ভরা মৌসুমেও ইলিশের দাম বেশি

আগের সংবাদ

তোয়াব খান : কীর্তিমান এক সাংবাদিক

পরের সংবাদ

বৈষম্য হ্রাসে টেকসই নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা

এ কে এম এ হামিদ

উন্নয়ন গবেষক ও সভাপতি, আইডিইবি

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২২ , ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০২২ , ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠন জাতিসংঘ ২০১৬ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য আরো ভালো এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণে ১৭টি অভীষ্ট ও ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা অন্তর্ভুক্ত করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রার ১১ ধারায় অন্তর্ভুক্তমূলক নিরাপদ, অভিঘাত সহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তোলা এবং ১০ ধারায় অন্ত ও আন্তঃদেশীয় অসমতা কমিয়ে আনার অঙ্গীকার রয়েছে- যেখানে জনগণ, অংশীদারিত্ব, শান্তি, অগ্রগতি ও সবুজ পৃথিবীর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। টেকসই নগর উন্নয়নে আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি, সেটি পর্যালোচনা করার সময় এসেছে। এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে- বাংলাদেশের ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৬ কোটি মানুষ নগর এলাকায় বাস করছে। যার প্রায় ৩২ ভাগ বসবাস করে রাজধানী ঢাকায়। ক্রমবর্ধমান নগর জনসংখ্যার হার বিবেচনায় আমাদের অবশ্যই নিরাপদ ও বাসযোগ্য টেকসই নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে নাগরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি নাগরিকদের সুপেয় পানি, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন ইত্যাদি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে।
‘বৈষম্য হ্রাসের অঙ্গীকার করি/টেকসই নগর গড়ি’ প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশে বিশ্ববসতি দিবস উদযাপন হচ্ছে। যেটি বঙ্গবন্ধুর শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সোনার বাংলা নির্মাণের মূল দর্শনের সমার্থক বলা যায়। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১৫ (ক)-এ অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- সংবিধানের অঙ্গীকার অনুযায়ী কতভাগ নাগরিকের জন্য ন্যূনতম নিরাপদ টেকসই বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে? ইতোমধ্যে স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশত বছর অতিক্রম হয়েছে। কাজেই এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রকেই বৈষম্যহীন টেকসই নগর উন্নয়নে পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রচলিত আবাসন বা গৃহায়ন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে দেশের সর্বত্র পরিকল্পিত গৃহায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সামগ্রিক পরিকল্পনা ও জনগণকে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে টাইপ নকশা/ডিজাইন সরবরাহ করাসহ জনগণের গৃহবিষয়ক সব নির্মাণকাজে সহায়তার জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় এক যুগ পূর্বে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করেছিলেন। অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের কাজ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকায় অবস্থান করছে। ফলে যে সুদূরপ্রসারি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সামগ্রিক কার্যক্রমের ৮০/৯০ ভাগ গ্রামবাংলায় পরিকল্পিত গ্রামায়নের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
এক সময় উন্নয়নের ধারণাগত ভাবার্থ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে উন্নয়নের ধরন ও ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবোন্নয়ন, গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা, সুশাসন, জবাবদিহিতা, দেশপ্রেম, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ইত্যাদিকেও উন্নয়নের সূচকে নিয়ে আসা হয়েছে। সমাজের সব মানুষকে উন্নয়ন পরিকল্পনার সুফলভোগী করতে না পারলে সেটি কোনোভাবেই স্থায়ী উন্নয়ন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না। এর থেকে অনায়াসে বলা যায়- প্রতিটি নগরকে নাগরিকবান্ধব নগরে পরিণত করতে হলে সে ক্ষেত্রে জননিরাপত্তার পাশাপাশি সাশ্রয়ী ও টেকসই নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিসংখ্যান বলছে- জাতীয় জিডিপির প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ নগর থেকে আসে। এর পরিমাণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে ৮০ ভাগে উন্নীত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। তবে বিপরীতে অনেক নেতিবাচক দিকও রয়েছে। পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৭০ ভাগ নগরকেন্দ্রিক সংঘটিত হয়। সরকারি হিসাবে ঢাকা শহরে ২৫ হাজার রাসায়নিক গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হাজার রাসায়নিক গুদাম আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। এসবের মাত্র ২ শতাংশ সিটি করপোরেশন থেকে অনুমতি নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ৭ বা ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। অন্যান্য নগরের ক্ষেত্রেও একই রকম ধারণা করা হচ্ছে। অথচ আধুনিক আবাসনব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের ঝুঁকির সম্ভাবনা হ্রাস পেত। একটা আদর্শ নগর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আবাসন ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সবুজায়ন, জলাধার ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। গ্রামগুলো শহরে রূপ নিলেও সেখানে অবকাঠামো নির্মাণে সমন্বিত উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। পরিকল্পনাহীন বিচ্ছিন্নভাবে নগর উন্নয়ন হচ্ছে। এটাই টেকসই নগর উন্নয়নের পথে অন্তরায়। বিকাশমান নগরগুলোতে যার যেমন খুশি তেমনিভাবেই বাড়িঘর ও অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। সরুভাবে গড়ে তোলা হয়েছে নগরগুলোর সড়ক অবকাঠামো। ফলে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটলে তা মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। খোঁড়াখুঁড়ির সংস্কৃতিতে ভর করে চলছে উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ। বাহ্যিকভাবে উন্নয়নের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা গেলেও প্রকৃত অর্থে একই উন্নয়নে ঘুরপাক খাচ্ছে নগরগুলো। এতে নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়ে, ব্যাপক অপচয় হয় জাতীয় অর্থের। টেকসই নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার স্বার্থে ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিক এ ধরনের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের লাগাম টেনে ধরা অপরিহার্য।
যদি নগরমুখী জনস্রোত হ্রাসে পরিকল্পিত পরিকল্পনা নিয়ে গ্রামীণ জনপদের উন্নয়নে মনোযোগ দেয়া যায়, তাহলে বাড়তি জনসংখ্যার চাপ থেকে নগরগুলো রক্ষা পাবে। এর জন্য জনসম্পৃক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সেবা বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। এ ছাড়া গ্রামীণ জনপদের পরিকল্পিত বসতি ও টেকসই নগর উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিম্নোক্ত সুপারিশগুলো বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
১. স্বল্প ভূমির দেশের কৃষিজমি রক্ষা ও পর্যাপ্ত খোলা গ্রিন স্পেস রাখার লক্ষ্যে নগরগুলোয় এখন থেকে সরকারি উদ্যোগে ১০ তলার নিচে ভবন করা থেকে বিরত থাকা।
২. প্রতিটি নগরেও ব্যক্তি ও বেসরকারি সংস্থাকে ১০ তলার নিচে ভবন নির্মাণ করার অনুমতি না দেয়া। প্রয়োজনে ৫ তলার উপরের ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
৩. দেশের প্রতিটি উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশনের নগরীগুলোকে পৃথক মাস্টার প্ল্যানের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মাণ ও আবাদি জমি নষ্ট করে নতুন বাড়ি নির্মাণে নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে নতুন বাড়ি নির্মাণের স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সুপারিশক্রমে অনেক বেশি পরিমাণ ট্যাক্স আদায়সাপেক্ষে উপজেলা হাউজিং কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে।
৪. জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সরবরাহকৃত গ্রামীণ যৌথ মালিকানাধীন ক্লাস্টার ভিলেজের নকশায় বাড়ির আঙিনায় বা গ্রামের কোন স্থানে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোন স্থানে পশু পালন ও কোন স্থানে কী ধরনের ফলজ, বনজ বা তরিতরকারির গাছপালা রোপণ করা যায় সে নির্দেশনাসহ গাছপালা পরিচর্যার পরামর্শ /নির্দেশনা প্রদান করবে।
৫. জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত নকশা অনুযায়ী ঘরবাড়ি নির্মাণে জনসাধারণকে উৎসাহিতকরণে ঘরবাড়ি নিবন্ধন কার্যক্রম প্রচলন এবং নিবন্ধিত ঘরবাড়ি নির্মাণে স্বল্প সুদে সম্পূর্ণ বা আংশিক গৃহঋণ প্রদান করা যেতে পারে।
৬. দেশব্যাপী জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃতকরণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনান্তে স্ব স্ব এলাকাস্থ শিক্ষক, প্রকৌশলী, স্থপতি, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি (সরকারি/বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে) নিয়ে প্রথমে উপজেলা পর্যায়ে একটি করে এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ‘পরিকল্পিত গ্রামীণ জনপদ উন্নয়ন কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে।
২০৪১ সালে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নগরে বসবাস করবে। ধারণা করা হচ্ছে- প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে নগরকেন্দ্রিক। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা-২০৪১ ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিষয়টিকে সমানভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনায় প্রতিটি নগরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা আছে। ভবন নির্মাণবিধি সঠিকভাবে অনুসরণ, নগর ও গ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন ও গণপরিসরসহ সব ক্ষেত্র নিরাপদ করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাম ও নগরের স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বাজার, পরিবহন সবকিছু অন্তর্ভুক্তিমূলক করা প্রয়োজন। দেশের প্রতিটি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিকল্পনা কমিশন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিত নগর নীতিমালা প্রণয়ন ও গাইডলাইন তৈরিপূর্বক জনগণকে প্রদান করতে হবে। এসব করতে পারলেই নগর নিরাপদ ও টেকসই হবে। যার মধ্য দিয়ে ‘বৈষম্য হ্রাসের অঙ্গীকার করি-টেকসই নগর গড়ি’ প্রতিপাদ্যের সফল বাস্তবায়ন হবে। যা চূড়ান্তভাবে সরকারের ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যাশিত বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত সোনার বাংলার সুফল দেশ ও জাতি পাবে।

এ কে এম এ হামিদ : উন্নয়ন গবেষক ও সভাপতি, আইডিইবি, ঢাকা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়