যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

আগের সংবাদ

জিন্নাহর দুর্ভাগ্য : নিজেই ষড়যন্ত্রের শিকার

পরের সংবাদ

ইসিতে নাকফুল-মুশকিল মশকরা

মোস্তফা কামাল

সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২২ , ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ৫, ২০২২ , ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

আচানক নামের বেশ কিছু রাজনৈতিক দলকে আগেও নিবন্ধন দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন-ইসি। সেই ধারাবাহিকতায় এবারো নিবন্ধন বা ফিটনেস সনদ চায় মুশকিল লীগ, নাকফুল পার্টি, গরিব পার্টি, বেকার সমাজ টাইপের শখানেক দল। তারা সামনের নির্বাচনে লড়তে চায়। তাদের ঘর-দুয়ারের ঠিক-ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে গলদঘর্ম অবস্থা নির্বাচন কমিশনের। তাদের নিয়ে এখন আচ্ছা রকমের বাড়তি মুসিবতে ভুগছেন ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তথ্য তালাশ করতে গিয়ে তারা এসব দলের কোনোটির নেতা খুঁজে পাননি। কোনোটির অফিসের ঠিকানাই গায়েবি। কোনোটি পাওয়া গেছে মুরগির খামারে, মেস বাড়িতে বা আবাসিক হোটেলে। মুদি দোকান, গোডাউন, গ্যারেজ, আশ্রম, পীরের আস্তানায়ও পার্টি অফিসের ঠিকানা রয়েছে। আবার একই ঠিকানায় কয়েকটি পার্টি অফিস। এসব দলের কয়েকটির নাম বেশ বাহারি, উপভোগ্য। কোনো কোনোটি মশকরার মতো। ইসিতে এবার নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা দলের সংখ্যা ৯৮টি। এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বিদেশ প্রত্যাগত প্রবাসী, ননপ্রবাসী কল্যাণ দল, বাংলাদেশ সৎ সংগ্রামী ভোটার পার্টি, ফরওয়ার্ড পার্টি, জাতীয় লীগ, সর্বজনীন দল, গজো, স্বদেশ কল্যাণ কর্মসূচি, বেকার সমাজ-বাবেস, নৈতিক সমাজ তো আছেই। বাংলাদেশ হিন্দু লীগ, আমজনতা পার্টি, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি, জনমত পার্টি, বাংলাদেশ গরীব পার্টি, জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ গ্রীন পার্টি, ন্যাশনাল গ্রীন পার্টি, সর্বজনীন দল, বঙ্গবন্ধু দুস্থ ও প্রতিবন্ধী উন্নয়ন পরিষদও বাদ পড়েনি। বাংলাদেশ ইত্যাদি পার্টি নামে পর্যন্ত দল রয়েছে এ তালিকায়। তাহলে বাংলাদেশ তৃণমূল লীগ থাকতে সমস্যা কী? প্রশ্নটি আসলে এত সরল নয়। বলা হয়ে থাকে, নামে কিছু আসে যায় না। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন বা কুচকুচে কালো কারো নাম সাদা মিয়া রাখলে কারো বাধা দেয়া মানায় না। মানুষের ক্ষেত্রে নামকরণের এমন স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের নাম নিয়ে এ ধরনের মশকরা মানায় না। সেই বোধ আগে আসতে হবে রাজনীতিকদের মধ্যে।
এদের বেশিরভাগেরই ঠিকানা দেয়া হয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশে। রাজধানীর বাইরেও আছে কয়েকটির ঠিকানা। আজগুবি ধরনের নাম ‘বৈরাবৈরী পার্টি’ নামের একটি দলও রয়েছে। আবেদনে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার আজগানা ইউনিয়নের কুঁড়িপাড়া গ্রামে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় উল্লেখ করা হলেও ওই গ্রামের কেউ জীবনে এ দলের বা এ ধরনের অন্য কোনো নামও শোনেননি। নামে কি-ই বা যায় আসে- এ মানসিকতা দলগুলোর নেতাদের কারো কারো। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের তামাশার সাহস পেল কোথায় এরা? কে বা কারা আছে এদের পেছনে?
আচানক-আজগুবি ধরনের এতগুলো দলের একসঙ্গে নিবন্ধনের আবেদন মানেই নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে হাস্যকর ও প্রশ্নবিদ্ধ করা।
চলতি বছরের গত ২৬ মে দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন। ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ছিল আবেদনের শেষ সময়। শেষ দিনে ৮০টি দল আবেদন জমা দিলেও পরের দিন পর্যন্ত তা গড়ায় ৯৯ পর্যন্ত। এর আগে সর্বশেষ দল নিবন্ধনের জন্য ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল ইসি। তখন নিবন্ধনের আবেদন করেছিল ৭৬টি দল। কে এম নুরুল হুদা কমিশন ওই সময়ে কাউকেই নিবন্ধন দেয়নি। তবে তাদের মধ্যে আদালতের আদেশে নিবন্ধন পায় জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেস। এর পাঁচ বছর আগে ২০১৩ সালে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করলে ৪৩টি দল আবেদন করে। কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ কমিশন সে সময় বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ও সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট নামে দুটি দলকে নিবন্ধন দেয়। নিবন্ধনের পর এসব দলও অনেকটা হাওয়া হয়ে গেছে।
কারো মদত বা উসকানি ছাড়া এমনি এমনি এরা গজিয়ে গেছে মনে করা যায় না। রাজনীতি বা রাজনৈতিক দলকে হাস্যকর করার মতলবে কেউ ঘুরছে কি না, রাজনীতিকদেরই আগে তা পরখ করে দেখার বিষয়। রাজনীতিকে খেলাতে পরিণত করা। এর জন্য প্রধানত দায়ী আমাদের রাজনীতিবিদরা। দল গঠন, ইসির নিবন্ধন যা-তা বিষয় নয়। এখানে নির্বাচন, গণরায় তথা রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় সম্পৃক্ত। রাজনীতিকরা অতীতে ইসির এ ধরনের নামসর্বস্ব দলকে নিবন্ধন দেয়া, সেসব দল থেকে কারো কারো এমপি হয়ে আসার সমালোচনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে দায় রয়েছে এদের নিবন্ধন দেয়া না দেয়ার কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনেরও। অতীতে ইসি এ রকম কিছু নামসর্বস্ব দলকে নিবন্ধন দিয়েছে বলে অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছে বা এবারো দিতে হবে বলে মনে করা মোটেই যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নীতিমালা ২০০৮-এ উল্লেখ করা হয়েছে, নিবন্ধনের জন্য একটি দলের কার্যকরী কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকতে হবে, কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় অফিস এবং অন্তত ১০০ উপজেলা বা মেট্রোপলিটন থানায় অফিস থাকতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় দলের সদস্য হিসেবে কমপক্ষে ২০০ ভোটার থাকতে হবে। নিবন্ধন প্রার্থী কয়টি দলের তা আছে? ইসি তা যথাযথভাবে পরখ করলে আর কিছুই লাগে না।
ইসি সে ধরনের উদ্যোগ নিলে মুরগির খামারে, মেস বাড়িতে, আবাসিক হোটেলে, মুদি দোকান বা গোডাউন, গ্যারেজে ঠিকানা দেয়া এই গোষ্ঠীটি এমনিতেই গায়েব হয়ে যাবে। বড়জোর বলতে পারবে অতীতেও এ ধরনের অনেকে ইসি থেকে নিবন্ধন পেয়েছে। তাই এবারের ইলেকশন জার্নিতে ইসি চাইলে অতীতে নিবন্ধন পাওয়া এ ধরনের আচানক পার্টিগুলোর নিবন্ধন বাতিল করে দিতে পারে। এ নিয়ে আইনি সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
রাজনীতিক এবং নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই এ তামাশার জের আমলে নিতে হবে। এমন নয় যে, এটি মৌসুমি যন্ত্রণা। এ যন্ত্রণা ও আপদ সইতে হয় অনেক দিন ধরে। নিবন্ধন পেয়ে এরা কেবল জনগণের নয়, পাথরের মতো চেপে বসে রাজনীতির ওপরও। রাজনীতিতে বহুদিন ধরেই একটি কৌতুক চালু আছে; এখানে দুজন মানুষ একসঙ্গে হতে পারলেই একজন সভাপতি আরেকজন সাধারণ সম্পাদক হয়ে একটি দল ঘোষণা করে দিতে পারেন। কিছুদিন বাদেই পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে দুটি স্বতন্ত্র দলও বানিয়ে ফেলতে পারেন। আবার এ দুটি দল মিলে একটি রাজনৈতিক জোটও গঠন করতে পারেন। রাজনৈতিক দলের এমন বাম্পার ফলন রাজনীতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়। আর এ নিয়ে কৌতুক বা মশকরার পাশাপাশি রাজনীতিরও সর্বনাশও কম হচ্ছে না।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সংস্কৃতির আগমন বহুল আলোচিত ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের ফসল। ওই সরকারের পর থেকে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে ইসি নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয়। তখনকার সরকারঘনিষ্ঠ অনেক লোক রাতারাতি দল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়, সংবাদমাধ্যম যেগুলোকে ‘কিংস পার্টি’ নাম দিয়েছিল। ওইসব দল কি এখন আছে? তারা কিন্তু নিবন্ধিতই ছিল। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন বর্তমান শাসকদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি অনেক আগেভাগে ঘোষণা দিয়ে বর্জন করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন ইসি তিনটি দলকে নিবন্ধন দেয়, যারা একেবারে অজ্ঞাতকুলশীল হলেও ওই ঝঞ্ঝামুখর নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়াতে সহযোগিতা করেছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে যে তিনটি দল নিবন্ধন পেয়েছিল তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট বা বিএনএফের কথা মনে আছে কি? দলটির নেতা আবুল কালাম আজাদ ওই নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন, যদিও নির্বাচনের সময় দলটির সমর্থক দূরে থাক, কোনো নেতাকর্মীকেও কেউ দেখেনি। ওরা এখন কোথায় তাও জানে না।
রাজনীতিকদেরই বেশি করে ভাবতে হবে সেই ইতিহাস। তারা এসব মুশকিল-নাকফুল মশকরা দমাবেন না আশকারা দিতে থাকবেন?

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়