শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে পাঠ প্রতিযোগিতা

আগের সংবাদ

রাষ্ট্রের মুখচ্ছবি

পরের সংবাদ

অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা রিভার ট্যুরিজম

রেজাউল করিম খোকন

সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৫, ২০২২ , ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৫, ২০২২ , ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

আমাদের এই বাংলাদেশের সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতিক শোভা বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের অনেক আগ্রহের বিষয়। ফলে আমাদের পর্যটন শিল্প অনেক সম্ভাবনাময়। কিন্তু প্রকৃতির উজাড় করা সৌন্দর্য ধারণ করেও পর্যটন শিল্পে ততটা অগ্রগতি হয়নি। এই শিল্পের যতটা এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল সেটা হয়নি। আবার যেভাবে এর বাজার তৈরির সুযোগ ছিল তাও হয়নি। অথচ এই একটি খাতই আমাদের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে। তবে আশার কথা, গত এক দশকে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে ভিন্নমাত্রা যুক্ত হয়েছে। দিনে দিনে প্রসার লাভ করছে সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প। পর্যটন এমন একটি শিল্প, যার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। কর্মসংস্থান হলে বেকারত্ব ঘুচে যায়, মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ে। আয় বাড়ার কারণে ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতির সঞ্চার হয়। অন্য যে কোনো শিল্পের তুলনায় পর্যটন শিল্প জিডিপিতে অনেক বেশি অবদান রাখতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশ পর্যটন শিল্পের ওপর ভর করে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশ রিভার ট্যুরিজম অর্থাৎ নৌ-পর্যটনের দারুণ সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র। নদী বিধৌত বাংলাদেশের ভূখণ্ডজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য নদ, নদী, খাল-বিল, হ্রদ, হাওর-বাঁওড়, পুকুর-দীঘি আর জলাশয়। কোনো এক সময়ে এদেশে ১ হাজার ৩৬০টি ছোট বড় নদ-নদী, খাল-বিল ছিল। দিনে দিনে তা কমে বর্তমানে ৫৬০টিতে পৌঁছেছে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যুক্ত করতে খাল কেটে নদী এবং সাগরের পানি শহরের ভেতর নিয়ে আসা হয়েছে। যা শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সুগম করার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের বড় বড় শহরগুলোতে এক সময় ছোট নদ কিংবা বড় বড় খাল বা শাখা নদীর অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু ভৌগোলিক কারণেই হোক অথবা বাড়তি জনসংখ্যার চাপে সেসব নদ-নদী-খালের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়েছে। নদ-নদী, খাল, বিল, ঝিল, সব ভরাট করে শিল্প কলকারখানা, বহুতল ভবন, আবাসিক এলাকা, শপিংমল ইত্যাদি গড়ে তোলা হয়েছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক চমৎকার ঝিল, হ্রদ, ছোট নদী যেগুলো নগর জীবনে দারুণ আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে বিবেচিত হতে পারত।
পৃথিবীর অনেক দেশেই এমন নদী বিধৌত ভূখণ্ড নেই। এখনো আমাদের বাংলাদেশে যে পরিমাণ নদ-নদী, খাল-বিল-ঝিল, হাওর-বাঁওড়, হ্রদ, পুকুর, দীঘি ইত্যাদি রয়েছে সেটাও কম নয়। যার কারণে এদেশে রিভার ট্যুরিজম বা নৌ-পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। রিভার ট্যুরিজম আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে সমৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে। এটা আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভিন্নমাত্রা এনে দিতে পারে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের জন্য যা সমৃদ্ধির নতুন সোপান সৃষ্টি করবে সন্দেহ নেই। এর মাধ্যমে বিদেশি পর্যটকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে বাংলাদেশের নদী, হাওর, বিল, ঝিল এবং হ্রদ কেন্দ্রিক পর্যটন স্পটগুলো। কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, ভৈরব, খুলনা, বাগেরহাট বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালীতে নৌ-পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ এবং সম্ভাবনা রয়েছে। রিভার ট্যুরিজমের জন্য প্রয়োজন ছোট, বড়, মাঝারি আকারের নৌযানের সংখ্যাবৃদ্ধি। আরামদায়ক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত জাহাজ বা স্টিমারে চড়ে পর্যটকরা সুন্দরবন, ভোলা, হাতিয়া, কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, ভৈরব, সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনার বিভিন্ন নদীকেন্দ্রিক পর্যটন কেন্দ্রে বেড়াতে গেলে সেগুলো বেশ জমজমাট হয়ে উঠবে সন্দেহ নেই। ওই পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে নতুন জোয়ার সৃষ্টি হবে এক সময়ে ঢাকার সদরঘাট থেকে নৌপথে চট্টগ্রাম যাতায়াতের সুযোগ ছিল। আশির দশকের শেষভাগে তা বন্ধ হয়ে যায়। যে কারণে এই অঞ্চলে রেলপথ ও সড়কপথে ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। এমনিতে নৌপথে যাতায়াত খরচ কম। রিভার ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে এটাও একটি সুবিধাজনক ফ্যাক্টর হতে পারে। এখনো ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার, কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, স›দ্বীপ, হাতিয়া প্রভৃতি গন্তব্যে জাহাজ চলাচলের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা যেতে পারে। তেমন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নৌভ্রমণের জন্য কেটামেরাম ধরনের জাহাজের প্রচলন প্রয়োজন। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি ওজনে হালকা জাহাজগুলোর গতিবেগ থাকে বেশি, দুটি জাহাজের মধ্যে পাশাপাশি ঘষা লাগলেও ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর কোরিয়া প্রভৃতি দেশে এ ধরনের জাহাজ বেশি দেখা যায়। গতিবেগ বেশি হলেও আমাদের নদীপথে ঘণ্টায় ১২-১৪ নটিক্যাল মাইল বেগে চলাচল করতে পারবে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ৬০০ যাত্রীর ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি জাহাজ তৈরিতে আনুমানিক ৭০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
ঢাকা শহরকে আবেষ্টন করে নৌপথ চালুর বিষয়ে অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ওয়াটার বাস চালু করা হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। এখানেও রিভার ট্যুরিজমের বিরাট সুযোগ রয়েছে। ৪০০ বছর আগে ঢাকাকে ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডন শহরের সঙ্গে তুলনা করা হতো। লন্ডন টেমস নদীর তীরে অবস্থিত আর ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। ওই সময়ে ঢাকা নদী বিধৌত অঞ্চল ছিল। এখন সেই অবস্থা নেই আর। কিন্তু এখনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে রিভার ট্যুরিজমের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ এবং চাঁদপুর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। ১০০ বা ২০০ সিটের ওয়াটার বাস চালু করে তা দিয়ে ঢাকার আশপাশে নৌপথে ঘুরো বেড়ানোর ব্যবস্থা করা হলে মানুষ তা ভীষণভাবে উপভোগ করবে। পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন উদ্যোগগুলোতে আমাদের অনেক নদী ড্রেজিং না করার কারণে ভরাট হয়ে আছে। যে কারণে ছোট বড় সব ধরনের লঞ্চ, স্টিমার, জাহাজ চলাচলে বিঘœ ঘটে। এসব নদী ড্রেজিং করে নাব্য ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য নদী তীরবর্তী শহরের মানুষগুলো রিভার ট্যুরিজমের মাধ্যমে নিজ দেশকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ নিতে পারে।
একটি বিষয় আমাদের সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে, পর্যটন একটি শিল্প। তাই এটিকে শিল্প হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় দিক থেকে শক্তিশালী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রিভার ট্যুরিজমের নানা উদ্যোগ গ্রহণে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নৌ-পর্যটনকে বিকশিত করতে নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পর্যটন মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে সমন্বিতভাবে বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ জায়গায় এমনিতেই পর্যটনের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। এ খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়নে যুগোপযোগী পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। রিভার ট্যুরিজম বা নৌ-পর্যটনের বিকাশের মাধ্যমে আমাদের পর্যটন শিল্প দ্রুত আরো অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে পারে। সরকার যদি এ খাতের উন্নয়নে একটি জোরালো উদ্যোগ নেয় এবং কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করে তাহলে রিভার ট্যুরিজম থেকে প্রচুর উপার্জন সম্ভব। এর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগগুলোকে নানা রকম প্রণোদনা, পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। রিভার ট্যুরিজমের বিকাশ ঘটলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে অনেক পরিবারে সচ্ছলতা সমৃদ্ধি, অগ্রগতি সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

রেজাউল করিম খোকন : সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়