আমাদের ভাতঘুমে থাকলে চলবে না

আগের সংবাদ

শিক্ষায় মহাসংকেত বাজছে, দায় কাদের?

পরের সংবাদ

বিশ্ব পর্যটন দিবস : স্বতন্ত্র ‘পর্যটন মন্ত্রণালয়’ গঠন সময়ের দাবি

ড. মো. মামুন আশরাফী

কবি ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ , ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ , ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

‘পর্যটন’ এমন একটি শিল্পের নাম, যে শিল্পটি একটি দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করে দিতে পারে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ, যেমন মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, নেপালসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নাটকীয়ভাবে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি আনয়ন করেছে এবং এর মাধ্যমে তাদের দেশের জনগণকে একটি অপেক্ষাকৃত উন্নত জীবন উপহার দিয়েছে। কিন্তু এটি খুবই দুঃখজনক যে, স্বাধীনতার ৫০ বছর চলে গেলেও বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পের কাক্সিক্ষত উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনার এই মহাসড়কটিতে নিজেকে এখনো পুরোপুরি যুক্ত করতে পারেনি। তবুও প্রতি বছরের মতো আজ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হবে ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডবি­ওটিও) উদ্যোগে ১৯৮০ সাল থেকেই বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি, সভা-সেমিনার, র‌্যালি ইত্যাদি পালনের ভেতর দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে এই গুরুত্বপূর্ণ দিবসটি। বিশ্বব্যাপী পর্যটন দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘পুনর্বিবেচনায় পর্যটন’। কাকতালীয় মনে হলেও এ কথা পরিষ্কার যে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে এদেশের জনগণকে আরো উন্নত একটি জীবন উপহার দিতে বাংলাদেশের পর্যটন নিয়েও ‘সামগ্রিক পুনর্বিবেচনা’ আজ একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
‘পর্যটন’ এমন একটি বিশেষায়িত সেবামূলক পণ্য, যার চাহিদা বা বাজার রয়েছে আমাদের নিজের দেশে এবং রয়েছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের এমন কিছু অনন্য পর্যটন পণ্য রয়েছে, যার চাহিদা বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের অনেক পর্যটন পণ্যের চেয়েও অধিক আকর্ষণীয়। সেই কারণে এসব পণ্য বিক্রয় বা রপ্তানি করাও তুলনামূলকভাবে সহজসাধ্য। আমাদের শুধু প্রয়োজন এসব পণ্যের ‘উন্নয়ন করা’ যা ইংরেজিতে ‘প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের এসব পর্যটন পণ্যের মধ্যে পর্যটকদের কাছে প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য ‘সুন্দরবন’ ও পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত ‘কক্সবাজার’। তাছাড়া বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘন সবুজ জঙ্গল, সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণি ও শুভ্র মেঘমালা, রাঙ্গামাটির পাহাড়-জঙ্গল ও কাপ্তাই লেক, ইউনেস্কো ঘোষিত বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্য (পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও সুন্দরবন) এবং নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত প্রাচীন সভ্যতার প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় পণ্য হিসেবে সমাদৃত। সিলেটের পাহাড়-জঙ্গল-চা বাগান সমৃদ্ধ অঞ্চলসহ বাংলাদেশের বহু অঞ্চল দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে সক্ষম। নদীমাতৃক বাংলাদেশের শত শত নদী আর তার দুধারে সবুজ শ্যামল প্রকৃতির অপরূপ সুন্দর দৃশ্যও দেশের পর্যটন ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের প্রতি নদী পর্যটনের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। একজন পর্যটন কর্মী হিসেবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এ খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে আমি এ কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশে বর্তমান পর্যটন সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এবং বিদ্যমান পর্যটন আকর্ষণ বা পণ্যগুলোকে সঠিকভাবে উন্নয়ন করে বিশ্বব্যাপী সঠিক বিপণনের মাধ্যমে বাংলাদেশকেও মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো একটি উন্নত অর্থনীতির দেশ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এ ব্যাপারে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ রয়েছে, যা সদাশয় সরকার বিবেচনায় নিলে এসব পরামর্শ বাংলাদেশের পর্যটনের টেকসই বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
১৯৭২ সালে, একটি সদ্যস্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও পর্যটনের অপার সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই অসীম দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পর্যটনের উন্নয়নের জন্য ‘বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন’ গঠন করেছিলেন। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য কারণে বাংলাদেশের পর্যটনের উন্নয়নে প্রত্যাশিত দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি সুদীর্ঘ ৫০ বছরেও। এর পেছনের কারণ ও ত্রæটিগুলো নির্মোহভাবে অনুসন্ধান করে প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। প্রায় একযুগ হলো বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনাময় খাত পর্যটনের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড’। উচ্চপদস্ত সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি অভিজ্ঞ পর্যটন ব্যক্তিত্বদের সমন্বয়ে গঠিত এই সংস্থাটির বিগত এক যুগের গৃৃহীত পদক্ষেপগুলো এবং ভবিষ্যতে গৃহীতব্য পদক্ষেপগুলোও নিয়মিত নির্মোহ মূল্যায়ন করা উচিত।
তাছাড়া বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে একটি ‘পর্যটন তথ্য কেন্দ্র’ স্থাপন করে ট্যুরিজম বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তা থেকে প্রচার-প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে ট্যুরিজম বোর্ড আরো ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। অবশ্য গঠনের পর থেকেই সংস্থাটি স্বল্প পরিসরে হলেও বিভিন্ন পর্যটন প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় কম খরচে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করে আসছে; যদিও আমি মনে করি এর কলেবর আরো বৃদ্ধি করা উচিত। এ কথা অনস্বীকার্য যে, শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের পর্যটনের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের হীরকখচিত অবদান রয়েছে। পর্যটন ও এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত বিমান চলাচল খাতে উদ্যোক্তাদের অফিস, হোটেল, রিসোর্ট, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, রেস্টুরেন্ট, জাহাজ, নৌকা, বাসসহ উড়োজাহাজ, হেলিকপ্টার ইত্যাদিসহ আরো অন্যান্য যানবাহনের মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাজার হাজার কোটি টাকা প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ রয়েছে। লাখ লাখ কর্মী এই শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। করোনার ভয়াল থাবায় সর্বপ্রথম লণ্ডভণ্ড ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার হওয়া সত্ত্বেও এই শিল্পসংশ্লিষ্ট মানুষগুলো পর্যটনকেই তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছে।
এই শিল্পসংশ্লিষ্ট মানুষ দেখিয়েছে, কীভাবে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হয়, কীভাবে চরম দুর্দশাগ্রস্ত সময়েও ঘুরে দাঁড়াতে হয়; কীভাবে বেকারত্ব দূর করে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হয়। তাই এই খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের লক্ষ্যে বেসরকারি অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও প্রাধান্য দেয়া উচিত। এ খাতটিকে আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার জটিলতা থেকে মুক্ত না রাখলে পর্যটনের প্রত্যাশিত উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। আর তাই ট্যুরিজম বোর্ডে বেসরকারি অভিজ্ঞ পর্যটন ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ যৌক্তিক সংখ্যায় বাড়ানো এবং বেসরকারি সদস্যদের ভেতর থেকে একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ করলে অধিক ফল পাওয়া যেতে পারে। বিশ্বের বহু দেশেই পর্যটনের প্রচার ও প্রসারের জন্য দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা এবং দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উদ্যোক্তা/পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত কার্যকর ট্যুরিজম বোর্ড রয়েছে, যাদের মধ্যে অনেক দেশের ট্যুরিজম বোর্ডেই বেসরকারি সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
পর্যটনের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ইত্যাদিসহ আরো অনেক মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত রয়েছে। পর্যটন খাতে আরো অধিক পরিমাণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ভৌত অবকাঠামোসহ পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবকিছুর উন্নয়নের জন্য এসব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পারস্পরিক নিবিড় সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন ও অপরিহার্য। তাই পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব মহলে এটি একটি আলোচিত বিষয় এবং পর্যটনের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে বহু বছর ধরেই একটি পৃথক ‘পর্যটন মন্ত্রণালয়’ গঠনের প্রয়োজনীয়তা এবং অপরিহার্যতা দেখা দিয়েছে। তাই ‘বেসামরিক বিমান চলাচল’কে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র ‘পর্যটন মন্ত্রণালয়’ গঠন করলে এর মাধ্যমে উন্নয়নের পথের বৃহৎ বাধাগুলো অপসারিত হবে এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নে এটি দেশ-বিদেশে একটি কার্যকর, আধুনিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত ও প্রশংসিত হবে।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির আনন্দময় সময়ে, আজকের এই বিশ্ব পর্যটন দিবসে দেশ ও জাতির বৃহত্তর অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ‘পর্যটন মন্ত্রণালয়’ গঠনে ঘোষণা দেয়া হতে পারে বাংলাদেশের আপামর জনতার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রীর এক যুগান্তকারী শ্রেষ্ঠ উপহার।

ড. মো. মামুন আশরাফী : কবি ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়