‘ভোটের আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ’

আগের সংবাদ

কুলাউড়ায় দেড় শতাধিক পান গাছ কাটল দুষ্কৃতকারীরা

পরের সংবাদ

শিল্পকলা একাডেমি-গীতিকবি সংঘ’র স্মরণ

বাংলা গানের মাঝেই বেঁচে থাকবেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২২ , ১০:০২ অপরাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২২ , ১০:০৫ অপরাহ্ণ

বিষয়বস্তুর কথা শুনে দ্রুত প্রাসঙ্গিক গান লিখতে পারতেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। শিল্প-সংস্কৃতির মানুষদের কাছে তিনি ছিলেন পিতা ও বড় ভাইয়ের মতো অভিভাবকতুল্য। অত্যন্ত রসিক, ভদ্র, উদার ও বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন তিনি। বিভিন্ন শিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও কলাকুশলীদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি করে ফেলতে পারতেন দ্রুত। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাংলা গান বেচে থাকবে ততদিন গাজী মাজহারুল আনোয়ার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেচে থাকবেন তার বিপুল সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও গীতিকবি সংঘের যৌথ আয়োজনে রবিবার বিকালে জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে কিংবদন্তি গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের স্মরণসভায় এভাবেই তাকে স্মরণ করেন সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের ব্যক্তিত্বরা।

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে স্মরণসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও স¤প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের স্ত্রী জোহরা গাজী ও বরেণ্য গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন গীতিকবি সংঘের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লিটন অধিকারী রিন্টু। স্বাগত বক্তব্য দেন গীতিকবি সংঘের সাধারণ সম্পাদক আসিফ ইকবাল।

স্মৃতিচারণ করেন সুরকার শেখ সাদী খান, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ছোট বোন নাহিদ আকতার নাসরিন, মেয়ে দিঠি আনোয়ার, শিল্পী খুরশিদ আলম, রফিকুল ইসলাম, আবিদা সুলতানা, কুমার বিশ^জিৎ, নকিব খান, মনির খান, গীতিকবি সংঘের ভাইস-প্রেসিডেন্ট গোলাম মোরশেদ খান, সুরকার রিপন খান, গীতিকার জুলফিকার রাসেল, গাজী আবদুল হাকিম, গীতিকবি সংঘের আজীবন সদস্য খন্দকার রকিবুল আলম, মনিরুজ্জামান মনির প্রমুখ।

এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে মাজহারুল আনোয়ারের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. হাছান মাহমুদ বলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের মৃত্যুটা আমার কাছে একেবারেই অনাকাঙ্খিত ছিল। তার ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’ শুনলে এখনও আনমনা হয়ে পড়ি। অতীত তো বটেই ভবিষ্যতের গীতিকারদের মাঝেও তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

মন্ত্রী বলেন, তার গানগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। কাজটি তার পরিবার ও বন্ধুবান্ধবকেই প্রাথমিকভাবে করতে হবে। ফিল্ম আর্কাইভ বিভাগও কাজটি করতে পারে। শুধু গান নয় চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। যতদিন বাংলা গান থাকবে ততদিন তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। আমরা তার কথাগুলো সংরক্ষণ করবো।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বলেন, ধর্মগ্রন্থের পর সঙ্গীতের চেয়ে বড় আমার কাছে কিছু নেই। বিশ হাজারের বেশি কবিতা যিনি লিখেছেন তার স্থান আমার কাছে কোথায় তা সহজেই অনুমেয়। তিনি শুধু গীতিকবিই ছিলেন না, চারণ কবির চেয়েও দ্রুততায় তিনি স্নাত হতে পারতেন। তাকে ভালো না বেসে পারা যায় না, ভুলে থাকা যায় না এমন মানুষ তিনি। তাকে চর্চার মধ্যে রাখলে কখনো মনে হবে না বাংলাদেশের বাংলা গান নিঃস্ব। বাংলাদেশের প্রকৃতি তার গানে কথা বলে। তাকে চর্চা করলে আমাদের অতীত গৌরব ও শেকড় সম্বন্ধে দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি হবে। তাকে লালন করলে বাংলা গান আরো অগ্রসর হবে। আমরা তাকে চিরদিন মনে রাখবো।

লিয়াকত আলী লাকী বলেন, আমার মনে হয় প্রয়াণের মধ্য দিয়ে গাজী ভাইয়ের আরেকটা জীবন শুরু হলো। তার এই জীবনে আমাদের দায়িত্ব অনেক। পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থে হলেও তার গানগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। তার কাব্যের যে ব্যঞ্জণা তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হতে পারে। গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে নিয়ে আমরা একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করবো।

আসিফ ইকবাল বলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার হলেন বাংলাদেশের কালজয়ী গীতিকবি। গীতিকবিরা সচরাচর একা থাকতে পছন্দ করেন। নিজের সৃষ্টি নিয়ে মগ্ন থাকেন। আমরা যারা গীতিকবিতা লিখছি তাদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি হাতে কলম তুলে নিয়েছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় হাতে কলম তুলে নেয়াকে তিনি কর্তব্য মনে করেছিলেন, এ কথা বলে গেছেন নিজেই।

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের একমাত্র কন্যা দিঠি আনোয়ার বলেন, বাবার জীবদ্দশায় কোনো অপূর্ণতা ছিল না। বাবা ৭৯ বছরে চলে গেছেন কিন্তু এর মাঝে ৬০টি বছরই তিনি চলচ্চিত্র ও বাংলা সঙ্গীতকে দিয়ে গেছেন। বাবার সবগুলো গান এখনও সংরক্ষণ করা যায়নি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাত্র ছয়-সাতশ গান সংগ্রহ করা গেছে। সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এটি আসলে সম্ভব করা খুব কঠিন। সঙ্গীতে বাবার যে অবদান তা পাঠ্যপুস্তকে আনতে পারলে ভালো হতো।

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সহধর্মীনী জোহরা গাজী বলেন, গাজী মাজহারুল আনোয়ার এক ইতিহাসের নাম। তার বিশাল কর্মজীবন। আমি তার একটা ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে গর্বিত। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সৎ, সফল, স্বার্থক, নিরহংকার মানুষ ছিলেন। আমি একটি আগুনের সঙ্গে বসবাস করেছি। প্রতিভার আগুন। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি আগুনটাকে জ্বালিয়ে রাখতে। আজীবন হাতে কলম ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর আগেও গান লিখে গেছেন। তাঁর লেখা সর্বশেষ গানের কলিটি হচ্ছে ‘সব নদীর ঢেউ বন্ধু সমানতালে চলে না।’ দৃশ্যত সে নেই কিন্তু আমার সমস্ত অস্তিত্বজুড়েই সে আছে। আমার অনুভবে বেঁচে থাকবে।

খুরশিদ আলম বলেন, তিনি ছিলেন আমার অভিভাবক, বড় ভাই এবং বন্ধু। আমি আমার বন্ধুকে হারিয়ে ফেললাম। আমােেদর যে সম্পর্ক ছিল, তা আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এমন মহৎপ্রাণ ছিলেন।

রফিকুল আলম বলেন, কেবল সংগীতে নয়, চলচ্চিত্রেও তিনি অবদান রেখে গেছেন। মৌলিক চিন্তা না হলে মৌলিক গান সৃষ্টি হয় না। স্থায়িত্বও হয় না। রসবোধ ও হিউমারাসও ছিলেন।

কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, গাজীভাই জয় বাংলা গানটি লেখার পর অন্য কোনো গান না লিখলেও তার নাম ইতিহাসে থেকে যাবে। তার সৃষ্টিকর্ম প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন টিকে থাকে এজন্য সরকারিভাবে একটি আর্কাইভ করার আহবান জানাই।

নকিব খান বলেন, কিংবদন্তির কোনো মৃত্যু নেই। তিনি আমােেদর মাঝে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন তার অসাধারন সৃষ্টি কর্মের মধ্য দিয়ে।

আবিদা সুলতানা বলেন, গাজী ছিলেন আমাদের অভিভাবক, বড় ভাই। তিনি আমােেদর যেভাবে ভালোবাসতেন তা ছিল বাবার মতোই। স্মৃতিচারণপর্বের শেষে অনুষ্ঠানে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

এমকে

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়