মোবাইল ফোন না দেয়ায় খুন হন চিকিৎসক বুলবুল

আগের সংবাদ

নওগাঁয় মন্দিরে আগুন, মূর্তি ভাঙার অভিযোগ

পরের সংবাদ

স্বামী অনুরাগে উজ্জ্বল ধ্রুবতারা ২ মহারানি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২ , ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২ , ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ

ব্রিটিশ রাজপরিবার নিয়ে রয়েছে অনেক রোমাঞ্চ আর প্রেমকাহিনী। এত কাহিনী গ্রিক পুরাণ বা রোম সামাজ্যের অন্যকোনো রাজপরিবার নিয়ে শোনা যায়নি। অন্য রাজপরিবারে অনেক মুখরোচক গল্প, স্বার্থপরতা, দ্বন্দ্ব সংঘাত হত্যা, ষড়যন্ত্র ও অন্তর্ঘাতের কাহিনীর জন্ম হলেও একমাত্র ব্রিটিশ রাজপরিবারেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নারীদের নিয়ে পরকীয়া, গোপন যৌনতা কিংবা অবাধ মেলামেশার গল্প শোনা যায়নি। বিশেষ করে রানিদের পরিমার্জিত আভিজাত্যপূর্ণ রোমাঞ্চকর জীবন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছে আধুনিক বিশ্ব। ব্যতিক্রমী যে কয়েকটা প্রেমের কাহিনী সামনে এসেছে সেই সদস্যদের উচ্চ অহঙ্কার আর আভিজাত্যের কৌশলে রাজপরিবার থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। প্রিন্স হ্যারি তার সর্বশেষ উদাহরণ।

এ রাজপরিবারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো নারীদের স্বামীভক্তি বা স্বামীপ্রেম। আজ পর্যন্ত রাজপরিবারের নারীদের স্বামীর বাইরে বা প্রিন্সেসদের জীবনে অনৈতিক কোনো স্ক্যান্ডাল ব্রিটেনের এমনকি বিশ্বের কোথাও শোনা যায়নি। বরং স্বামীদের প্রতি গভীর অনুরাগ আর ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর প্রেমের উদাহরণ হয়ে আছেন সমসাময়িক দুই মহারানি। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পঞ্চম পূর্বসূরি মহারানি ভিক্টোরিয়া সে সময়ের জীবনধারায় অনেক বেশি ইচ্ছামতো বেপরোয়া জীবনের সুযোগ থাকলেও তিনি তার স্বামীর প্রেমে অন্ধ ছিলেন। বরং রানির সীমাহীন ভালোবাসায় স্বামীর অগোছালো জীবনে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। যে কারণে মৃত্যুর আগেই বলে গিয়েছিলেন স্বামীর দেয়া আংটি পরিয়ে যেন রানিকে সমাহিত করা হয়। তাই দেখা যায় সমাহিত করার সময় রানির হাতের সবগুলো আঙুলেই স্বামীর দেয়া স্বর্ণের আংটি পরিয়ে দেয়া হয়েছিল। গলায় পরিয়ে দেয়া হয়েছিল স্বর্ণের নেকলেস এবং হাতে ব্রেসলেট। এছাড়া স্বামীর আলিঙ্গনে মরতে চান বলে মৃত স্বামীর হাতের আদলে তৈরি একটি নকল হাতও আগলে ধরে কবরে সমাহিত হন।

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ আধুনিক যুগের রানি ছিলেন। এ যুগের মিডিয়ার বাইরে বিশ্বের কোনো অন্দরমহল নেই। পশ্চিমা দুনিয়ার সূত্র ও গোপন ভিজিল্যান্স থেকে বাইরে ছিল না ব্রিটেনের রানি ও রাজপরিবার। তারাও সন্দেহের পরমাণু খোঁজে পায়নি রানির অনৈতিক রোমাঞ্চ বা অসংলগ্ন কোনো সম্পর্ক নিয়ে। বরং স্বামী প্রেমের ও স্বামীর প্রতি সীমাহীন ভক্তির উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রইলেন তিনি আধুনিক নারী স্বাধীনতা যুগের ব্রিটিশ সমাজে।

রানি মারা যাবার মাত্র এক বছর আগেই মারা গেছেন স্বামী ফিলিপ্স। তখন থেকেই রানি যেন সহমরণের অপেক্ষায় ছিলেন। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার। কবরস্থানের স্থান সংকুলান হবে না জেনে আপন বোন মার্গারেটকে অন্যত্র সমাহিত করে স্বামীর জন্য জায়গা রেখেছিলেন সমাধিস্থলে। স্বামীর পাশেই নিজের কবরের কাজ তখন থেকেই শুরু করেছিলেন। তিনি যেন অগ্রিম জানতেন নিজের মৃত্যুর দিনক্ষণ। শুধু প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য একটি বছর সময় নিলেন। তাই পাঁচ বছর আগেই করলের ৭৫ বছর পূর্তি উৎসব। প্রিয় প্রাসাদের প্রথম জীবনের রোমাঞ্চকর স্মৃতিগুলোকে মন্থন করার জন্যেই স্কটল্যান্ড গিয়েছিলেন আর সেখানেই মৃত্যুবরণ করলেন।

তিনিও রানি ভিক্টোরিয়ার মতোই স্বামীর দেয়া আংটি এবং নেকলেস পরে বিদায় নিলেন এবং সমাধিস্থ হলেন। এমনকি বিয়ের স্থবকটিকেই শোকের স্থবকে রূপান্তরিত করে গেলেন। এনগেজমেন্টের সময়ে যে ফুলের তোড়া রানির হাতে তুলে দিয়েছিলেন স্বামী ফিলিপ, সেই ফুলের ডাটা থেকে লাগানো গাছ দীর্ঘদিন সযতনে বাগানে পরিচর্যা করেছিলেন। আর সেই ফুলের তোড়া তার মরদেহে রাখা হয়েছে সমাহিত করার আগে পর্যন্ত। যেন স্বামীর শরীরের গন্ধ নিতে নিতেই সমাধিস্থ হলেন।

দ্য রয়্যাল ফ্যামিলি চ্যানেল সূত্র অনুযায়ী, বিশ্বের মানুষ দেখল বিশ্বের সবচেয়ে বড় যে ঘটনাটি। শেষকৃত্য আনুষ্ঠানিকতার পর ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরে রানির জন্মস্থান উইসর ক্যাসেলে নিয়ে যাওয়া হয় মরদেহ। নৌবাহিনীর যে মহিলা অফিসাররা কফিন টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের ২০ বছর ধরে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। এই যাত্রায় রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ মানুষ কফিনে ফুল ছিটিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। উইসর ক্যাসেলের কিং জর্জ-৬ মেমোরিয়েল চ্যাপেলে সমাহিত করা হয়। বিস্ময়কর ছিল যা, তা হলো- গত বছর কোভিডের সময় স্বামী প্রিন্স ফিলিপ মারা গেলে তার লাশ একটি বিশেষ জায়গায় রাজকীয় ভল্টে রাখা হয়েছিল রানির ইচ্ছাতেই। গতকাল রানিকে সমাহিত করার আগে প্রয়াত স্বামী প্রিন্স ফিলিপের লাশ ভল্ট থেকে বের করে তার পাশে শায়িত করা হয়। আগে সায়িত করা হয় রাজার মরদেহ। তারপরে রানি। পাশাপাশি। যেন এক মাটির পালঙ্কে শুয়ে আছেন রাজারানি।

এর পাশে আছে প্র?য়াত রানির মা বাবা এবং অন্য ভাইবোনেরা। অবশ্য বোন মার্গারেটের মরদেহ কবরে সমাহিত করা হয়নি। কারণ তার মৃত্যুর সময় সেখানে পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। তার ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ জ্বালিয়ে ছাই বানিয়ে সেগুলো সেখানে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সেখানে কবরের জায়গা প্রশস্ত করেন।

ব্রিটেনের এই দুই রানির মহাবিদায় অবিস্মরণীয় হয়ে থাকলেও আধুনিক যুগের প্রেমের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন স্বামীর প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে। অমরত্বের ইতিহাসে উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলবেন প্রণয়ের আকাশে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়