উপকূল বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং

আগের সংবাদ

প্রথম দিনের বিতর্কে উৎরে গেলেন সুনাক

পরের সংবাদ

ছোট ঝড়ে বড় ক্ষতি

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২২ , ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৭, ২০২২ , ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ

ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ যতটা প্রলয়ংকরী হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, ততটা হয়নি। বাতাসের গতি ও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতার হিসেবে এটাকে সাধারণ ঘূর্ণিঝড়ের কাতারেই ফেলা যায়। তবে মানুষের ভোগান্তি ও সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় অনেক বড় ঘূর্ণিঝড়কেও পেছনে ফেলেছে সিত্রাং। বিশেষ করে, চরম খাদ্য ঘাটতির এই সময়ে আমনের ব্যাপক ক্ষতি করেছে এই ঝড়টি। যার ভোগান্তি পোহাবে দেশের প্রতিটি মানুষ। এছাড়া শীতকালীন সবজিসহ অন্যান্য ফসলেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। উপড়ে পড়েছে ছোটবড় অসংখ্য গাছ। স্থানীয় প্রশাসন এখনো ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিররণ সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে চালাচ্ছে ত্রাণ তৎপরতাও। আমাদের প্রতিনিধি এইচ এম নাহিদ (ভোলা), মিজানুর রহমান (পটুয়াখালী), বাবুল আকতার (খুলনা), মিজানুর রহমান আকন (বাগেরহাট), সৈয়দুল কাদের (কক্সবাজার), মোহাম্মদ সোহেল (নোয়াখালী), অমল তালুকদার (পাথরঘাটা, বরগুনা) ও চট্টগ্রাম অফিসের পাঠানো খবর।

চট্টগ্রামের ৫৭৬০ ঘরবাড়ি বিধস্ত: ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে ঝড়ো হাওয়া এবং জলোচ্ছ¡াসে চট্টগ্রাম নগর এবং উপকূলীয় উপজেলার ৬৬টি ইউনিয়নের ৫ হাজার ৭৬০টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯৬টি সম্পূর্ণ বিলীন হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেড়িবাঁধ। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে লোকালয় এবং ফসলি জমি, লবণ মাঠ ও মাছের ঘের। সব মিলিয়ে দুর্গত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৫৯ হাজারের মতো। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

এদিকে চট্টগ্রামে রোপা আমন ও শীতকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৫টি উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৪৮২ হেক্টর জমির আমন ফসল বাতাসে হেলে পড়েছে। একই সঙ্গে ৩৬৪ হেক্টর জমির শীতকালীন সবজি ক্ষতি হয়েছে। এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন জেলার কৃষকেরা।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৮০০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ২১ টন চাল এবং ৩ লাখ ৮০ হাজার নগদ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া আজ পতেঙ্গায় জেলেপল্লিতে ২ টন চাল এবং ভিজিএফ কার্ডের চাল বিতরণ করা হবে।

নোয়াখালীর ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট: ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে জেলার হাতিয়া, সুবর্ণচর, সদর, কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলায় গাছপালা ভেঙে পড়ে এবং ঝড়-বাতাসে সহস্রাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি ও মৎস্য খামার। নষ্ট হয়ে গেছে ১০ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান ও রবিশস্য।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সেলিম হোসেন জানান, উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, চানন্দী, হরণী, নলচিরা, সুখচর ও চরঈশ্বর ইউনিয়নে ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’য়ের প্রভাবে ৪৪০টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া এখানে দুর্গত মানুষের সংখ্যা ২ লক্ষ ৪৫ হাজার জন। উপজেলার নিঝুমদ্বীপসহ কয়েকটি ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে বেড়িবাঁধ ও বিদ্যুতের খুঁটি।

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৈতী সর্ববিদ্যা জানান, উপজেলার মোহাম্মদপুর, চরক্লার্ক, পূর্ব চরবাটা, চরবাটা, চরজুবলী, চরজব্বর ইউনিয়নে ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’য়ের প্রভাবে ১৭৭টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আংশিক বিধ্বস্ত ঘরের সংখ্যা ১২৩টি এবং সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ঘরের সংখ্যা ৫৪টি।

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, উপজেলার দাদপুর, নোয়াখালী ইউনিয়ন, ধর্মপুর, আন্ডারচর, কালাদরাপ, চরমটুয়া, পূর্ব চরমটুয়া ইউনিয়নে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। আমন ধান ও রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এদিকে জেলার কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলায়ও দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলা ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসলের (আমন ও রবিশস্য) ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ এর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।

ভোলা: প্রাথমিক হিসেবে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার অন্তত ৩ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির আমন হেলে পড়েছে। ১৫০ হেক্টর সবজি ক্ষেত, ৬০ হেক্টর কলাবাগান, ৭০ হেক্টর পেপে বাগান, ৩ হেক্টর পানবরজসহ মোট ৩ হাজার ৩২৫ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে।

এদিকে মৎস্য সেক্টরেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, টাকার অঙ্কে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ না করলেও প্রায় ৬ হাজার ২৮০টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। অন্যদিকে জেলায় প্রায় ৮ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. তৌফিক-ই-লাহী চৌধুরী জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের পাশাপাশি ত্রাণ সহায়তার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

খুলনা: উপকূলীয় অঞ্চলের কয়রা উপজেলার ৬টি বেড়িবাঁধ ও ১ হেক্টর কৃষি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা এলাকায় ৯৯৪টি বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকার সাধারণ মানুষ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় মঙ্গলবার বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কার করেছে।

খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রনজিৎ কুমার সরকার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ৩ উপজেলার মধ্যে কয়রার ৬টি ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কয়রা উপজেলার হরিণ খোলায় ৭০ মিটার, সাখবাড়িয়ায় ৩ হাজার মিটার ও গাতিরঘেড়ীর ১০০ মিটার বেড়িবাঁধ এবং সুতির বাজার এলাকায় এলজিইডির ৩০০ মিটার রাস্তা ভেঙে যায়। কয়রা এলাকার ২৫০টি বাড়ি বিধ্বস্ত ও ১ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

এদিকে দুদিন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পর গতকাল সকাল থেকে খুলনা অঞ্চলের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। উপকূলীয় এলাকায় ৪০৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরেছেন।

ভেসে গেছে বাগেরহাটের ৭৫০টি মৎস্য ঘের: ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’য়ের তাণ্ডবে বাগেরহাটে ২ হাজার ১৪০টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ১৩৭৫ হেক্টর আমনসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে ৭৫০টি মৎস্য ঘের ও ২৫০টি পুকুরের মাছ। এছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে উপড়ে পড়েছে বিপুল পরিমাণ গাছ। গতকাল বুধবার বিকাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে জেলার কিছু কিছু এলাকা। এছাড়া ৭ কিমি. বেড়িবাঁধ, ১৫০ কিমি. পাকা রাস্তা, ৩০৩ কিমি. কাঁচা রাস্তাসহ ২৭টি এপ্রোচ রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাগেরহাটের অধিকাংশ এলাকাই পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন। ওই সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবু উমাম মো. মাহবুবুল হক জানান, ‘সিত্রাং’য়ে অন্তত ৭৩টি খুঁটি ভেঙে গেছে, হেলে পড়েছে ১৬৬টি খুঁটি। ফলে জেলার অনেক এলাকা এখনো বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

৩ দিন ধরে বিদ্যুৎবিহীন পাথরঘাটা: টানা ৩ দিন ধরে বিদ্যুৎবিহীন দুর্যোগকবলিত পাথরঘাটাসহ দক্ষিণের জনজীবন। এর মধ্যে গতকাল বুধবার বিকালে দুতিনবার চোর-পুলিশ খেলার মতো বিদ্যুতের ভেলকিবাজি দেখা গেলেও পরে আর খবর নেই। পাথরঘাটা পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিস সূত্রে বলা হচ্ছে, মঠবাড়িয়া-পাথরঘাটা বিদ্যুৎ লাইনের কোথায় ফল্ট রয়েছে তা এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ভেসে গেছে কক্সবাজারের ২ শতাধিক ঘেরের চিংড়ি : ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’য়ের প্রভাবে কক্সবাজারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তন্মধ্যে ২ শতাধিক চিংড়ি প্রজেক্টের মাছ জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া বেড়িবাঁধ ভেঙে আমন ধান, পানের বরজ, অভ্যন্তরীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ তাণ্ডবে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে রকমারি সবজি ক্ষেত ও চিংড়ি জোনের শতাধিক ঘেরের ক্ষতিসাধন হয়েছে। একইভাবে সামুদ্রিক জলোচ্ছ¡াসের পানি বেড়ে গিয়ে চিংড়ি জোন প্লাবিত হওয়ায় ভেসে গেছে লাখ লাখ টাকার মাছ। এছাড়া উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপ, ঘটিভাঙ্গা ও হোয়ানক ইউনিয়নে অন্তত ৬০টি চিংড়ি প্রকল্প তলিয়ে গেছে।

পটুয়াখালী: ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’য়ের প্রভাবে দুই শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও শতাধিক ঘের-পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ১ হাজার ৫৫০ হেক্টরের আমন এবং ৩০০ হেক্টরের শাকসবজির ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম আজহারুল ইসলাম বলেন, আমরা যতটা আশঙ্কা করেছিলাম, সে তুলনায় কিছুই হয়নি। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার ‘জো’র মতো জোয়ারের পানি হয়েছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়