কানেক্টিভিটি ও আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য : খুলে যাবে সম্ভাবনার অনেক দুয়ার

আগের সংবাদ

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ নীতিমালার বাস্তবায়ন জরুরি

পরের সংবাদ

দেশপ্রেমের পরীক্ষা ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৫, ২০২২ , ১:১২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ১৫, ২০২২ , ১:১২ পূর্বাহ্ণ

মানবসভ্যতার ইতিহাস কোনোকালে কোথাও সহজ-সরল রেখায় চলেনি। এখনো নয়। বরং এখন উন্নতি, অগ্রগতি যত বাড়ছে, জটিলতাও হাত ধরাধরি করে যেন চলছে। এখন পৃথিবী বদলে গেছে, যাচ্ছে, মানুষও প্রতিনিয়ত যেন এই বদলে যাওয়ার এক চরম পরীক্ষায় অবতীর্ণ হচ্ছে। তারপরও মানুষকেই উত্তীর্ণ হতে হচ্ছে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে।
করোনা সংক্রমণ ২০২০ সাল থেকে পৃথিবীকে এতটাই বদলে দিয়েছে যে মানুষও এরই সঙ্গে প্রতিযোগিতা দিয়ে বদলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ব্যক্তিমানুষ এখন স্বাস্থ্যগত সমস্যায় যেমন নতুন ঝুঁকিতে পড়েছে; সারাবিশ্বই সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সব আচরণের মুখোমুখি হয়েছে যা আগে ভাবা যায়নি। করোনাকালে অনেক বিশেষজ্ঞ বলার চেষ্টা করেছিলেন যে, করোনা-উত্তর পৃথিবীকে আগের চেহারায় নাও পাওয়া যেতে পারে। তখন এটিকে অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননি। বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত চিন্তার পাঁয়তারা বলেও অনেকে মনে করেছেন। কিন্তু করোনা ব্যাধি নির্মূল এখনো হয়নি। অনেক দেশেই করোনা এবং করোনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বহু মানুষ মৃত্যুবরণ করছেন। নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। কবে চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষকে এমন সংক্রমণ ব্যাধি ও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত করতে পারবে সেটি এখন মস্ত বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কিন্তু তার আগেই পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিক ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত হয়েছে। উন্নত দেশগুলো কখনোই ভাবতে পারেনি এই সময়ে এত বড় অর্থনৈতিক সংকট তাদেরও গ্রাস করে বসবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সব উন্নত রাষ্ট্রই এখন অর্থনৈতিক এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তেমন অবস্থায় আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার কথা শুনতে হচ্ছে। ইউএনডিপি সম্প্রতি ৫৪টি রাষ্ট্রের তালিকা করেছে যারা দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে আছে বলে আগাম সতর্কতা জানিয়েছে। এই তালিকায় বেশিরভাগই আফ্রিকা মহাদেশের। উপমহাদেশের শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে সে রকম কোনো আভাস দেয়া হয়নি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সে ধরনের পরিস্থিতিতে যাতে আমরা না পড়ি সেজন্য দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনে সবাইকে মনোযোগী হতে আহ্বান জানিয়েছে। তার এই আহ্বানকে কে কতটা গুরুতের সঙ্গে নিয়েছেন জানি না। কৃষকরা সামনে বোরো ফলাতে অবশ্যই যার যার মতো করে চেষ্টা করবেন। সরকার উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক, পানি সেচ ইত্যাদির ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য তাদের পাশে থাকবে এটি বোধহয় নিশ্চিত করেই বলা যায়। কারণ গত ১২-১৩ বছরের অভিজ্ঞতায় শেখ হাসিনার সরকার কৃষিতে ভর্তুকি দেয়ার অবস্থান থেকে একচুলও নড়েনি। এর সুফল আমরা এই সময়ে সবাই কমবেশি ভোগ করেছি। কৃষক কখনো কখনো ন্যায্যমূল্য পায়নি। মধ্যস্বত্বভোগীরা এখন ধান-চাল ব্যবসায় এমন এক সিন্ডিকেট তৈরি করে বসে আছে যে ফসল কাটার সময় হলেই তাদের দৌরাত্ম্য সর্বত্র বিস্তৃত হয়ে পড়ে। সেটি ভেঙে কৃষকরা অনেক সময় ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারে না। আবার আমরা যারা ভোক্তা তারাও ন্যায্যমূল্যে চাল বাজার থেকে কিনতে পারছি না। ধান-চালের বাজারে এখন অনেক বেশি ফন্দি-ফিকিরবাজ আর ঠকবাজের প্রবেশ ঘটেছে। এরা দেশে ধান-চালের দাম নিয়ে কৃত্রিম সংকট মাঠে এবং বাজারে সৃষ্টি করেই চলছে। তা না হলে যে ধান দেশে উৎপন্ন হয়, সরকার যে পরিমাণ ভর্তুকি প্রদান করে তা দিয়ে কৃষকরা যৌক্তিক মুনাফা রেখে বাজারে ধান বিক্রি করলেও ভোক্তারা চালের বাজারে গিয়ে এতটা নাকাল হতো না বলে আমাদের সাধারণ হিসাব। দেশে করপোরেট হাউসও ধান ক্রয়ে একচেটিয়া কারবারি হওয়ার আলামত পাওয়া গেছে। একচেটিয়া পোল্ট্রি ফার্মের করপোরেট হাউসরা যেমন প্রান্তিক পর্যায়ের ছোট-মাঝারি উৎপাদনকারীদের তাদের বশ্যতায় নিয়ে এসেছে, তাদের উৎখাত করার ব্যবস্থা করেছে। ধান-চালের ব্যবসাতেও করপোরেট হাউস এবং বড় বড় চাতাল মালিক, মধ্যস্বত্বভোগী ধান-চাল মজুত করে দেশে খাদ্য সংকট সৃষ্টির একটি অবস্থা তৈরি করে রেখেছে। আর এতে হাওয়া দিচ্ছেন আমাদের কতিপয় রাজনৈতিক দলের নেতা, যারা কল্পিত দুর্ভিক্ষের রেকর্ড প্রতিদিন বাজিয়েই চলছেন। সাধারণ মানুষ কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছেন না যে ধান কিংবা চালের অভাব কোথায়? কৃষকের গোলায় এখনো ধান আছে, আড়তে নানা জাতের চালের অভাব নেই। এরই মধ্যে উত্তরবঙ্গে সুপার-ডুপার-বাম্পার ফলন হয়েছে বলে কৃষকরাই গণমাধ্যমের সম্মুখে বলছেন। আমনের এই ফলনের ফলে আগামী কয়েক মাস আমাদের বাজারে খাদ্য সংকটের কোনো সম্ভাবনা আছে বলে কৃষকরাই মনে করছেন না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরি-বোরো ধান লাগানোর কাজে কৃষকরা নেমে পড়বেন। তখনই সরকারের সাহায্যের হাত প্রশস্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী এবং কৃষিমন্ত্রী আগেই সরকারের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে রেখেছেন। সুতরাং আগামী বোরো ধানটি সর্বত্র গুরুত্বের সঙ্গে ফলানো হলে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার কোনো কারণ সাধারণ মানুষও দেখেন বলে মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে দুর্ভিক্ষ হবেই হবে বলে প্রতিদিন আতঙ্ক ছড়ানোর মিশনটি যারা রাজনীতির ময়দানে বাস্তবায়ন করে চলছেন তারা কি আমাদের সত্যিই একটি দুর্ভিক্ষে পড়তে দেখতে চান? আমাদের ধারণা বাংলাদেশ কোনো হিসেবেই দুর্ভিক্ষের কবলে পড়বে না। তবে বাজারে এতসব ধান্দাবাজ, লুটার, ফুটার আড়তদার, মজুতদার ধান-চালে অতি ব্যবসা ও অতিমুনাফা করার খেলায় নেমেছেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাজারে ধান-চালের মূল্য সহনীয় পর্যায় নিয়ে আসা সম্ভব। বাজারে আরো কিছু পণ্য নিয়ে কৃত্রিম সংকট চলছে। সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে চিনি। চিনির সংকট গত কয়েক দিনে যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে- তা দ্রুত সামাল দেয়া দরকার হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে ভারত থেকে দ্রুত চিনি আমদানির মাধ্যমে বাজার সহনীয় অবস্থায় আনা দরকার। লোডশেডিং এখন অনেকটাই কমে গেছে। বাজারে শাকসবজিও আসতে শুরু করেছে। সেখানেও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে রয়ে গেছে। সরকার টিসিবির মাধ্যমে প্রান্তিক, নিম্ন আয় ও সীমিত আয়ের মানুষদের আরো কিছু নিত্যপণ্য ক্রয়ের সুযোগ করে দিতে পারলে বিরাট জনগোষ্ঠী বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে না। সরকারের সম্মুখে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আমদানি ও রপ্তানিকে স্বাভাবিক রাখার জন্য ডলারের চাহিদা ও সরবরাহে সামঞ্জস্য বিধান করা। বিশেষত রেমিট্যান্স প্রবাহটি এখন অনেকটাই সরকারের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। দেশে অসাধু হুন্ডি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এর বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছেন। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ দ্রুত কীভাবে গ্রাহকদের হাতে পৌঁছানো যায় এবং সন্তুষ্টি বিধান করা যায় সেই প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করা গেলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার প্রবণতা ধরে রাখতে পারবে। এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ করার সুযোগ নেই। আমাদের ধারণা বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রবাসী মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে হাত দেবে। কৃষি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় নিবিড়ভাবে দেশের কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করবে- এটিই সবার প্রত্যাশা।
বৈশ্বিক এবং দেশীয় এই টালমাটাল অবস্থায় বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, গ্রামীণ অর্থনীতি, ব্যাংক, বিমা ইত্যাদিকে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীতি ও কৌশলগত পরিকল্পনা প্রদানের মাধ্যমে অগ্রসর হতেই হবে। এ ধরনের চ্যালেঞ্জে এখন অনেক দেশই পড়েছে। যাদের বিপুল সম্পদ আছে তাদের পক্ষে কাটিয়ে ওঠা হয়তো তেমন কঠিন হবে না, হচ্ছেও না। কিন্তু আমাদের বিপুল জনস্ফীতি দেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সমস্যাকে সংকটে রূপান্তরিত হতে না দেয়াই হলো বড় চ্যালেঞ্জের কাজ। সেক্ষেত্রে অংশীজনদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত অর্থনীতির সঙ্গে যত অংশীজন জড়িত আছেন। তাদের এই মুহূর্তে নিজেদের টিকে থাকার সঙ্গে সঙ্গে দেশের জনগণের টিকে থাকাকেও একীভূত করে দেখতে হবে। এখানে দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতার দৃষ্টিভঙ্গি থাকা বাঞ্ছনীয়। এ কাজটি যাতে সুসমন্বিত হয় তার দেখভাল পুরোপুরি সরকারকেই করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একা সবকিছু করবেন বা করে দেবেন এমন অবাস্তব ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়। সব মন্ত্রণালয়কেই যার যার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন যেমন করতে হবে, অংশীজনদের বৈধভাবে ভূমিকা রাখার ব্যবস্থাও তেমনিভাবে তাদেরই করতে হবে। কেউ যেন এই মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আবার রাষ্ট্র ও জনগণকে ক্ষতির মুখেও ফেলে না দেয়। সেই কাজটি সার্বক্ষণিক দেশপ্রেমের পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে সবাইকে নিতে হবে। দেশের চলমান যেসব সমস্যা এখন বৈশ্বিক কারণে ঘনীভূত হচ্ছে সেগুলোকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে দেশপ্রেম, নিয়ম, নীতি ও ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। সমাজ ও রাজনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য নানা গোষ্ঠী মাঠে তৎপর হয়ে উঠেছে। রাজনীতিতে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আর শক্তি প্রদর্শনে হুঙ্কার ছড়ানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার, মিথ্যাচার এবং আতঙ্কও ছড়ানো, এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতেও অনেকেই এই সময়ে যেভাবে মানুষকে সচেতন করার দায়িত্ব নেয়া আবশ্যক সেই অবস্থানটি গ্রহণ করতে পারছে না। সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীর মধ্যে এখনো যে ধরনের সংযম, দায়িত্ববোধ এবং জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করার জন্য দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা আহ্বান জানিয়ে থাকেন তার যথাযথ প্রতিফলন খুব বেশি ঘটতে দেখা যাচ্ছে না। কেন আওয়ামী লীগের একটি অংশ জাতির এই ক্রান্তিকালে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জনগণের পাশে দাঁড়াচ্ছে না, নানা রকম বিভাজন, গ্রুপিং এবং বলয় সৃষ্টি করে দলকে ইতিহাসের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করার জন্য সহযোগিতা করছে না, সেটি ভেবে দেখার বিষয়। আওয়ামী লীগ তো জন্মলগ্ন থেকে দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এসেছে। সামনের পরীক্ষায় যারা পিছিয়ে থাকবে তাদের রাজনীতি ও দেশপ্রেম মানুষের কাছে এবং দলের কাছেও আশা করি গ্রহণযোগ্য হবে না।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়