অতিথি পাখি রক্ষা করতে হবে

আগের সংবাদ

ট্রাফিক জ্যামের গ্যাঁড়াকলে জীবনযাত্রা

পরের সংবাদ

বিশ্বকাপ ফুটবল ও বাংলাদেশি সমর্থকদের বাড়াবাড়ি

রবি রায়হান

কবি ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২২ , ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ১৮, ২০২২ , ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

বাঙালি জাতি খুবই আবেগপ্রবণ ও উৎসবপ্রিয়। যে কোনো উৎসবে বাঙালি জাতি মনপ্রাণ উজাড় করে আনন্দে মেতে ওঠে। খেলাধুলা তেমনি একটি বড় আনন্দের উপলক্ষ বাঙালি জাতির জন্য। যদিও অলিম্পিক, বিশ্বের প্রায় সব দেশের অংশগ্রহণে সবচেয়ে বড় একটি খেলার আসর। কিন্তু জনপ্রিয়তার দিক থেকে সবার উপরে ফুটবল বিশ্বকাপ। এই ফুটবল বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ বিশ্ববাসীর দুয়ারে সমাগত। আগামী ২০ নভেম্বর বিশ্বকাপের ২২তম আসর মরুভূমির ছোট একটি দেশ কিন্তু বিশ্বের ধনী দেশগুলোর মধ্যে একটি কাতারে শুরু হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এবারের বিশ্বকাপে ৩২টি দেশ অংশগ্রহণের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছে। প্রায় সব দেশের ফুটবল দল কাতারের রাজধানী দোহায় পৌঁছে গেছে। সর্বমোট ৫ শহরের ৮টি আধুনিক স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হবে। সারাবিশ্বের খেলা পাগল মানুষ সব প্রস্তুতি শেষে এখনই মেতে উঠেছে তাদের নিজ নিজ দলের সমর্থনে। খেলা পাগল জাতি হিসেবে বাঙালি জাতির সুনাম কোনো অংশে কম নয়। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য জাতির চেয়ে, পাগলামিতে বাঙালি জাতি এককাঠি সরস। উদ্ভট উদ্ভট কাণ্ড কারখানা ঘটায় আমাদের দেশের খেলাপাগল সমর্থকরা।
যেসব দেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে সেসব দেশের সমর্থকদের চেয়ে বেশি উন্মাদ সমর্থক আমাদের দেশে দেখা যায়। যা সত্যি অবাক করার মতো একটি ব্যাপার। ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতি ও পাগলামি এটাই প্রমাণ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ফুটবল কতটা জনপ্রিয় খেলা। একমাত্র ফুটবল খেলা বিশ্বের সব দেশ, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সার্বজনীন প্রিয় একটি খেলা হিসেবে পরিগণিত। নিঃসন্দে ফুটবল বিশ্বকাপ, পৃথিবী নামক গ্রহের বড় একটি উৎসব। যার জনপ্রিয়তার সমতুল্য অন্য কোনো খেলা নেই, এই পৃথিবী নামক গ্রহে। তাই তো ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’ বলা হয় এই বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর কে। বাংলাদেশ ফুটবল দল এই আসরের চিরন্তন দর্শক। এবং অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ফুটবল দলের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা শূন্যের কোটায়। কারণ বাংলাদেশ ফুটবল দল এশিয়ান স্ট্যান্ডার্ডে এখনো উন্নীত হতে পারেনি। বিশ্বকাপ সে তো রূপকথার গল্পের মতো।
খেলাধুলা একটি জাতির ঐতিহ্যের অংশ। তাই বলে সব খেলায় সব জাতি সমানভাবে পারদর্শী হয় না। বিভিন্ন খেলায় পারদর্শিতার জন্য বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন। যেমন জাতিগত বৈশিষ্ট্য, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, শারীরিক গঠনশৈলী ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ বিশ্বমানের ফুটবল কবে খেলবে সেই আশা ও দুরাশা। তবুও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমী দর্শকরা হাত পা গুটিয়ে বসে নেই। তারা তাদের নিজ নিজ প্রিয় দল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন ও পর্তুগালকে নিয়ে অনেক আগে থেকে মাতামাতি শুরু করেছে। যাদের নিজ দেশ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। হয়তো কোনোদিনও বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা নেই। তাতেও কোনো সমস্যা নেই। যে কোনো দেশের দর্শক তাদের পছন্দের দলকে সমর্থন করতেই পারে। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এটা নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি যদি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। তখনই ঘটে বিপত্তি। মনে রাখতে হবে, একজন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষের পক্ষে কখনো নিজের মানসম্মান, সভ্যতা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে এমন কিছুই করা উচিত নয়। যাতে আপন আপন ব্যক্তিসত্তা ভূলুণ্ঠিত হয়। ঠিক তেমনিভাবে এই কথাগুলো একটি দেশ বা জাতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। জাতিসত্তা ও মাতৃভূমির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এমন আচরণ একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে কখনো করা উচিত হবে না।
আমাদের দেশের দর্শকদের বাড়াবাড়ির অতীত রেকর্ড খুব একটা সুখকর নয়। বাংলাদেশে বিশ্বকাপ এলেই বিভিন্ন বাড়ির ছাদে উড়তে থাকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পতাকা। এদের মধ্যে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকাই বেশি। ব্যাপারটা ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে বসে অবলোকন করেছেন জাতীয় দলের সে সময়কার আর্জেন্টাইন কোচ ডিয়েগো আন্দ্রেস ক্রুসিয়ানি ও ট্রেনার ভিক্টর আরিয়েল কোলম্যান। এই দুজনের কল্যাণেই বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা উড়ানোর দৃশ্য আর্জেন্টিনার পত্র-পত্রিকায় ছাপানো হয়। ব্রাজিলেও এ নিয়ে বহুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আর গত বিশ্বকাপের সময় জার্মানির বিশাল এক পতাকা বানিয়ে ঢাকার জার্মান দূতাবাসের দৃষ্টি কেড়েছিলেন মাগুরার এক বৃদ্ধ। অন্যদিকে বাড়ির ছাদে পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কিশোরের মৃত্যু শিরোনাম হয়েছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সাধারণত প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। এই দল দুটির সমর্থকদের সংখ্যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। বিশ্বকাপের সময় সারাদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকায় ছেয়ে যায় পুরো দেশ। অনেক ব্যক্তির নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা অথচ তাদের এমন পাগলামি বিশ্বকাপের সময় মাত্রা জ্ঞান হারিয়ে পাগলামি পর্যায়ে চলে যায়। কেন এই পাগলামি? এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে।
দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে কোন দলের সমর্থকরা কত বড় পতাকা বানাবে এবং দুঃখের বিষয় হচ্ছে সমর্থকদের মাঝে এসব নিয়ে এমনই বৈরিতার সৃষ্টি হয় যে, ভিনদেশি দলের সমর্থনকে কেন্দ্র করে একে অপরের প্রাণ হন্তারক হিসেবে আবির্ভূত হয়। যে দেশ দুটির সমর্থনে আমাদের দেশের দর্শকদের বাড়াবাড়ি চরমে পৌঁছে। মজার বিষয় হলো দেশ দুটির খেলোয়াড়রা বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখে না। নব্বই সালের বিশ্বকাপের পর আমাদের দেশের ফুটবলকে জাগিয়ে তুলতে আমাদের ফুটবলের কর্তাব্যক্তিরা ফুটবলের মহাতারকা ম্যারাডোনাকে বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করে ছিলেন। বাংলাদেশের নাম শুনে ম্যারাডোনা আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। বাংলাদেশ কোথায়? অথচ এই ম্যারাডোনা ও আর্জেন্টিনার জন্য আমাদের দেশের দর্শকদের বাড়াবাড়ি চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে।
তেমনিভাবে সাম্বা নৃত্যের ছন্দে ছন্দে ফুটবলের আধুনিক কারুকাজ দেখিয়ে দর্শকপ্রিয়তা অর্জনকারী ফুটবল বিশ্বের শক্তিধর দেশ ব্রাজিল। এই দেশের সমর্থকদের সংখ্যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। এই দেশের খেলোয়াড়দেরও বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। আমাদের দেশের দর্শকদের বোধোদয় কবে হবে? যে দেশের ফুটবলাররা আমাদের দেশকে চেনে না এবং নাম পর্যন্ত জানে না। তাদের নিয়ে আমরা আমাদের নিজস্বতা ভুলে উন্মাদের ন্যায় আচরণ করি।
বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থনে পাগলপারা সমর্থকরা যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে পতাকা ও জার্সির পেছনে! কোনো কোনো সমর্থক বিশাল রাস্তাজুড়ে আলপনা এঁকে এবং ঘরবাড়ি প্রিয় দলের জার্সির রঙে রাঙিয়ে নিজেকে সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে জাহির করে! ভিনদেশি একটা দলকে সমর্থন করতে গিয়ে যেভাবে পানির মতো টাকা খরচ করে, সমর্থকরা সেই টাকা দিয়ে আমাদের দেশের হাজারো পরিবার দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। প্রতিটি বিশ্বকাপে দল দুটির পেছনে যে কোটি কোটি টাকা আমাদের দেশের সমর্থকরা খরচ করে তা কি কোনো উপকারে আসে আমাদের দেশের ও খেলার? আমি বলব এটা কোনোই উপকারে আসে না। আমাদের দেশের ফুটবলের মান আমাদের সবারই জানা।
মনে রাখতে হবে যেকোনো খেলায় হোক না কেন- দিন শেষে এটি একটি খেলা। আর খেলায় হারজিত পক্ষ বিপক্ষ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে এই বিশ্বকাপ খেলাকে কেন্দ্র করে ভাইয়ে ভাইয়ে ও বন্ধুত্বের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি করে কী লাভ? এই বাড়াবাড়ির বা কী প্রয়োজন? এটা বোধগম্য নয়। কট্টর সমর্থক হওয়ার মানসিকতা পরিত্যাগ করে খেলাকে খেলা হিসেবে নিলে কোনো ধরনের সমস্যা হয় না। প্রত্যেকের আলাদা পছন্দ থাকতেই পারে। সেই দলের খেলা দেখতে ভালো লাগতে পারে। এটা স্বাভাবিক ঘটনা। বাঙালি জাতি ফুটবলপ্রিয় জাতি এটা অবশ্যই গর্বের। তাই খেলাকে খেলা হিসেবে নিয়ে অতি মাতামাতি ও অকারণে অর্থ বিনষ্ট না করে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ বজায় রেখে একে অপরের মতামতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা উচিত। এবং অনর্থক দলাদলি না করে সবাই মিলে আনন্দ ভাগাভাগি করে বিশ্বকাপ ফুটবল উপভোগ করা উচিত হবে। তাতে দেশ ও ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার সম্মান অক্ষুণ্ন থাকবে। আমরাও ফুটবলপ্রিয় ভদ্র জাতি হিসেবে সবার কাছে সম্মানিত হবো।

রবি রায়হান : কবি ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়