় জিয়াউল হকের বহিষ্কারাদেশকে বেআইনি ঘোষণা এবং দলীয় গঠনতন্ত্রের ২০-এর উপধারা ১(১) অবৈধ ঘোষণার আবেদন জানানো হয়। মামলায় জি এম কাদের ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের সচিব, জাপা মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম দপ্তর সম্পাদককে বিবাদী করা হয়। জিয়াউল হক জাপার সাবেক সংসদ সদস্য এবং দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। জি এম কাদেরের পক্ষে বলা হয়েছে, জিয়াউল হককে আইন মেনে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া জাপার

প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ সব পদপদবি থেকে গত ১৪ সেপ্টেম্বর অব্যাহতি পাওয়া মসিউর রহমান রাঙ্গা ২৩ অক্টোবর একটি মামলা করেন। ওই মামলার শুনানি নিয়ে আদালত কেন দলীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে জি এম কাদেরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে না- জিএম কাদেরের কাছে তা জানতে চেয়ে নোটিস জারি করেছেন। ১৫ দিনের মধ্যে নোটিসের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই মামলায়ও আপত্তি দাখিল করার জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেছেন জি এম কাদের। আগামী ২ জানুয়ারি এ মামলার পরবর্তী শুনানির দিন রাখা হয়েছে। এছাড়া আরো কয়েকটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জানা যায়, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের মধ্যে দ্বদ্বের কারণেই এসব মামলা সামনে এসেছে। জি এম কাদেরের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় আগামী ২৬ নভেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর জাতীয় পার্টির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। গত ১৯ নভেম্বর বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহের টাউন হল ময়দানে জাতীয় পার্টির কর্মী সমাবেশ স্থগিত করা হয়েছে।

সাবেক সংসদ সদস্য ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র প্রয়াত জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেলের স্মরণসভায় গত ১৮ নভেম্বর যোগ দেয়ার কথা থাকলেও আইনি জটিলতায় যাননি তিনি। নেতাকর্মীরা বলছেন, জাপা চেয়ারম্যানকে কেন্দ্র করেই দলের অধিকাংশ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। তার অনুপস্থিতিতে কর্মকাণ্ড অনেক কমে গেছে। এই অবস্থায় দলের নেতৃত্বে ভারপ্রাপ্ত কাউকে আনা যায় কিনা- এ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, আইনি বিষয়ে কথা বলা মুশকিল। এ বিষয়ে দেশের বিজ্ঞ কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা জানিয়েছেন এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা তাদের বোধগম্য নয়। নজিরও নেই। জাতীয় পার্টি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। দলের চেয়ারম্যানের কর্মকাণ্ডের ওপর দলের কর্মকাণ্ড অনেকাংশে নির্ভর করে। এই নিষেধাজ্ঞা রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের মুখপাত্র কাজী মামুনুর রশীদ বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে বিচার বিভাগ স্বাধীন। রাজনৈতিক দল বা দলের নেতা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। আইন প্রণেতারাও যদি জনগণের বিরুদ্ধে কোনো আইন প্রণয়ন করেন তাহলে বিচার বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে পারেন।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ????জি এম কাদেরের রাজনৈতিক ও দলীয় কার্যক্রমের প্রতি আদালতের নিষেধাজ্ঞা একটি নজিরবিহীন ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো দলের প্রধানের বিরুদ্ধে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি। কিন্তু আমাদের একটা বিক্ষুব্ধ পক্ষ জাপাকে অহেতুক চাপে রাখার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দল এবং এর গঠনতন্ত্র রয়েছে। কাউন্সিলের পর দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা সেই গঠনতন্ত্র অনুমোদন দেন। তারপর গঠনতন্ত্র নিয়ে অভিযোগ তোলার সুযোগ নেই। আইন নিজস্ব গতিতে চলছে না অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এটা আমাদের দেশের জন্য দুর্ভাগ্য।

বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, এ নিয়ে মন্তব্য করাও ঠিক হবে না। দলটির আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু বলেন, কোনো ষড়যন্ত্রই জাপার ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারবে না। জাপা জি এম কাদেরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। দালালদের জায়গা জাপায় হবে না। দালালদের দলের নেতাকর্মীরা রেহাই দেবে না।

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি গঠন করেন। দীর্ঘ পথ চলায় এই দল থেকে অনেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদা দল গঠন করেন। কিন্তু মূল দল হিসেবে দেশের রাজনীতিতে ক্রমাগত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এরশাদের গড়া জাতীয় পার্টি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ৩২টি, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৭টি, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ৩৪টি। বর্তমানে জাতীয় পার্টির আসন ২৬টি।

দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টি বেশ সরব ও সক্রিয়। বিগত দিনের মতো আগামী সংসদ নির্বাচনেও মূল ফ্যাক্টর হবে জাপা। রাজনীতি নিয়ে যারা ভাবেন, যারা ভোট এবং ক্ষমতার অঙ্ক কষেন, তারা এটা ভালো করেই জানেন- জাতীয় পার্টিকে বাদ দিয়ে সরকার গঠন করা প্রায় অসম্ভব। টানা তিন মেয়াদে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। প্রথমবার তারা জাতীয় পার্টির সঙ্গে মহাজোট গঠন করেই সরকারে যায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদে দলটির ক্ষমতাসীন হওয়ার পেছনেও মূল অনুঘটকের কাজটি করে জাতীয় পার্টি।

কেএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়