শেখ হাসিনার ভারত সফর ও বিএনপির পুরনো বুলি

আগের সংবাদ

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা : বিচার প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে হবে

পরের সংবাদ

হঠাৎ ‘হিজরত’ আর ‘বিদেশি পোশাক’ নিয়ে নেপথ্যের রহস্য কী?

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২২ , ১:৪১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২২ , ১:৪১ পূর্বাহ্ণ

সম্প্রতি কয়েকটি খবর গণমাধ্যমের কল্যাণে সবার জানার সুযোগ হয়েছে। খবরগুলো মনে হয় বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত; তবে বাংলাদেশের ঘনঘটার রাজনীতিতে অনেক ঘটনাই চাপা পড়ে যায়। কিন্তু এর অনেকই মিলিয়ে যাওয়ার নয় বরং তা সময় সুযোগমতো বেশ বড় ধরনের ঝাঁকুনি দেয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। তখন অনেকেই অতীত খোঁজাখুঁজির চেষ্টা করেন। দেখা যায় খুব বেশি অতীতে যেতে হয় না, নিকট অতীতে এদের আলামতগুলো সবার জ্ঞাত এবং অজ্ঞাতসারে তারা তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছিল। সচেতন রাজনৈতিক মহল অনেক সময় সেটি বুঝতে বা ধরতে পারেনি। একসময় যখন জঙ্গিরা একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চলছিল, তখন অনেকেই এটিকে নিছক রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেছিল। পরে দেখা গেল এরা ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর ছোট ছোট সুসংগঠিত গ্রুপ। যারা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের আদর্শকে মোটেও বরদাস্ত করতে চায়নি তারাই প্রশিক্ষিত হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপনে তরুণদের মধ্যে জঙ্গিবাদের মতাদর্শগত ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছিল। ২০০১ সালের পরে তো সেটি আর গোপন থাকেনি।
আবার ২০১১-১২ সালের দিকে এই গোষ্ঠীগুলো গোপনে গোপনে তৎপর হতে থাকে বিভিন্ন জায়গায়, তারা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। একপর্যায়ে তারা অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দির, পুরোহিতদের হত্যা করতে একের পর এক গোপন অভিযান চালাতে থাকে, তাদের হাতে অনেকেই নিহত হন। এরপর হলি আর্টিজানে তাদের ভয়ংকর রূপটি প্রকাশ হয়ে পড়ে। সেই সময় একের পর এক আস্তানা গেড়ে নতুন নতুন টার্গেট পূরণে তারা বোমাবাজি ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলছিল। এটি ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের চূড়ান্ত অভিযান, সেই অভিযানে বিদেশ থেকে অনেকেই অর্থ এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে উঠতি তরুণদের জঙ্গিবাদী পথে নামিয়েছিল। এদের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল মরলে বেহেশত, বাঁচলে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে তারা অনেক সুখে-শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ পাবে।
আমাদের খুব নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার নয়, সেই জঙ্গিবাদের বিস্তারকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট প্রশিক্ষণ পড়াশোনা এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে ধরা ও দমন করার একটি পর্যায়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। বলা হয়েছিল জঙ্গিবাদের উত্থানকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা গেছে কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, এদের নির্মূল করা আমাদের মতো সমাজে মোটেও খুব একটা সহজ কাজ নয়। তাছাড়া দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা গোষ্ঠী এখনো ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে উঠতি তরুণদের একাংশকে তাদের খুব কাছাকাছি নেয়ার চেষ্টা করেই চলছে। যেহেতু আমাদের সমাজে ধর্মের প্রভাব অনেক বেশি তাই অপপ্রয়োগেরও সুযোগ নীরবে অনেকেই নিয়ে থাকে। ছোটকাল থেকে অনেক কিশোর এবং উঠতি তরুণ এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে মেলামেশা ও সংশ্রবে এসে অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়। তাদের বয়স, লেখাপড়া, অভিজ্ঞতা এবং মেলামেশার নানা সীমাবদ্ধতা থাকে, এসব সীমাবদ্ধতাকে ব্যবহার করেই একটি গোষ্ঠী কিশোর এবং তরুণদের বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজের বিরুদ্ধে মানসিকভাবে প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। ধর্মের নামেই এ প্রশিক্ষণ দেয়ার কারণে অনেক কিশোর ও তরুণ একবার যখন তাদের আলিঙ্গন গ্রহণ করে তখন তা থেকে ফিরে আসা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি তারা তখন পিতা-মাতাকেও আর তাদের জীবনের জন্য প্রয়োজন মনে করে না। এটি হচ্ছে কচি মনের ওপর প্রভাব ফেলার একটি জটিল অভিঘাত, সেই অভিঘাতটি কতটা নির্মম এবং নিষ্ঠুর হতে পারে তা বিভিন্ন বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত থাকা হত্যাকাণ্ডের অভিজ্ঞতা থেকে কমবেশি জানা গেছে।
হলি আর্টিজানের ঘটনা সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্ররা এমন নিষ্ঠুরভাবে মানুষকে হত্যা করতে পারে সেটি ভাবাই এক দুঃস্বপ্নের বিষয়। অথচ মধ্য এবং উচ্চবিত্তের ঘরে ইংরেজি মাধ্যমে পড়–য়া বেশকিছু শিক্ষার্থী ইসলামী বিপ্লব ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে অন্যদের হত্যা করেছে, নিজেরাও নিহত হয়েছে, পিতা-মাতাকে ভয়ানক এক কষ্টের জীবনে ফেলে রেখে গেছে। এমন অপশিক্ষা মোটেও প্রত্যাশিত না হলেও আমাদের সমাজে এর যথেষ্ট উদাহরণ নিকট অতীতে আমরা দেখতে পেয়েছি।
সম্প্রতি কুমিল্লা থেকে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া কয়েকজন শিক্ষার্থী পরিবারকে অন্ধকারে রেখে তাদের ‘গুরুজনের’ নির্দেশে আকস্মিকভাবে তারা ‘হিজরত’ এর নামে নিজেদের উধাও করেছে। এ ধরনের উধাও অতীতের হিজরতিরাও করেছে, এরপর বুঝা গেছে তাদের হিজরতের দৌড় কত দূর। তারা কোথায় লুকিয়ে ছিল, কী করেছিল এবং শেষে কীভাবে নিজেদের প্রকাশ ঘটিয়েছিল। এরাও সেই একই পথে হিজরতি, তবে এদের সংখ্যা এ দলে হয়তো সাতজনের কথা আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু আরো কোনো কোনো অঞ্চলে এমন নিখোঁজ হওয়ার কিছু কিছু ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে, আবার নিখোঁজ না হয়েও অনেকেই একই উদ্দেশ্যে সংগঠিত হচ্ছে এমন ধারণাও পাওয়া যাচ্ছে। বুঝাই যাচ্ছে বর্তমান রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা অভিভাবকদের অজান্তেই চলছে। তাতে কেউ বা সরাসরি ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ‘হিজরত’ করছে আবার কেউবা ‘হিজরত’ না করেও নিজেদের তৈরি করছে। এর বাইরেও বিরাট একটি অংশ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থী নিজেদের অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সরকার এবং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নিজেদের অজান্তেই নিয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া শিক্ষা জীবনেই ঘুরতে দেখা যায়; যে কারণে অনেককেই দেখা যায় জাতিরাষ্ট্র, অসাম্প্রদায়িক-সংস্কৃতি এবং সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের অন্ধ অবস্থান বেশ পাকাপোক্ত হয়ে আছে। এছাড়া সমাজ, রাজনীতি, প্রশাসন ও কর্মক্ষেত্রসহ সর্বত্র এসব মতাদর্শের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি অবশ্য নতুন নয়, পাকিস্তান আমলে যেমন ঘটেছিল বাংলাদেশের আমলেও ’৭৫-পরবর্তীকালে ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে বিভ্রান্তির প্রভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম-বেশি চলেই আসছে। এই প্রভাব ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। সে কারণে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বাহাত্তরের সংবিধান এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভাবাদর্শ নিয়ে। নানা ধরনের বিভাজন, বিভ্রান্তি এবং অসচেতনতা গড়ে উঠেছে। এদেরই কেউ কেউ আন্তর্জাতিক নানা উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর প্রচার-প্রচারণায় বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং ধর্ম রাষ্ট্র ও বিশ্ব ব্যবস্থার কল্পনায় আপ্লুত হচ্ছে। সে কারণে অনেকেই দেশ ছেড়ে একসময় আইএস এ যোগদান করে নিজেদের ‘উৎসর্গ’ করেছিল। আবার উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ এবং পেশাদার ব্যক্তিও আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়াসহ আরো অনেক দেশে এভাবেই নিজেদের উৎসর্গ করতে দেশ ছেড়েছিল। আবার আরেকটি অংশ দেশের অভ্যন্তরেই সেই ‘ইসলামী’ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য হত্যা, বোমাবাজি, সন্ত্রাস এবং নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠায় নিজেদের যুক্ত করেছে। আরেকটি অপেক্ষাকৃত বড় অংশ বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার মতাদর্শগত অবস্থানে যুক্ত হয়েছেও; যারা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে সব সময়ই প্রত্যাখ্যান করেছিল। এদের সবার মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় অবস্থান করেছে, সে কারণে তাদের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে আবর্তিত হচ্ছে।
সম্প্রতি কয়েকটি প্রথম সারির অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রছাত্রীদের ছোট ছোট গ্রুপ ব্যানারসহ বিদেশি পোশাক ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। তাদের নিজেদের পোশাক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কেননা তারা বাঙালি পোশাক বা বাংলা সংস্কৃতির পক্ষে দাঁড়ায়নি বরং একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর একটি রেল স্টেশনে হয়রানি হওয়ার শিকার হওয়ার বিষয়টিকে তারা সমর্থন জানিয়ে যুগপৎ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই অবস্থান ব্যক্ত করতে নিজেদের হঠাৎ দৃশ্যমান করে আবার উধাও হয়ে গেছে। এর মাধ্যমে তারা যে বিষয়টি জানান দিয়ে গেছে তা হচ্ছে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাদের লালিত মতাদর্শগত অবস্থান। এটিই শেষ বিচারে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশের জানান দেয়া। তাদের সঙ্গে কারা কারা ছিল বা আছে সেটা বড় কথা নয়, তবে বুঝা যাচ্ছে এরা যথেষ্ট সংগঠিত, তৎপরও। সে কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, কুষ্টিয়া, নর্থ সাউথ, শাহজালালসহ আরো বেশকিছু উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। এসব তৎপরতার পেছনে যারা রয়েছেন তারা হয়তো প্রকাশ্যে আসছে না কিন্তু তরুণদের ব্যবহারকারীরা এভাবেই নিজেদের আড়ালে রাখে।
সামনে নির্বাচন। রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ এবং সমীকরণ ঘটে চলছে। ওই কিশোর-তরুণদের ব্যবহারেও নানা হিসাব-নিকাশ কারো না কারো নেপথ্যে অবশ্যই রয়েছে। কেননা হিজরতকারী বলুক অথবা আকস্মিকভাবে ব্যানারধারী বলুক তাদের পেছনের রিমোট কন্ট্রোল নিশ্চয়ই বেশি দূরে নয়। এসবই কিছু-না-কিছু সংকেত দিয়ে যাচ্ছে, যা আগামী দিনগুলোতে কোথাও না কোথাও সংঘবদ্ধ হয়ে প্রকাশ ঘটাবে। হয়তো আমাদের দেখতে হতে পারে। কারণ আমরা এক ভয়ানক জটিল কঠিন এবং আস্থাহীনতার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মধ্যে বসবাস করছি। এখানে কে যে কার ক্রীড়নক ও পুতুল, হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে তা বলা মোটেও সহজ নয়। বিশেষত কিশোর-তরুণদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। সুতরাং আমাদের সচেতন রাজনীতির সংস্কৃতি ও শিক্ষার বোদ্ধাদের বিষয়গুলো এখনই নজরে আনার কোনো বিকল্প নেই। কথায় বলে সময়ের এক ঘা অসময়ের দশ ঘা বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখতে হবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়