ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে

আগের সংবাদ

জঙ্গি ছিনতাই : এ গাফিলতির দায়ভার কে নেবে?

পরের সংবাদ

খালেদাকে বিএনপি হ্যামিলনের বংশীবাদক বানাতে চায় : দেশ কোথায় ঝাঁপ দেবে?

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: নভেম্বর ২২, ২০২২ , ১:৪০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০২২ , ১:৪০ পূর্বাহ্ণ

সিলেটে বিএনপির দলীয় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে টিভি সংবাদে সিলেটের একজন বিএনপি নেতা কিংবা কর্মী বলেছিলেন যে, তাদের হ্যামিলনের বংশীবাদকের সুরে ৫৪ হাজার বর্গমাইল বাংলাদেশের মানুষ জেগে উঠবে। কথাটি শুনে আমি ভেবেছিলাম যে এই বিএনপির কর্মী হয়তো তারেক রহমান সম্পর্কে এমন দাবি করছেন। তবে হ্যামিলনের বংশীবাদক গল্পের শিখন ফল তার বোধহয় জানা নেই। তিনি হয়তো ভাবাবেগে তারেক রহমানের বাঁশির সুরে মানুষ তার পিছু নেবেন বলে কল্পনা করেই এমনটি বলেছেন। কিন্তু জনসভায় দলের মহাসচিবের বক্তব্য শুনে আমার অনুমান পাল্টাতে হলো। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিলেটের জনসভায় বললেন, ‘বেগম জিয়া তো হ্যামিলনের বংশীবাদক। উনি বেরুলে সেই বাঁশি যদি বাজাতে শুরু করেন তাহলে দেশের সেই লাখ লাখ মানুষ একাধারে রাস্তায় নেমে আসবে।’ মির্জা ফখরুল লেখাপড়া জানা মানুষ, হ্যামিলনের বংশীবাদক গল্পটি নিশ্চয়ই তার পড়া আছে। কিন্তু তিনি সেই গল্পটিকে এবার নিজ দলের নেত্রীর ক্ষেত্রে যেভাবে ব্যবহার করলেন তাতে বোঝা গেল হয় তিনি গোটা জাতিকে বোকা মনে করেন, নতুবা তিনি হ্যামিলনের বংশীবাদকের বাঁশির সর্বনাশা কীর্তির কথা নিজে জানলেও বাংলাদেশের জনগণকে ভুলভাবে শেখাতে চাচ্ছেন।
হ্যামিলন জার্মানির নিম্ন স্যাক্সনির একটি ছোট শহর। মধ্যযুগে এই শহরে ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সেই সময় প্লেগ রোগের অন্যতম বাহক ছিল ইঁদুর। শহরে ময়লা-আবর্জনা বাড়ির পাশে রাস্তার ওপরে ফেলে রাখা হতো। আজকের দিনের মতো নর্দমা কিংবা ডাস্টবিন ব্যবস্থা তখনকার নগরীতে ছিল না। বাড়ির ময়লা-আবর্জনা পচে তাতে জন্ম নিত নানা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত শহরব্যাপী। তখন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস সম্পর্কে কারো কোনো ধারণা ছিল না। বাড়ির তেলাপোকা, ইঁদুর, মশা-মাছি ওইসব ময়লা থেকে ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস তুলে আনত বাড়িতে, খাবারের ঘরে আর তাতেই মানুষ সংক্রমিত হতো। অতিমারিতে শহরের দালানকোঠার কিংবা বস্তির মানুষ মারা যেত। তারা জানত না কেন তারা মারা যাচ্ছে। প্রকৃতির অভিশাপ হিসেবে এটিকে মনে করা হতো। অনেক সময় শহর ছেড়ে মানুষ গ্রামে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করত। গ্রামের মানুষ তাদের বাধা দিত, আশ্রয় দিত না। মধ্যযুগে গ্রামের জমিদার এবং বণিকরা দালানকোঠা বানিয়ে শহর বানাত। কিন্তু শহরে নর্দমা, ডাস্টবিন, রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার নিয়ম জানত না। সে কারণেই তাদের বাড়ির আবর্জনা রাস্তাঘাটে ফেলার অভ্যাস অজান্তেই গড়ে উঠেছিল। গ্রামে আবর্জনা মানুষ ঘর থেকে দূরে কোথাও বনজঙ্গলে ফেলে। কিন্তু শহরে সেই দূরটা একেবারেই ঘরের কাছে, রাস্তায় আবর্জনা ফেলা ছাড়া অন্য কোনো উপায় তাদের ছিল না। আর তাতেই তেলাপোকা, ইঁদুরের আহার যেমন জুটত, সেই আহার থেকে মুখে করে বয়ে আনা জীবাণুও মানুষের ঘরে অনায়াসে প্রবেশ করত। মানুষ সেটি খালি চোখেও দেখত না, আক্রান্ত হলেও বুঝত না। তখন চিকিৎসা বিজ্ঞান তেমন একটা ছিল না। ফলে প্লেগ রোগ মধ্যযুগে একটি নিয়মিত অতিমারি ঘটনার ব্যাপার ছিল, তেলাপোকা, ইঁদুর ও মশামাছি এর অন্যতম বাহকও ছিল। হ্যামিলন শহরে একবার যখন ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে গেল তখন সবাই ইঁদুর নিধনে ব্যর্থ হয়ে মেয়রের শরণাপন্ন হয়েছিল। কথিত আছে মেয়র পরামর্শ নিয়েছিলেন কীভাবে শহরের ইঁদুর তাড়ানো যায়। মেয়র ঘোষণা করলেন, যে ইঁদুর তাড়াতে পারবে তাকে মোটা অঙ্কে পুরস্কৃত করা হবে। এক বংশীবাদক এসে দাবি করেছিল যে সে কাজটি করতে পারবে। গল্পে আছে সে বাঁশি বাজাতে শুরু করলে বাসাবাড়ি থেকে সব ইঁদুর তার বাঁশির সুর শুনে ঝাঁকে ঝাঁকে বের হয়ে এলো। বংশীবাদকের পেছনে নাচতে নাচতে তারা এগুতে থাকল। বংশীবাদক এসব উন্মত্ত ইঁদুরকে পাশের ওয়েজার নদীর তীরে নিয়ে গেলে সব লাফিয়ে লাফিয়ে নদীতে পড়ে মারা গেল। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। বংশীবাদক তার পুরস্কার পেতে মেয়রের কাছে এলে মেয়র তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন। মনের দুঃখে বংশীবাদক ছোট ওই শহরটিতে আবার বাঁশি বাজাতে থাকেন। এবার বাঁশির সুরে বিমোহিত হয়েছিল হ্যামিলনের ছোট ছোট শিশুরা। তারা সবাই বংশীবাদকের পিছু নিল। বংশীবাদক সেই শিশুদের নিয়ে সামনে এগোতে থাকলেন। গল্পে কোথাও উল্লেখ আছে পাহাড়ের গুহা অতিক্রম করে শিশুদের নিয়ে হারিয়ে গেছেন। আবার কোথাও উল্লেখ আছে ওয়েজার নদীতেই শিশুরাও ইঁদুরের মতোই লাফিয়ে পড়ে মারা গেছে। এরপর আর সেই বংশীবাদককে কেউ দেখেনি। কিন্তু শহরের মা-বাবারা সন্তানহারা হলেন। গল্পের পাঠকরা গল্পটিকে মেয়রের প্রতিশ্রæতি ভঙ্গের প্রতিশোধ হিসেবে বংশীবাদক শিশুদের নিরুদ্দেশ কিংবা মেরে ফেলার শিক্ষা হিসেবে দেখেছেন। কেউ এটিকে কাল্পনিক ঘটনা বলেও এড়িয়ে যান আবার কেউ বলেন এটি সত্যি কোনো ঘটনা ছিল। তবে এই গল্পের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি আজো কেউ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। মধ্যযুগে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে মানুষ দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছোটাছুটি করত, অনেক কুসংস্কারও তাদের পেয়ে বসত। সেসব নিয়েও নানা মুখরোচক কল্পকাহিনী শোনা যেত, মুখে মুখে প্রচারিত হতো। এ নিয়ে অনেকেই গল্প-কবিতা লিখেছেন, চিত্রশিল্পীরা অনেক ছবিও এঁকেছেন। মিউজিয়ামে সেগুলো শোভাও পাচ্ছে। তবে হ্যামিলনের বংশীবাদকের আর শিশুদের নিরুদ্দেশ করার কল্পকাহিনী কেউ কেউ ত্রয়োদশ শতকে একটি কাঠের ফলকে এ ঘটনার একটি ছবি অঙ্কিত হয়েছিল বলে বলছেন। ১৮ শতকে অবশ্য সেই ফলকটি ঝড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। ১৮২৪ সালে রাস্তার টানানো একটি কাঠের ফলকে হ্যামিলনের ১৩০টি শিশুকে এক ব্যক্তির অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার কথা লেখা হয়েছিল। কল্পিত এই বংশীবাদকের গল্পটি পড়ার উদ্দেশ্যটি হচ্ছে মধ্যযুগের নগর উত্থানের পর্বে মানুষের অসচেতনতা, প্লেগ রোগে আক্রান্ত হওয়া, ইঁদুর, তেলাপোকা, মশা-মাছির উৎপাতের অন্যতম উৎস হিসেবে স্তূপীকৃত ময়লা-আবর্জনা ইত্যাদি নোংরা পরিবেশকে স্মরণ করিয়ে দেয়া, নানা মহামারিতে অজানা-অচেনা বংশীবাদকদের মতো প্রতারকদের আবির্ভাব এবং তাদের মাধ্যমে ইঁদুর মারার গল্প শোনানোই শুধু নয়, শিশু অপহরণের নানা দুঃখজনক ঘটনাও তুলে ধরা হতো। এই গল্পটির শিখন ফল হচ্ছে প্রতারকের হাত থেকে ইঁদুরও নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরতে পারে, শিশুরাও মরতে পারে। রাজনীতিতে হ্যামিলনের বংশীবাদকের ফাঁদে না পড়ার অনেক সতর্কবাণী অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের মুখ বা লেখা থেকে আমরা জানতে পারি। রূপক অর্থেই বলা হয়ে থাকে, উগ্র হঠকারী মতাদর্শে অনেক কিশোর ও তরুণ গভীর মর্মার্থ না বুঝে আবেগে তাড়িত হয়ে পা বাড়ায়। অধিকাংশই বিপ্লব চিন্তার কিছুই সম্মুখে দেখতে পায় না। কিছুদিন রোমান্টিক অনুভূতিতে সিক্ত হয়ে অস্ত্র চালানো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কিংবা নানা তত্ত্ব কথায় ইউটোপীয় তথা কল্পিত রাজ্যে বসবাস করার স্বপ্ন দেখতে থাকে। কিন্তু যখন ধরাছোঁয়া যায় না তখন এদের জীবন কখনোবা গলা কাটা রাজনীতিতে, কখনো ব্যাংক লুটে, কখনো বোমাবাজিতে অথবা অন্যের সম্পদ লুটপাটে যুক্ত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। অনেকেই সিরাজ সিকদার, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রব, তোহায়া, মুফতি হান্নানসহ নানা ধরনের জঙ্গিবাদী ইসলামী বিপ্লবের আবেগে তাড়িত রাজনৈতিক দলের আদর্শের মধ্যে হ্যামিলনের বংশীবাদকের শেষ পরিণতি দেখতে পায়। আমাদের দেশেই বহু তরুণ-তরুণী অল্পবয়সি বিপ্লবের স্বপ্ন ও দীক্ষা নিয়ে শেষে সশস্ত্র পন্থার বিপ্লবকে খুঁজে না পেয়ে মানুষ হত্যার রাজনীতিতে আত্মগোপনে কাটিয়েছে। ভুল নেতৃত্ব একটা জাতিকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার অজস্র প্রমাণ পাকিস্তানকালে বহুধা বিভক্ত বিপ্লবী এবং ইসলামি মতাদর্শে সাড়া দিয়ে অনেক তরুণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, মানুষ হত্যায় অংশ নিয়েছিল। আবার স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতাদর্শে তাড়িত হয়ে জাসদ এবং সর্বহারা নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে নিজেদেরই শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথে নিয়ে গেছে। আশির দশকে ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে অনেকে তালেবান হওয়া, ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য আফগানিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যে দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিতে চলে গেছে। এরাই এখন দেশের অভ্যন্তরে উগ্র জঙ্গিবাদী নানা সংগঠনে যুক্ত হয়ে দেশকে কাল্পনিক এক ধর্মরাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করতে চাচ্ছে। তাদের সবার সম্মুখে একেকজন হ্যামিলনের বংশীবাদক রয়েছে। ওরা হয়তো জানে না হ্যামিলনের বংশীবাদকের পথে পা বাড়ালে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নদীতে ঝাঁপ দিতে হতে পারে অথবা অজানা-অচেনা পাহাড় অতিক্রম করতে গিয়ে হারিয়ে যেতে হতে পারে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খালেদা জিয়াকে হ্যামিলনের বংশীবাদক বানিয়ে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফে বাঁশি বাজিয়ে অবশেষে বঙ্গোপসাগরেই নিক্ষেপ কাদের করতে চান- সেটিই মস্ত বড় প্রশ্ন। তার বক্তব্যের সুর তো এমনই ছিল। তার দাবি ‘লাখ লাখ মানুষ’ তার পেছনে নেমে আসবে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে লাখ লাখ মানুষ নামলে এমন কী হবে? তারপরও এই নেমে আসা মানুষরা হ্যামিলনের শিশুদের মতো বঙ্গোপসাগরে ঝাঁপ দিতে যাবেন কি? খালেদা জিয়াকে হ্যামিলনের বংশীবাদক বানিয়ে তিনি এবং তার দল আমাদের ‘প্রতারক নেতৃত্বের’ পেছনেই কি দাঁড় করাতে চাচ্ছেন? এই বক্তৃতাতেই তাকে গণতন্ত্রের চারণ কবি বানিয়েছেন। কিন্তু আমরা তার সেই চারণ কবিতার কোনো স্মরণীয় উদ্ধৃতি স্মরণ করতে পারছি না। একসময় তাকে প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা বলা হয়েছিল। এবার তিনি তাকে হ্যামিলনের বংশীবাদক বানালেন। মির্জা ফখরুল কি নিজেই হ্যামিলনের নতুন কোনো বংশীবাদক সাজতে চান কিনা? রাজনীতি আসলে খুবই দুর্বোধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাস, বাস্তবতা, যুক্তি এবং বর্তমানের সংকট সমাধানের যেন পথ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা রাজনীতিবিদদের চিন্তা ও মননে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা হ্যামিলনে না থাকলেও ওয়েজার নদীর তীরেই বোধহয় এসে দাঁড়িয়ে আছি।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়