একজন স্বল্প শিক্ষিতের কথা

আগের সংবাদ

ফারদিন হত্যা : সুষ্ঠু তদন্তে প্রকৃত ঘটনার উন্মোচন হোক

পরের সংবাদ

অসংযত লোভ মানুষকে অসহনশীল করে তুলছে

বিভুরঞ্জন সরকার

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৬, ২০২২ , ১:৩০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ১৬, ২০২২ , ১:৩০ পূর্বাহ্ণ

পৃথিবীতে যে কত কারণে কত দিবস পালন করা হয়, তার সব সবার হয়তো জানাও নেই। এই তো, গত শতকের শেষ দশকের আগে আমাদের দেশে ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবসের কথা বেশি মানুষের জানা ছিল না। সাপ্তাহিক যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমানের কারণে বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবসের প্রচলন হয়েছে বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। এখন প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ঘটা করে ভালোবাসা দিবস পালন করা হয়। আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসটি আমাদের দেশে এখনো তেমন জনপ্রিয় হয়ে না উঠলেও, ওঠার বাস্তব কারণ রয়েছে। সহনশীলতা মানুষের একটি গুণ। অবশ্য সব মানুষের মধ্যে এই গুণ দেখা যায় না। কেউ হয়তো জন্মগতভাবে বা পারিবারিক অনুশাসনের মাধ্যমে এই গুণের অধিকারী হয়, আবার কেউবা শিক্ষার মাধ্যমেও এটা আয়ত্ত করতে পারেন বা করেন। এই গুণের চর্চাও বিভিন্ন পর্যায়েও হতে পারে। পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে এবং রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসরে সহনশীলতার চর্চা কিন্তু অপকারের চেয়ে উপকারই বেশি করে। সহনশীলতা রপ্ত করা খুব কঠিন কিছু নয়। এর জন্য পাওয়ার লোভ সংবরণ করলেই হয়। ছাড় দেয়ার মানসিকতাই সহনশীলতার মূলমন্ত্র। মনটা একটু উদার করলে, অন্যের কথা বা মতটা ধৈর্য নিয়ে শুনলে, অন্যের ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়ার মনোভাব না থাকলেই সহনশীল হওয়া যায়। সহনশীলতা সম্প্রীতি বাড়ায়, মানুষে মানুষে ভুল বোঝাবুঝি কমায়। একটি রাষ্ট্রে সহনশীল নাগরিকরা যদি বিদ্বেষমুক্ত থাকতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্রও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে।
মানুষ যেভাবে ক্রমেই বিদ্বেষপরায়ণ ও হিংসুটে স্বভাবের হয়ে উঠছে, তাতে সহনশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। মানুষের নানা কারণেই সহনশীল হওয়া উচিত। পারস্পরিক সম্পর্কগুলো অমলিন রাখার জন্য, মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধের জন্য, আস্থা ও ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করার জন্য সহনশীলতার বিকল্প নেই। সবচেয়ে বড় কথা সহনশীল হলে ক্ষতির চেয়ে লাভই হয় বেশি। সহনশীলতার অভাব মানুষে মানুষে তিক্ততা বাড়ায়, মানুষের ওপর মানুষের আস্থা চলে যায়। অসহনশীল মানুষকে এড়িয়ে চলা হয়। প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন অসহনশীল হয়? মনে করা হয়, ক্ষমতা এবং ক্ষমতার হাত ধরে আসা প্রতিপত্তি, অর্থ, অহমবোধ একজনকে অসহনশীল করে তোলে। অসহিষ্ণু মানুষ নিজের ক্ষমতাকে রক্ষাকবচ ভাবতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি তার রক্ষণদেয়ালে ফাটল ধরায়। জ্ঞানের সঙ্গে ক্ষমতার একটা সম্পর্ক আছে, কিন্তু ক্ষমতা যদি সৃষ্টিশীল হয়, তাহলে জ্ঞানের বিষয়টিও নতুন মাত্রা পায়। সহনশীলতা মানুষকে সৃষ্টিশীলও করে। ওপরের কথাগুলো বলা হলো আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের কথা মাথায় রেখেই। এই দিবসটি নানা কারণে মানবসমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল মানুষের মাথা গরম স্বভাবটা বুঝি বেড়েছে। সেটা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে নাকি এর অন্য কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মতাদর্শিক-আঞ্চলিক-বৈশ্বিক কারণ আছে, তা অবশ্য আমি ভেবে দেখিনি। তবে নানা বিষয়েই যে আমরা, মানবসমাজ অসহিষ্ণু, অধৈর্য, বেপরোয়া হয়ে উঠছি, সেটা তো কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারব না। আমরা কেউ আর পরের কথা শুনতে চাই না, নিজের কথা প্রবলভাবে শোনাতে চাই। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধাবোধ নেই, নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চাই দিগি¦দিকজ্ঞানশূন্য হয়ে। সৌহার্দ-সম্প্রীতির জায়গা দখল করছে উগ্রতা, অসহনশীলতা।
সম্ভবত এ জন্যই প্রতি বছর ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস পালনের ব্যবস্থা হয়েছে। ইউনেস্কো ঘোষিত এই দিবস পালনের লক্ষ্য হচ্ছে- বহুমুখী সমাজে সহনশীলতা শিক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব মানুষের সুষম ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করা। ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৯৫ সাল থেকে ‘আন্তর্জাতিক সহনশীলতা বর্ষ’ উদযাপন করা হবে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নভেম্বর ইউনেস্কোর ২৮তম অধিবেশনে ‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’ গৃহীত এবং প্রতি বছরের ১৬ নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইউনেস্কো মনে করে, মানব সমাজ স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্যময় এবং এ বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে ভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে মানুষের মধ্যে সহনশীল মনোভাব প্রয়োজন। সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার উপস্থিতি সংঘাতের পথকে প্রশস্ত করে না। বরং সহনশীল পরিবেশ এ সামাজিক বাস্তবতাকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের অন্তর্নিহিত সক্ষমতা বাড়ায়। ‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’য় বলা হয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতাকে বাস্তবায়ন করা। ‘সহনশীলতা হচ্ছে সবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে উন্নত করার অপরিহার্য নীতি।’ ইউনেস্কো ঘোষণা দিয়েছে, তাই বছরের একদিন সহনশীলতা দিবস পালন করা এখন অনেকটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। তবে ব্যাপকভাবে নয়। গণমাধ্যমেও এই দিবস নিয়ে তেমন লেখা চোখে পড়ে না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো কর্মসূচি নেয়ার কথা শোনা যায় না। কারণ কি এই যে, আমরা যথেষ্ট সহনশীল? আমাদের আর নতুন করে সহনশীলতা চর্চার প্রয়োজন নেই? আসলে আমরাও তো দিন দিন অতিমাত্রায় অসহনশীল হয়ে পড়ছি। আমরা ভিন্নমতকে পাত্তা দেই না। বিরোধিতা পছন্দ করি না। বিরোধী দলকে নির্বাচনে না আসতে যা যা করার তা করি বিপুল আনন্দে। আপনার মতের সঙ্গে আমি এক মত না হলেও আপনার মত প্রকাশে আমি বাধা হব না, তেমনিও আমাকেও আমার মত প্রকাশ করতে দেবেন আপনি কোনো অন্তরায় সৃষ্টি না করে। কিন্তু কে শুনছে কার কথা! তুচ্ছ কারণে মানুষ খুনোখুনি করছে। সামাজিক বন্ধনগুলো আলগা হয়ে আসছে।
অবশ্য যেসব দেশ সহনশীলতা দিবস পালন করছে, সেসব দেশে সহনশীলতা চর্চা বাড়ছে, তা কিন্তু জোর দিয়ে বলার মতো অবস্থা হয়নি। সহনশীলতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? এক কথায় বললে বলতে হয়, ধৈর্য না হারিয়ে, নিজের রাগ-ক্রোধ সংবরণ করে উদারতার উদাহরণ তৈরি করাই সহনশীলতার লক্ষণ। সব মানুষ এক রকম নয়। সব মানুষের ধর্ম বিশ্বাস এক নয়, সব মানুষের ভাষা এক নয়, সব মানুষের সংস্কৃতি এক নয়, সব মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও এক নয়। কিন্তু এসব ভিন্নতা নিয়ে মানুষকে এক পৃথিবীতে, এক দেশে, আরো ছোট করে বললে এক পাড়ায় বসবাস করতে হয়। এই যে নানা ভিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি বসবাস, তার জন্যই প্রয়োজন বিরোধের বদলে সমঝোতা। মানুষ নিজেদের এবং সমাজের কল্যাণের জন্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই তো দ্ব›দ্ব-বিরোধের পরিবর্তে একতাবদ্ধভাবে থাকতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার কথা। কিন্তু তা না হয়ে মানুষ কেন বিরোধাত্মক মনোভাব সম্পন্ন হয়ে উঠল?
স্বার্থ চিন্তা এবং অসংযত লোভ এবং নানা ভেদজ্ঞানই হয়তো মানুষকে ক্রমাগত সংকীর্ণ ও অসংযত হওয়ার পথে ঠেলতে ঠেলতে এখন একটা চরম হানাহানি ও উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করেছে। সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে সহনশীলতাও আর থাকতে পারে না। মানুষ ক্রমাগত জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশা মানুষকে পেয়ে বসেছে। মানুষ যতই অজানাকে জানছে ততই তার মধ্যে অস্তিরতাও বাড়ছে। আরো জানার আগ্রহ মানুষের তৃপ্তি কেড়ে নিয়েছে। সারাক্ষণ তার মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে। মনের মধ্যে চাপ বাড়ছে। আর এই ক্রমবর্ধমান চাপ মানুষের জীবনকে ধৈর্যহীন করে তুলছে। ধৈর্যের অভাব একদিকে মানুষের আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তার সাহসও কমিয়ে দিচ্ছে। ও বুঝি আমাকে ছাড়িয়ে গেল, আমি বুঝি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লাম, ওর হলো, আমার হলো না- এমনতর সব ঘটনার তাড়া মানুষকে সহনশীল থাকতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীরা পরস্পরকে শত্রæ ভাবছে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে অবিশ্বাস বাড়ছে, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ বাড়ছে, সম্পদের বণ্টন সুষম হচ্ছে না- সব কিছুর মিলিত ফল হিংসা। হিংসা থেকেই উগ্রতা, জঙ্গিবাদের জন্ম।
আমি শ্রেষ্ঠ, আমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ, আমার বিশ্বাসই চরম সত্য- এমন অন্ধত্ব দায়বদ্ধতার ঘাটতি তৈরি করছে। আমার সঙ্গে সবাইকে একমত হতে হবে, আমার কথা সবাইকে মেনে চলতে হবে- না হলেই গলা থেকে মাথা আলাদা করে দেয়ার চিন্তা পৃথিবীকে শক্তিমত্তার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। অন্যের সঙ্গে কিছু ভাগ করে নেয়ার মনোভাবকে এখন এক ধরনের দুর্বলের চিত্তবিকার বলে উপহাস করা হয়। পৃথিবী নাকি শক্তের ভক্ত, নরমের যম! তাই শক্তি চর্চার অবাধ আয়োজন বিকারগ্রস্ত এক সময়ের মধ্যে এনে ফেলেছে মানব সভ্যতাকে। যারা শক্তির জোরে বিশ্বাসী তাদের যুক্তির জোরে আস্থাশীল করে তোলার চেষ্টা হতে পারে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবসের একটি লক্ষ্য। অন্যের বিশ্বাস, অধিকার, মর্যাদাকে স্বীকার করে নিতে হবে। নিয়ম মানায় অভ্যস্ত হতে হবে। একে অপরের বোকামি বা পাকামিকে ক্ষমা করে দেয়ার ঔদার্য শিখতে হবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সব অসাধারণ কাজগুলো হয়েছে শক্তি দিয়ে যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি দিয়ে। সহনশীলতাকে দুর্বলতা না ভেবে শক্তি হিসেবে ভাবতে হবে। এটা ধ্বংসের শক্তি নয়, সৃষ্টির শক্তি। ধর্ম রক্ষার জন্য ছুরি হাতে, বন্দুক হাতে না ছুটে সৌহার্দের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর জন্য দরকার ধৈর্য, সহনশীলতা। শেষ করি জালালউদ্দিন রুমীকে উদ্ধৃত করে : ‘ধৈর্য মানে শুধু বসে বসে অপেক্ষা করা নয়, ধৈর্য মানে ভবিষ্যৎকে দেখতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকিয়ে গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দিনের আলোকে দেখা।’

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়