পশ্চিমা মিডিয়া যেভাবে বাংলাদেশকে দেখে

আগের সংবাদ

দুর্গাপূজার তাৎপর্য

পরের সংবাদ

প্রশ্নপত্র ফাঁস : অপরাধীদের ছাড় নয়

রতন কুমার তুরী

লেখক ও শিক্ষক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২ , ১:২৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২ , ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

যে কোনো পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি জাতির জন্য লজ্জার বিষয়, যা লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীসহ অভিভাবকদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এর ফলে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ নিয়ে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধেও মানুষের মনে খারাপ ধারণা জন্ম নেয়।
নিকট অতীতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল একেবারে নিয়মিত একটি ব্যাপার। পাবলিক পরীক্ষা, সাধারণ চাকরির পরীক্ষা থেকে শুরু করে ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পর্যন্ত বাদ যায়নি ফাঁস হওয়া থেকে। মাঝখানে এ অবস্থার বেশ উন্নতি ঘটেছিল। কিন্তু ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় একসঙ্গে ছয় বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় অভিভাবকদের মনে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার উদ্রেক করেছে। দিনাজপুরের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার একটি কেন্দ্রের সচিবের মাধ্যমে এই ন্যক্কারজনক প্রশ্নফাঁসের ঘটনাটি ঘটেছে বলে ইতোমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় প্রশাসন অভিযুক্ত কেন্দ্র সচিবের সঙ্গে আরো তিনজন শিক্ষক এবং একজন কর্মচারীকে আটক করে জেলে পাঠিয়েছেন। বিষটির এখনো তদন্ত চলছে। অন্যদিকে দিনাজপুর বোর্ড চলতি এসএসসি পরীক্ষার গণিত, পদার্থ, কৃষিশিক্ষা এবং রসায়ন পরীক্ষা স্থগিত করেছে। তাছাড়া উচ্চতর গণিত এবং জীববিজ্ঞান বিষয়ে নতুন প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে যথাসময়ে পরীক্ষা নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্তৃপক্ষের উদ্যোগগুলো যথাযথ হলেও কেন পরীক্ষার এতগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কোথায় ভুল কিংবা গ্যাপ ছিল কর্তৃপক্ষের সে বিষয়টি অবশ্যই খুঁজে বের করা উচিত। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে যাতে কারো কোনো প্রশ্নের অবকাশ না থাকে বিষয়টি সেভাবেই তদন্ত করা উচিত।
একসময় প্রেসের কর্মচারীদের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বিষয়টি আমরা অতীতে লক্ষ্য করেছি। কিন্তু কেন্দ্র সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তাকে এ ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকতে তেমন একটা দেখা যায়নি। বিশেষত কেন্দ্র সচিব নিজে যেখানে একজন শিক্ষক। যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রশ্নপত্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কেন্দ্র সচিব নিজেই। প্রকৃতপক্ষে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা বেশ আগে থেকে হয়ে আসলেও ২০১৮ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠলে সে সময় কর্তৃপক্ষ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল তার মধ্যে ছিল, কেন্দ্রে সব দায়িত্বরত শিক্ষকের মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা, পরীক্ষা চলাকালীন অবস্থায় নেটের গতি কমানো এবং পরীক্ষা আরম্ভ হওয়ার ৩০ মিনিট আগে প্রশ্নের সেট কোড জানানো। এসব পদক্ষেপের সুফলও পাওয়া গেছে। কিন্তু হঠাৎ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুনরাবৃত্তি ঘটায় এখন বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। প্রশ্নপত্র ছাপানো এবং তা কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত বেশকিছু ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এসব ধাপ বেশ গোপনীয়। প্রথমত প্রশ্নপত্র ছাপানো হয়, তারপর অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে পরীক্ষার অনুষ্ঠিত হওয়ার তিন দিন আগে প্রশ্নপত্র চলে যায় জেলা প্রশাসকের অধীনে জেলা ট্রেজারিতে। তারপর জেলা প্রশাসক জেলার অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রশ্নপত্র রেখে দিয়ে বাকি প্রশ্নপত্রগুলো উপজেলায় পাঠিয়ে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে। উপজেলাগুলোতে প্রশ্নপত্র সাধারণত রাখা হয় থানায়, পরীক্ষার ১ বা ২ দিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন কর্মকর্তাকে ট্যাগ করে কেন্দ্র সচিব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় থানায় গিয়ে প্রশ্নপত্রগুলো সর্টিং (বাছাই) প্রক্রিয়া শেষ করে প্রশ্নপত্রগুলো থানাতেই রেখে দেন। তারপর একজন ট্যাগ কর্মকর্তা, কেন্দ্র সচিব এবং একজন পুলিশের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রসমূহ প্রতিদিন সকালে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরীক্ষা শুরু হওয়ার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্রের সেট কোড সেন্টারে বলে দেয়া হয়।
এতগুলো পর্যায় ডিঙিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এমন ঝুঁকি এসব শিক্ষক কীভাবে নিল তা খতিয়ে দেখা দরকার। এর পেছনে আরো কোনো চক্র আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনে যারাই জড়িত থাক না কেন, এদের কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব যথাযথ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে খুব দ্রুত তদন্তপূর্বক প্রকৃত দোষীদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনবেন।

রতন কুমার তুরী : লেখক ও শিক্ষক, ঢাকা।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়