বৈষম্য হ্রাসে টেকসই নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা

আগের সংবাদ

কুমিল্লায় মণ্ডপের নিরাপত্তায় সক্রিয় আওয়ামী লীগ

পরের সংবাদ

তোয়াব খান : কীর্তিমান এক সাংবাদিক

বিভুরঞ্জন সরকার

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২২ , ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৩, ২০২২ , ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

একুশে পদক পাওয়া বর্ষীয়ান সাংবাদিক, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ তোয়াব খান তার ৮৭ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অবসান ঘটিয়েছেন ১ অক্টোবর দুপুরে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে সংবাদপত্র জগতের এক মহীরুহের পতন হলো। তোয়াব খান তার দীর্ঘ কর্মজীবনে একাধিক সংবাদপত্রে বার্তা সম্পাদক, সম্পাদক, উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে ‘পিণ্ডির প্রলাপ’ নামের একটি আকর্ষণীয় উপস্থাপনা নিয়মিত প্রচারিত হতো। এছাড়া তিনি দুইজন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের তথ্য সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তথ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার অল্পসময় আগেও তার সঙ্গে তোয়াব খানের দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার স্মৃতি নিয়ে একটি প্রবন্ধ পড়ে এমন তথ্য জেনেছি, যা আর কারো লেখায় পাওয়া যাবে না।
আমার একটি সৌভাগ্য যে আমি যেমন তোয়াব ভাইয়ের স্নেহ পেয়েছি, তেমনি আমার সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়েছিল দৈনিক আজাদের মফস্বল প্রতিনিধি হিসেবে সেই ১৯৭০ সালে। দৈনিক আজাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন মওলানা আকরম খাঁ, যিনি তোয়াব খানের চাচা। আবার আমি এখন যে আজকের পত্রিকায় কাজ করছি তার নির্বাহী সম্পাদক সেলিম খানের মামা। অর্থাৎ আমি কোনো না কোনোভাবে তোয়াব ভাইয়ের সাংবাদিক পরিবারে জড়িয়ে আছি। এবার আসি তোয়াব ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় কীভাবে হলো। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন তোয়াব খান এবং সে সুবাদেই তোয়াব ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ও পরিচয়। এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকা প্রকাশের পর একপর্যায়ে আমি নিয়মিত রাজনৈতিক বিষয়ে বিশ্লেষণমূলক লেখা লিখতাম। সামরিক শাসনের সময় সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হতো। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সাধারণত রাজনৈতিক খবরাখবর থাকত না, কারণ রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নিষিদ্ধ ছিল। পরে রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিতভাবে অনুমোদিত হলেও রাজনৈতিক খবরাখবর কিংবা মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা ধরনের বিধিনিষেধ মেনে চলতে হতো।
প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অখুশি হন সেরকম কোনো খবর বা মতামত ছাপা ছিল অপরাধের শামিল। আবার প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বা চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (সংক্ষেপে সিএমএলএ) বারবার নির্দেশ বদল করতেন। সেজন্য সাংবাদিকরা সিএমএলএ তামাশা করে বলতেন ক্যানসেল মাই লাস্ট অ্যানাউন্সমেন্ট (সিএমএলএ)। সেই রকম একটি প্রেক্ষাপটে শফিক রেহমান যায়যায়দিন নামে একটি ব্যতিক্রমী সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করেন। সাপ্তাহিক পত্রিকা হওয়ায় যায়যায়দিন কিছুটা ঝুঁকি নিয়েও রাজনৈতিক বিষয়েও মতামত প্রকাশ করছিল। সপ্তাহের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন লেখার দায়িত্ব আমি পেয়েছিলাম। যায়যায়দিন একদিকে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল, অন্যদিকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের কার্যক্রম সীমিতভাবে শুরু করেছিল। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছিল। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতৃত্বে দুটি পৃথক রাজনৈতিক জোট গড়ে উঠেছিল। এক জোটের নেত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আর অন্য জোটের নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দেশে তখন ‘দুই নেত্রী’ শব্দটি চালু হয়।
সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে রাজনৈতিক কলাম লেখার দায়িত্ব আমি পেলেও ঝামেলা এড়ানোর জন্য আমার আসল নাম লুকিয়ে একটি ছদ্মনাম গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিলেন সম্পাদক সাহেব এবং তারিখ ইব্রাহিম নামটি তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এটা বলা নিষ্প্রয়োজন যে তারিখ ইব্রাহিমের রাজনৈতিক কলাম যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এবং স্বাভাবিকভাবেই স্বৈরশাসক এরশাদের কাছে যায়যায়দিন দ্রতই চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল। এক পর্যায়ে যায়যায়দিন প্রকাশনা বন্ধ করা হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় দফায় যখন যায়যায়দিন প্রকাশ শুরু হয় তারই এক পর্যায়ে প্রধান সামরিক শাসকের কার্যালয় থেকে আমার ডাক আসে এবং সেটা প্রেস সেক্রেটারি তোয়াব খানের মাধ্যমে। তোয়াব খান ছিলেন একজন আপাদমস্তক ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ। তিনি উচ্চস্বরে কথাও বলতেন না। অভিজ্ঞতা তাকে বিনয়ী করে তুলেছিল।
আমি এরশাদ সাহেবের রুমে ঢোকার আগে তোয়াব ভাই আমাকে অভয় দিতে বলেন, আমি যেন তার সঙ্গে কোনো ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে না পরি। এরশাদের সঙ্গে আমার কয়েক মিনিটের সাক্ষাৎকারটিতে অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। এরশাদ সাহেব প্রথমেই জানতে চেয়েছিলেন আমার বাড়ি কোথায়। আমি পঞ্চগড়ের ছেলে এটা শুনেই তিনি বলে উঠেছিলেন, তুমি আমার এলাকার ছাওয়াল হয়ে কেন আমার বিরুদ্ধে লেখ। আমি বলেছিলাম, আমি কারো পক্ষে বা বিপক্ষে লিখি না, যা সত্য তাই উল্লেখ করি মাত্র। এরশাদ সাহেব বলেছিলেন, তিনি রাজনীতিকে খারাপ মানুষদের হাত থেকে ভালো মানুষের হাতে ফিরিয়ে দেবেন। আমি বলেছিলাম, আপনার সঙ্গে যাদের যুক্ত করেছেন, তারা তো কেউ ভালো মানুষ নন। খারাপ মানুষদের দিয়ে কীভাবে ভালো রাজনীতি আপনি করতে চান? একটুও সময় না নিয়ে এরশাদ সাহেব বলেছিলেন, ‘তোমরা যারা টেবিলের অন্য পাশে বসো, তারা যত সহজে মতামত দিতে পার আমি টেবিলের এপাশে বসে সেটা পারি না। ইয়াংম্যান, মনে রাখবা বলা সহজ, করা কঠিন। আমি একটি কঠিন দায়িত্ব নিয়েছি। আমার এই দায়িত্ব পালনে তোমরা সহযোগিতা করলে আমি খুশি হব।’ সবশেষে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘মানুষের মনে ক্ষোভ বা অসন্তোষ তৈরি হয় এমন কিছু আমি যেন না লিখি। তিনি এটাও বলেছিলেন, উত্তরের মানুষ হিসেবে আমার কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা থাকলে আমি যদি তাকে জানাই, তাহলে তিনি সেই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেবেন।’
এরশাদ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তোয়াব খানের কাছ থেকে আমি বিদায় নিতে গেলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার লেখা তিনি পড়েন এবং তার ভালো লাগে। রাজনৈতিক মতামত লেখার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন তোয়াব ভাই।’ তারপর অনেক ঘটনা ঘটেছে। যায়যায়দিন প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়েছে, সেটা অবশ্য আমার লেখার কারণে নয়। সম্পাদক শফিক রেহমানকে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে। এরও কয়েক বছর পর প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদেরও প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন তোয়াব খান। এরপর দৈনিক জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদকের দায়িত্ব যখন তোয়াব খান নিলেন তখন আমাকে তিনি ডেকেছিলেন। মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় জনকণ্ঠের সে সময়ের অফিসে আমি তোয়াব খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমাকে নিয়োগও দিয়েছিলেন; কিন্তু একটি বিশেষ কারণে আমি তখন জনকণ্ঠে যোগ দিতে পারিনি। আমি এ বিষয়ে তোয়াব ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললে তিনি আমার বিষয়টি অনুধাবন করেন এবং বলেন আমি যেন জনকণ্ঠে নিয়মিত লিখি। তোয়াব ভাইয়ের পরামর্শ অনুযায়ী জনকণ্ঠে আমি লেখা শুরু করি। আমার লেখা ‘মন্তব্য প্রতিবেদন’ জনকণ্ঠে প্রথম পাতায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে। এটা তোয়াব ভাইয়ের উদারতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশের রীতিটা সম্ভবত তোয়াব ভাই-ই চালু করেছিলেন। তিনি বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন কিন্তু আমাকে তিনি বিশেষভাবে স্নেহ করতেন। তার নেতৃত্বে জনকণ্ঠ দেশে একটি জনপ্রিয় দৈনিকে পরিণত হয়েছিল। বেশ কিছুদিন আমি জনকণ্ঠে নিয়মিত কলাম লিখেছি। এক পর্যায়ে কোনো কারণে আমি আর জনকণ্ঠে লিখতে পারিনি। তোয়াব ভাই একাধিক দিন ফোনে আমাকে বলেছেন, ‘আমি যখন সময়-সুযোগ পাব তখনই যেন জনগণ্ঠে লেখা দিই। তোয়াব ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে স্বাভাবিকভাবেই মর্মাহত হয়েছি। তার সঙ্গে আমার নিত্যদিন যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু তিনি আমাদের মাথার ওপর বটবৃক্ষ হয়ে আছেন- এটা এক বড় ভরসার বিষয় ছিল। তোয়াব খানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমাদের সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগের শেষ প্রতিনিধিরও বিদায় ঘটল। এইতো মাস কয়েক আগেই যখন শুনলাম এই পরিণত বয়সও তিনি নতুন করে দৈনিক বাংলার সম্পাদকের দায়িত্ব নিচ্ছেন, তখন এই ভেবে উৎসাহিত হয়েছি যে তার নেতৃত্বে দেশে একটি ভালো নতুন পত্রিকা পাঠকের হাতে যাবে। তোয়াব ভাই ছিলেন বহুদর্শী এক অভিজ্ঞ মানুষ। সংবাদপত্র জগতে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। তার অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে একটি নতুন দৈনিককে পাঠকপ্রিয় করা যায়। বয়সি মানুষ হয়েও তরুণদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবাধ করতেন। কারণ বয়সে প্রবীণ হলেও তার মধ্যে নবীনের উদ্যম ও চাঞ্চল্য ক্রিয়াশীল ছিল শেষ দিন পর্যন্ত। আমাদের আমাদের দেশে এখন অসংখ্য সংবাদপত্র, সাংবাদিকের সংখ্যাও অনেক কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ ও মানসম্পন্ন খবর ও মতামতের অভাব এখনো তীব্রভাবে অনুভূত হয়। মানুষের চাহিদা অনুযায়ী পূরণ করার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বশীল ও রুচিসম্পন্ন সংবাদপত্র প্রকাশ করতে হয় তার একজন উপযুক্ত শিক্ষক ছিলেন তোয়াব খান। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি বিশেষ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। সংবাদপত্র জগতে তিনি যে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতেন, তা স্বীকার করে নিয়ে এটুকুই বলতে চাই, তার শূন্যতা সহজে পূরণ হবে না। তোয়াব ভাইয়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি এবং তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়