প্রথম দিনের বিতর্কে উৎরে গেলেন সুনাক

আগের সংবাদ

টসে হেরে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ

পরের সংবাদ

মিথ্যা তথ্যে মোড়ানো দানবীয় ই-সিগারেট

মরণফাঁদে জড়াচ্ছে তরুণরা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২২ , ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৭, ২০২২ , ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ

টিএসসি চত্বরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন তরুণ। তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। তাদের কয়েকজনের হাতে দেখা গেল ই-সিগারেট। কথার ফাঁকে ফাঁকেই তা ঠোঁটে চেপে পাফ নিয়ে মুখ থেকে ধোঁয়া ছাড়ছিলেন। কে কেমনভাবে ধোঁয়া ছাড়তে পারেন তা নিয়ে খুনসুটিও হচ্ছিল। তরুণদের কয়েকজন জানালেন, ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তারা জানেন। তাই তারা ধূমপান করেন না। তবে ই-সিগারেট ‘নিরাপদ’। তাছাড়া ই-সিগারেটে একটা স্মার্টনেস আছে।

সম্প্রতি ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের (সিটিএফকে) কারিগরি সহায়তায় ঢাকা শহরের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ-তরুণীদের অনেকে স্টাইলের কারণে ই-সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে। ই-সিগারেট প্রচলিত সিগারেট ছাড়তে সাহায্য করবে কিংবা এটি প্রচলিত সিগারেটের তুলনায় কম ক্ষতিকর বলেও মনে করছেন অনেকে। প্রথমে ই-সিগারেট সেবনের সময়, বেশিরভাগই এতে নিকোটিন আছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন না। একশন অন স্মোকিং এন্ড হেলথ (এএসএইচ) এর সা¤প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২০ সালে ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে ভ্যাপিংয়ের হার ছিল ৪ শতাংশ। ২০২২ সালে এ হার দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

লিথিয়াম ব্যাটারির মাধ্যমে কার্টিজে থাকা নিকোটিন, স্বাদ ও গন্ধমিশ্রিত ই-লিকুইড ও প্রপিলিন গøাইকল নামক রাসায়নিক পুড়িয়ে মস্তিষ্কে ধূমপানের মতো অনুভূতি তৈরি করে ই-সিগারেট। এই পণ্যটি নিয়ে ২০১৪ সালেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করেছিল। সংস্থাটি তখন বলেছিল, ই-সিগারেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে তাদের পণ্যের বিক্রির ব্যাপারে প্রচারণা চালাতে না পারে। কারণ এই সিগারেট থেকে যে ধোঁয়া বের হয় অধূমপায়ীদের স্বাস্থ্যের ওপর সেটা কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা এখনো পরিষ্কার নয়। অনেক দেশ বা এলাকায় এটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ডব্লিউএইচও রিপোর্ট অন গেøাবাল টোব্যাকো এপিডেমিক-২০২১ প্রতিবেদনে ই-সিগারেটসহ সব ধরনের ইমার্জিং টোব্যাকো পণ্যকে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো আসক্তিসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া ই-সিগারেট ব্যবহারে আরো বড় ক্ষতির দিকও রয়েছে। ই-সিগারেট ব্যবহারের সময় তা বিস্ফোরণে মারাত্মক জখমেরঘটনাও আছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যে এমন ঘটনা ঘটেছে। গেøাবাল সেন্টার ফর গুড গভর্নেন্স ইন টোব্যাকো কন্ট্রোল (জিজিটিসি) তথ্য অনুসারে পৃথিবীর ৪১টি দেশ ই-সিগারেট বিক্রি ও বিতরণ নিষিদ্ধ করেছে।

বাংলাদেশে ই-সিগারেট ও এর বিভিন্ন উপাদান উৎপাদিত হয় না। কিন্তু আইনে নিষিদ্ধ না হওয়ায় দেশে ই-সিগারেট আমদানি ও বিপণন নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ না হওয়ায় এর মান নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারিতেও সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এই সুযোগে দোকান ছাড়াও অনলাইনের বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটের মাধ্যমে ই-সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতা টানতে ছাড়, ক্যাশব্যাক অফারসহ বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য দিয়ে ই-সিগারেট অনলাইনে বিক্রি ও প্রদর্শিত হচ্ছে। বয়সের বাধ্যবাধকতা না থাকায় যে কোনো বয়সের মানুষই অনলাইন থেকে ই-সিগারেট কিনতে পারছেন।

তবে ২০০৫ সালের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনের (২০১৩ সালে সংশোধন) খসড়া সংশোধনীতে ই-সিগারেট ও ভ্যাপিংয়ের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে সব ধরনের ইলেক্ট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম, এর যন্ত্রাংশ বা অংশবিশেষ (ই-সিগারেট, ভ্যাপ, ভ্যাপিং, ভ্যাপার ইত্যাদি) হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস, হিট নট বার্ন এবং ওরাল নিকোটিন পাউচ যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, এগুলোর উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিজ্ঞাপন, প্রচার-প্রচারণা, প্রণোদনা, পৃষ্ঠপোষকতা, বিপণন, বিতরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন নিষিদ্ধের প্রস্তাব করা হয়েছে। কেউ এই ধারা লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব ৬ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। পাশাপাশি, যে কোনো ব্যক্তির জন্য এসব পণ্যের ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এই বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চের দিকে ই-সিগারেটের আমদানি, উৎপাদন, বিক্রি, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধের জন্য চিঠি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ করেন বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফোরাম ফর হেলথ এন্ড ওয়েলবিংয়ের উপদেষ্টা ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক এবং চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাতসহ ১৫৩ জন সংসদ সদস্য।

অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, ই-সিগারেট দানবীয় হওয়ার আগেই নিষিদ্ধ করা জরুরি। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সবাই যখন এক হয়ে কাজ করছে, তখন ই-সিগারেট ও ভ্যাপিংয়ের মতো নতুন পণ্যের বাড়বাড়ন্ত খুবই হতাশাজনক। বিড়ি ও সিগারেটের পাশাপাশি ই-সিগারেট ও ভ্যাপিংয়ের হুমকি শুধু আমাদের লক্ষ্য অর্জনকেই দীর্ঘায়িত করবে না, নতুন প্রজন্মকেও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে ফেলবে।

ই-সিগারেটের ক্ষতিকর দিক প্রসঙ্গে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, সিগারেটের চেয়ে ই-সিগারেটে নিকোটিন বেশি পরিমাণে বের হয়। এতে আসক্তি বাড়ে। এছাড়া বাজারে সস্তায় যেসব ভ্যাপ জুস পাওয়া যায় সেগুলোতে কী উপাদান থাকে, তা অজানা। নিকোটিন ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক।

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটির সদস্য এবং সিটিএফকে বাংলাদেশ-এর লিড পলিসি এডভাইজার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আসলে ই-সিগারেট এমন মানুষদেরও ধূমপানে উদ্বুদ্ধ করছে, যারা হয়তো কখনো ধূমপান করা সম্পর্কে ভাবতও না। এই সিগারেটে যেমন আকারের ক্ষেত্রে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বিকল্প, তেমনি ফ্লেভারের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা থাকায় মানুষ আকৃষ্ট হয়। তবে ই-সিগারেট সবদিক দিয়েই ক্ষতিকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সিগারেট ছেড়ে দেয়ার উপায় হিসেবে ই-সিগারেটকে স্বীকৃতি দেয়নি। পৃথিবীর আরো অনেক দেশেও ই-সিগারেট ক্ষতিকর বলেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের দেশেও ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়