অস্ট্রেলিয়ায় সৈকতে দুইশ’ তিমির মৃত্যু

আগের সংবাদ

৫৫ লাখ টন শস্য রপ্তানি করবে ইউক্রেন

পরের সংবাদ

সুদ মওকুফে এগিয়ে বেসরকারি ব্যাংক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২২ , ১০:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২২ , ১০:০০ পূর্বাহ্ণ

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদ মওকুফের প্রবণতা হঠাৎ করেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ মওকুফ করেছে ২ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। যা আগের (জানুয়ারি-মার্চ) প্রান্তিকে ছিল মাত্র ১৯১ কোটি টাকা। সে হিসাবে, ব্যাংকগুলো আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা বেশি সুদ মওকুফ করেছে, যা প্রায় ১২ গুণ বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অনাদায়ী ঋণের আসল টাকা আদায়ে সুদ মওকুফের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের সঙ্গে মিলে যোগসাজশের মাধ্যমে সুদ মওকুফ করছে, যা মওকুফকৃত ঋণের সুদের পরিমাণ বৃদ্ধিতে ব্যাপকভাবে অবদান রাখছে বলে মন্তব্য করেন তারা।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম জানান, গত দুই বছরে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়ে নানান ধরনের ছাড় ছিল। আগের সময়ে অনেক গ্রাহকের ঋণ মন্দমানে থাকতে পারে। তাদের থেকে মূল আদায় করতে গিয়ে ব্যাংকগুলো কিছুটা সুদ মওকুফ হয়তো করেছে, যার কারণে চলতি বছরের জুনে এর পরিমাণটা বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে কোন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা রয়েছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান নীতিমালা পরিপন্থি উপায়ে সুদ মওকুফ করে থাকে, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এবং একইসঙ্গে গ্রাহকের সুবিধা কর্তন করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় থাকাকালীন ২০১৯ সালে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ মওকুফ করেছে ২ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। কোভিডের বছর, ২০২০ সালে করেছে এক হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা এবং বিদায়ী ২০২১ সালে ব্যাংকগুলো এক হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা ঋণের সুদ মওকুফ করেছে।

এ ব্যাপারে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, গ্রাহকের সার্বিক অবস্থা খারাপ থাকলে এবং দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি রয়েছে, এমন ঋণকে স্বাভাবিক রাখতে ঋণের সুদ মওকুফ করা হয়। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের বাস্তবতার নিরিখে এটি করে থাকে, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি হয়ে থাকে চতুরতার মাধ্যমে। এর ফলে প্রভাবশালী গ্রাহকরা সহজে এই সুবিধার সুযোগ নেয়। এমন কাজ অন্যদের ঋণ পরিশোধে নিরুৎসাহিত করবে, একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর আয় কমাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর চলতি বছরের জুন মাস শেষে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা খেলাপি রয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ২১.৯৩ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা।

সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় কাছাকাছি থাকলেও সুদ মওকুফে এগিয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। চলতি বছরে (এপ্রিল-জুন) সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে ৮২২ কোটি টাকা, এরমধ্যে সুদ মওকুফ হয়েছে ১৯ কোটি টাকা। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে ২ হাজার ২১১ কোটি টাকা, অথচ তারা সুদ মওকুফ করেছে ২ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মে মাসে ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে জানায়, ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ মওকুফ করতে পারবে। তবে জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের সুদ এবং মূল মওকুফ করা যাবে না। একইসঙ্গে, ঋণের সুদ মওকুফ অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে।

এদিকে চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংকগুলো। আগের প্রান্তিক, মার্চে ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে পুনঃতফসিলের পরিমাণ বেড়েছে ৬৪ শতাংশ। প্রায় দুই মাস আগে, জুলাইতে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদেরও একই ক্ষমতা দেয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে আরো দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৫২৯ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ হয়েছে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে। একই সময়ে লিখিত ঋণ আদায় হয়েছে ২০৭ কোটি টাকা। এছাড়া চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে ৬ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা ব্যাংকিং খাতে খেলাপি হয়েছে। তবে, এ সময়ে আদায় হয়েছে মাত্র এক হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ অবলোপন ও খেলাপি বৃদ্ধির মার্চের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর কারণ জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে। চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে দেখা যায়, সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অবলোপনকৃত ঋণ থেকে আদায়ের হারে অগ্রগতি হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ঋণ আবলোপন করা হয়েছে ৫৪৪ কোটি টাকা। একই সময়ে আদায় হয়েছে ৩৫৭ কোটি টাকা। তবে জুন প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এই তিন মাসে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। একই সময়ে আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়