কমলগঞ্জে মনিপুরি কমিউনিটি ট্যুরিজমে আর্থিক সম্ভাবনা

আগের সংবাদ

ইইউর নতুন দুঃশ্চিন্তা ইতালিতে মেলোনির উত্থান

পরের সংবাদ

অনিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা কেউ জানে না

২৪.৯ শতাংশ নৌ দুর্ঘটনার কারণ অতিরিক্ত যাত্রী-পণ্য

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ , ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ , ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই সারাদেশে লাখো নৌযান চলছে। নিবন্ধন, রুট পারমিট ও ফিটনেস কিছুই লাগছে না। চালকের দক্ষতার কোনো বালাই নেই। এসব কারণে একের পর এক নৌ দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু নৌ-কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে কোনো মাথা ব্যাথা নেই বললেই চলে। দুর্ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারকে শেষকৃত্যের জন্য কিছু টাকা দিয়েই তারা দায়িত্ব শেষ করেন। গত রবিবার পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে নৌকা ডুবে নারী-শিশুসহ ৪১ জনের প্রাণহানির ঘটনাটি সর্বশেষ নৌ দুর্ঘটনা। নৌপথে যথাযথ নজরদারির অভাব ও যুগোপযোগী আইন না থাকায় এ জাতীয় দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত যাত্রী ও মালপত্র বোঝাইয়ের কারণে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে।

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির গবেষণায় দেখা গেছে, হাওর অঞ্চলসহ দেশের নদী ও অন্য নৌপথে চলাচলকারী নৌযানগুলোর বেশির ভাগই শ্যালো ইঞ্জিনের সাহায্যে এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয়। এই দেশীয় প্রযুক্তিরও কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। বিভিন্ন এলাকার কারিগররা তাদের ইচ্ছেমতো দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে তৈরি করে থাকে এসব নৌযান। মানসম্মত কাঠামো নিয়ে নৌযানগুলো তৈরি হয় না। এছাড়া এসব নৌযানে কোনো ধরনের দিকনির্দেশক যন্ত্র, রাতে চলাচলের মতো হেডলাইট, সিগন্যাল বাতি, ধারণক্ষমতা ও সময়ানুপাত জ্ঞান, যাত্রীদের নিরাপত্তায় লাইফ জ্যাকেট, স্টিয়ারিং, ব্রেক, প্রশিক্ষিত চালক কিছুই থাকে না। দেশের সর্বত্রই এসব নৌযান সবসময় অতিরিক্ত যাত্রী ও মালপত্র বোঝাই করে চলাচল করে। খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেও এদের গতিরোধ করা হয় না। আর এসব কারণেই একটু এদিক-সেদিক হলেই এসব নৌযান বেশি দুর্ঘটনায় পড়ে। এদের মনিটরিংয়ের দায়িত্বে কেউ থাকে না।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর এসব যাত্রীবাহী নৌযান নিয়ে কখনোই মাথা ঘামায় না। অথচ অহরহ দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা

ঘটেই চলছে। নানা উদ্যোগ-আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর সরকারিভাবে নৌ-নিরাপত্তা সপ্তাহ পালন করা হলেও কার্যত এখনো দেশের নৌপথ নিরাপদ হয়নি। গত বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় ট্রলার ডুবে ২২ জনের মৃত্যুর পর শ্যালো ইঞ্জিন বিশিষ্ট ছোট নৌযান দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়টি সামনে এসেছিল। এর আগে ওই বছরের ৪ এপ্রিল শীতলক্ষ্যায় কার্গোর ধাক্কায় সাবিত আল হাসান লঞ্চের ৩৫ যাত্রী ও ৩ মে পদ্মায় স্পিডবোট দুর্ঘটনায় মারা যান ২৬ জন।

নৌ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৌপথে সঠিক নজরদারির অভাব ও যুগোপযোগী আইন না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না।

বিআইডব্লিউটিএর তথ্য মতে, গত ১০ বছরে ২৫টি দুর্ঘটনায় ৪৪৫ লঞ্চযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪১০ জনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। কিন্তু দেশীয় নৌযান ও হাওর-বাঁওড় অঞ্চলের নৌকা, ট্রলারডুবির তথ্য তাদের কাছে নেই। কখনো কোনো তালিকাও হয় না। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ জাতীয় নৌ-দুর্ঘটনায় এক হাজারের বেশি যাত্রী প্রাণ হারান বলে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সূত্রে জানা গেছে। শুধু ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের হিসাবেই ২০২০ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ৭০০ জনের বেশি।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের জারি করা সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো নৌযানের দৈর্ঘ্য ২০ মিটারের বেশি হলেই সেটিকে সার্ভে সনদ নিতে হবে। এছাড়া ১২ জনের বেশি যাত্রী পরিবহনকারী বা ১৬ হর্স পাওয়ারের বেশি শক্তির ইঞ্জিনচালিত নৌযানের জন্যও সার্ভে সনদ বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেশে এমন কয়েক লাখ নৌযান রয়েছে- যেগুলো কোনো ধরনের নিবন্ধন, সার্ভে ও রুট পারমিট ছাড়াই অবাধে চলছে। দেশে অনিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা কত- এর কোনো পরিসংখ্যানও কারো কাছে নেই। ২০১৬ সালে নৌযান শুমারির উদ্যোগ নেয়া হলেও এ সংস্থার সেই প্রকল্পটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এসবের মধ্যে বালুবাহী জাহাজ (বাল্কহেড), ট্রলার ও স্পিডবোট রয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণেই পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে এবার নৌকাডুবির ঘটনা ঘটল।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে মাত্র ১৪ হাজারের মতো নিবন্ধিত নৌযান রয়েছে। এর বাইরের সব নৌযান নৌ-পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ, নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর বা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে।

এই প্রসঙ্গে লঞ্চমালিক গোলাম কিবরিয়া টিপু বলেন, দেশের নৌপথকে সবচেয়ে ঝুঁকিতে ফেলেছে নিবন্ধনহীন বাল্কহেডগুলো। এদের রাতে চলাচলের নিয়ম না থাকলেও দিন-রাতে সমানভাবে চলছে। এসব নৌযানের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাতি নেই। প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে চলা এসব বাল্কহেডের বিরুদ্ধে কিছু বললেই লঞ্চমালিকদের হেনস্তা করা হয়। তিনি নৌপথে আইনের প্রয়োগ ও নজরদারি বাড়ানো হলে নৌ দুর্ঘটনা কমবে।

অন্যদিকে, প্রচলিত আইনে অসামঞ্জস্যতা ও শাস্তির বিধান কম থাকায় দুর্ঘটনা কমছে না বলে মনে করেন বিশ্লেষক ক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ।

তিনি বলেন, নৌ দুর্ঘটনার জন্য মালিক ও চালক- দুই পক্ষই দায়ী হতে পারে। কারণ নৌযান চালকের ভুলে যেমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তেমনি নৌযানের ত্রুটির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। সঠিকভাবে নৌযান তৈরি, প্রয়োজনীয় নিবন্ধন নেয়া, নিরাপত্তা সামগ্রী নিশ্চিত করা; এমনকি সঠিক চালক নিয়োগও মালিকের ওপর বর্তায়। মালিক ও শ্রমিকদের চাপের মুখে গত কয়েক বছরেও অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ-১৯৭৬ সংশোধন হয়ে অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল আইনে রূপ নেয়নি। এসব সংগঠনের অনুরোধে বারবার তাদের মতামত নেয়ার নামে সময়ক্ষেপণ করা হয়। শুধু তাই নয়, আইনে বারবার সাজা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও তা থেকে সরে আসা হয়। ২০১৯ সালে নৌ দুর্ঘটনার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের বিধান রাখা হলেও চাপের মুখে তা আবার ৫ বছর করে খসড়া তৈরি করে নৌ পরিবহন অধিদপ্তর।

প্রতি বছর ৪ মে নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ পালন করে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। তাদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট যাত্রী সংখ্যার ৩৫ শতাংশ নৌপথে চলাচল করে। মোট পণ্যের ৭০ ও তেলজাত দ্রব্যের ৯০ শতাংশ নৌপথে পরিবহন করা হয়। অন্য একটি হিসাব থেকে জানা যায়, প্রতি বছর প্রায় ৯ কোটি মানুষ দেশের নৌপথে যাতায়াত করে। নানা যৌক্তিক কারণেই নৌপথ জনপ্রিয়, সহজলভ্য এবং আরামদায়ক। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা যায়, ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ মুখোমুখি সংঘর্ষ। অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বোঝাইয়ের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এছাড়া ঝড়ের কবলে পড়ে হচ্ছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। আর বাকি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নৌযানের নকশা ও ইঞ্জিনের ত্রুটিসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বলেন, দেশীয় নৌযানগুলোকেও নিবন্ধন ও রুট পারমিটের আওতায় আনতে অনেক দিন ধরেই চেষ্টা চলছে। কিন্তু নৌযান মালিকরা তাতে সাড়া দিচ্ছেন না। নিবন্ধন করা হলে তাদের নিয়ম-কানুন মানতে হবে, মনিটরিং সহজ হবে। এখন স্থানীয় প্রশাসন হয়তো এগুলো চলাচলের অনুমতি দেয়। কিন্তু তারা তো আর এর কারিগরি বা নিরাপত্তার বিষয়গুলো বোঝে না। তাই শৃঙ্খলা আনতে হলে নিবন্ধনের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এমকে

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়