মণ্ডপ থেকে ফেরার পথে ছাত্রীকে ছুরিকাঘাত

আগের সংবাদ

টস হেরে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ

পরের সংবাদ

রপ্তানি-রেমিট্যান্সে বড় ধাক্কা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২২ , ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০২২ , ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ

রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রপ্তানি কমেছে, সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ৭ মাসে সর্বনিম্ন

অর্থনীতির প্রধান দুই খাত রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। ডলারের অস্থিরতার মধ্যে এ প্রধান দুটি ভরসার জায়গায় ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে। একে একে দুটি উৎস থেকে ডলার আসা কমে গেছে। এদিকে ডলারের বাজারে নৈরাজ্য ঠেকাতে নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু কোনোভাবেই বাগে আনতে পারছে না। ফলে আরো বেশি চাপে পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। হঠাৎ করে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় অর্থনীতির আকাশে কালো মেঘ দেখতে পাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের অস্থিরতা ও সঠিক তথ্য প্রকাশ না করা রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি দক্ষ কর্মী না পাঠানোর কারণে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পরও প্রবাসী আয় কমতে শুরু করেছে। রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত রপ্তানিতে এমন ঋণাত্মক অবস্থা থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

পোশাক শিল্পমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই এ আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলাম, সেপ্টেম্বর মাস থেকে প্রবৃদ্ধি কমতে থাকবে। তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে, ৩ মাস আগে থেকেই আমাদের ক্রয়াদেশ কমতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকটি বড় বড় প্রতিষ্ঠান আমাদের তৈরি করা পণ্যের ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে। তারা বলছে আগামী বছর নেবে। আবার যেসব অর্ডার করা পণ্য রপ্তানির সুযোগ ছিল, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে সেগুলোরও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বেড়েছে ব্যয়। এসব কারণে রপ্তানিতে প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, আমাদের হিসেবে আগামী নভেম্বর, ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ঋণাত্মক প্রভাব থাকবে। তবে সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল মজিদ ভোরের কাগজকে বলেন, ডলারের দাম ওঠানামা, রপ্তানির সঠিক চিত্র তুলে না ধরা এবং একক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা- রপ্তানি কমে যাওয়ার তিনটি উল্লেখযোগ্য কারণ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব মন্দার কবলে পড়ে যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত হাতে মনিটরিং করতে হবে। তিনি বলেন, দেশ থেকে অর্থপাচার ঠেকাতে হবে। ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং হচ্ছে কিনা- তা কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করছে, কিন্তু আমাদের দেশে সমন্বিতভাবে কোনো কাজ হয় না বলে তার সুফল দেখা যায় না। এছাড়া প্রয়োজনে দাতাসংস্থাগুলোর কাছ থেকে আরো সহযোগিতা বাড়াতে হবে বলে জানান এ অর্থনীতিবিদ।

রপ্তানির সবচেয়ে বড় অংশ আসে পোশাক খাত থেকে। সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আয়ে যে ধাক্কা লেগেছে, তা মূলত পোশাক রপ্তানি কমার কারণে। গত মাসে ৩১৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ কম। গত মাসে ওভেন ও নিট উভয় ধরনের পোশাক রপ্তানিই কমেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তারা পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছে। তাদের এখন খাদ্যের পেছনেই অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে। সে কারণেই রপ্তানি আয় কমছে।

জানা গেছে, বিদেশ থেকে ডলার বা অন্য বৈদেশিক মুদ্রা বেশি এলে সরকার নির্ভার থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যত বেশি ডলার আসে, রিজার্ভ তত বাড়ে। এ রিজার্ভের ডলার খরচ করে সরকার বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির দায় শোধ করে। কয়েক মাস ধরে দায় শোধে বেশি খরচ হওয়ায় ডলারের মজুতে টান পড়েছে। রিজার্ভ এসে ঠেকেছে ৩৬ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে। এ থেকে বেশি উঁচুতে আর উঠতে পারছে না। এর মধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার আয়ের বড় দুই খাত রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে ধাক্কা লেগেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) রবিবার প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৯০ কোটি ডলার, লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২০ কোটি ডলার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৯ দশমিক ৪৯ কোটি ডলার বা ৭ দশমিক ২ শতাংশ কম। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় রপ্তানি আয় ২৬ কোটি ডলারেরও বেশি কমে গেছে। অর্থাৎ ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে।

তৈরি পোশাক মালিকসহ অন্য ব্যবসায়ীরা আগেই শঙ্কা প্রকাশ করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজার থেকে ক্রয় আদেশ কমে যাবে। ফলে দেশের রপ্তানি আয়ও কমে আসবে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ ৩৯০ কোটি ৫০ লাখ (৩ দশমিক ৯০ বিলিয়ন) ৭ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৪১৬ কোটি ৫৪ লাখ ৫ ডলার। পোশাক শিল্পমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি ব্যালেন্স করার জন্য। নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। জাপান, কোরিয়ার মতো অপ্রচলিত বাজারের দিকে মনোযোগ বেশি দিচ্ছি। তবে যুদ্ধ না কমলে এ সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি। শহিদুল্লাহ আজিম আরো বলেন, বেশি সমস্যায় আছি গ্যাস সংকটের কারণে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন সঠিকভাবে হচ্ছে না। পাশাপাশি পোর্টের জটিলতা কোনোভাবেই কমাতে পারছি না।

বিজিএমইএ পরিচালক ও মুখপাত্র মহিউদ্দিন রুবেল ভোরের কাগজকে বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে যে প্রবৃদ্ধিতে মন্দা হবে, সে বিষয়ে ইতোমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিজিএমইএ। যা সেপ্টেম্বরের রপ্তানি পরিসংখ্যানে স্পষ্টতই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেন, কোভিড পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী খুচরা বাজার বিভিন্ন সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে, কন্টেইনারের অপ্রতুলতা এবং সাপ্লাই চেইন সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে পূর্বাভাষ অনুযায়ী মন্দার আবির্ভাব- যার কারণে খুচরা বিক্রয়ে ধ্বস নেমেছে, ক্রেতাদের পোশাকের চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে, প্রভৃতি সংকটে শিল্প বিপযর্স্ত। তিনি আরো বলেন, ক্রেতারা তাদের ইনভেন্টরি এবং সাপ্লাই চেইনকে নিজেদের জন্য লাভজনক রাখতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে, এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ উৎপাদন এবং অর্ডার পযর্ন্ত আটকে রেখেছে। মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, সামগ্রিকভাবে শিল্পের জন্য একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যদিও আমরা টেকসই উন্নয়ন এবং প্রতিযোগী সক্ষমতায় আমাদের শক্তি দেখিয়েছি, তারপরও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ২০২২ সালের শেষ ত্রৈমাসিকের জন্য আশাব্যাঞ্জক কিছু অনুমান করা কঠিন করে তোলে।

কমেছে প্রবাসী আয়: রবিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে ১৫৪ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এই অঙ্ক গত ৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ১৪৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ১৫৩ কোটি ৯৫ লাখ (প্রায় ১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। প্রবাসী আয়ের এ অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ কোটি ৭২ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৭২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়