বন্ধুত্ব সুসংহত করার প্রত্যয়

আগের সংবাদ

দুই দেশের ব্যবসায়ীরা ‘সেপা’র অপেক্ষায়

পরের সংবাদ

এএনআইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা

পানিবণ্টনে ভারতকে আরো উদার হওয়ার আহ্বান

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২২ , ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২২ , ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সোমবার চারদিনের ভারত সফরে যাচ্ছেন। এ সফরের আগে ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। সেখানে বাংলাদেশ-ভারতের বিভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, রোহিঙ্গা ইস্যু, চরমপন্থা, ডিজিটাল বাংলাদেশে সজীব ওয়াজেদের জয় অবদান, দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ভ্যাকসিন মৈত্রীসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।

পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের আরো উদারতা দেখানো উচিত মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এটা দুঃখজনক বিষয়। আমরা ভাটির দেশ, পানি আসছে ভারত থেকে। ভারতের আরো বেশি উদারতা দেখানো উচিত। এর থেকে উভয় দেশই উপকৃত হবে। কিছু কিছু সময় আমাদের জনগণ খুব বেশি ভোগে পানির অভাবে। বিশেষ করে তিস্তার পানির অভাবে আমরা চাষাবাদ করতে পারি না, আরও নানান ধরনের সমস্যা হয়। আমি মনে করি, এই সমস্যার সমাধান দ্রুত হয়ে যাওয়া উচিত। আমরা দেখেছি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সমস্যা সমাধানে আগ্রহী, কিন্তু ভারতেই সমস্যাটি রয়ে গেছে। আমরা আশা করি, এর সমাধান হয়ে যাবে। তিনি বলেন, শুধু মাত্র গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি আমরা করেছি। আমাদের আরো ৫৪টি নদী রয়েছে। কাজেই এটা অনেক বড় একটি বিষয় এবং এর সমাধান হওয়া জরুরি। আর এই সমস্যার সমাধান নির্ভর করছে ভারতের উপর।

রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ নেয়া উচিত

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে বাংলাদেশের সরকার প্রধান। শরণার্থীরা বাংলাদেশের জন্য একটি ‘বড় বোঝা’- এই মন্তব্য করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ভারত একটি বিশাল দেশ; তারা রোহিঙ্গাদের থাকার জায়গার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হলেও সেখানে খুব বেশি শরণার্থী নেই। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। তাই আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করছি, যে তাদেরও কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত যাতে রোহিঙ্গারা তাদের দেশে ফিরে যেতে পারে।

সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস করবে না : শেখ হাসিনা বলেন, চরমপন্থা শুধুমাত্র আমাদের দেশেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারতসহ অনেক দেশই কট্টরপন্থা প্রত্যক্ষ করেছে সাম্প্রতিককালে। ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদের একটি কারণ হল সোশ্যাল মিডিয়া, আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া খুব খারাপ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে প্রতিটি ধর্মের মানুষ শান্তি এবং সম্প্রীতির আবহে বসবাস করেন বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে সংখ্যালঘুদের উপর কোনো অত্যাচার ঘটলে তার দল এবং প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচারের ঘটনা বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়। তিনি জানান, প্রতিটি দেশেরই এই ব্যাপারে ‘মহানুভবতা’ দেখানো উচিত। নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মুজিব-কন্যা বলেন, বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এখানে বহু ধর্মের মানুষ বাস করেন। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি থাকলেও একটা দুটো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে যায়। অনভিপ্রেত কিছু ঘটলে তাঁর সরকার এবং দল তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ করে। তিনি বলেন, আর পাঁচটা দেশের মতোই বাংলাদেশেও ধর্মীয় উগ্রপন্থা রয়েছে। ভারতেও এই সমস্যা আছে। সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস করবে না। দেশের সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যখন থেকে ক্ষমতায় আছি, তখন থেকে দেশের সংখ্যালঘুদের বলেছি, আপনারা দেশের নাগরিক। আপনারা নিজেদের দেশেই বসবাস করছেন। নিজেদের দুর্বল বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

রাজনীতিতে আসবে কিনা জয়ের নিজের সিদ্ধান্ত : বাংলাদেশে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বিষয়টি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয় বলে মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ডিজিটাল বাংলাদেশে জয়ের অবদানের কথা তুলে ধরে মা প্রধানমন্ত্রী বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরামর্শেই সরকার বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে। জয় দেশের জন্য কাজ করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ, এত সব স্যাটেলাইট, সাবমেরিন কেবল, কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থা জয়ের পরামর্শেই নেয়া হয়েছে। তবে ও কখনোই দল কিংবা মন্ত্রণালয়ে কোনো পদ পাওয়ার কথা ভাবেনি।

জয়ের রাজনীতিতে যোগ দেয়া না দেয়ার সিদ্ধান্তটি একান্তই জয়ের নিজের এবং দেশের জনগণের ওপর নির্ভর করছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেখুন, ও একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ। এ সিদ্ধান্ত ওর ওপর নির্ভর করছে। এক সমাবেশে জয়কে দলীয় একটি পদে দায়িত্ব দেয়ার জন্য কর্মীদের পক্ষ থেকে জোরাল দাবি উঠেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দলীয় সম্মেলনে পর্যন্ত তার জন্য জোরালো দাবি উঠেছিল। তখন আমি ওকে বললাম, মাইক্রোফোনের কাছে যাও এবং বল তুমি কী চাও। ও তাই করল। বলল, আমি এ মুহূর্তে দলে কোনো অবস্থান চাই না। বরং যারা এখানে কাজ করছেন, তাদের এ পদ পাওয়া উচিত। আমি কেন একটা পদ দখল করে রাখব? আমি আমার মায়ের সঙ্গে আছি, দেশের জন্য কাজ করছি ও তাকে সহযোগিতা করছি। আমি তা করে যাব। এভাবেই সে ভাবে। এএনআইয়ের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনে করেন কি না, কর্মীদের চাওয়ার সঙ্গে তার ছেলের সায় দেয়া উচিত। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি জনগণের ওপর নির্ভর করছে।

বাংলাদেশ ‘শ্রীলঙ্কা’ হবে না : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন- কিছু মানুষ এটা বলছে, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাবে, এমন অনেক কিছু। কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, তেমন কিছু হবে না। কারণ, আমরা আমাদের সব উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সময় নিশ্চিত করি- সেখান থেকে কতটা ফেরত পাব এবং জনগণ কীভাবে উপকৃত হবে। শুধু টাকা খরচ করার জন্য কোনো প্রকল্প হাতে নিই না। আমরা টাকা খরচ করব, ঋণ নেব। কিন্তু, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কতটা ফেরত পাব, আমাদের অর্থনীতি কীভাবে এগিয়ে যাবে, জনগণের কী উপকার হবে সেটাতেই আমাদের অগ্রাধিকার। সেভাবেই আমরা আমাদের প্রকল্প নিই। অপ্রয়োজনে কোনো টাকা খরচ করি না। তিনি বলেন, এখনো আমাদের অর্থনীতি অনেক মজবুত। যদিও আমরা করোনা মহামারি মোকাবিলা করেছি, এখন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ চলছে। এগুলোর প্রভাব বাংলাদেশে পড়েছে। ঋণ পরিশোধের হিসাব করলে, বাংলাদেশ সব সময় ঠিক সময়ে ঋণ পরিশোধ করছে। যার ফলে শ্রীলঙ্কার তুলনায় আমাদের ঋণের হার খুবই কম। আমরা আমাদের অর্থনীতি খুবই পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। পরিকল্পিত অর্থনীতির কারণে আমরা শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতিতে পড়ব বলে মনে করি না। এছাড়া করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর আমি জনগণকে সতর্ক করেছি এবং তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করেছি, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। দেশের জনগণকে উৎসাহিত করছি, যত বেশি সম্ভব তারা যেন খাদ্য উৎপাদন করে। আমাদের যেন খাদ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে না হয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ একটি খারাপ প্রভাব ফেলেছে। পুরো বিশ্বই এর কারণে অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে, তেমনি আমরাও পড়েছি।

গরুপাচারের ঘটনা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত : ভারত থেকে আসা গরুর উপর বাংলাদেশ নির্ভর করে না বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গরুপাচারের ঘটনা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। আমি নিশ্চিত করে বলছি, পাচার বন্ধ হবে। এ নিয়ে আলোচনা চলছে। আমি আলোচনা করবও। তবে ভারতকে একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, সীমান্তে গরুপাচার এখন কিছুটা কমেছে। কিন্তু তবু কিছু বিচ্ছিন্ন এখনও ঘটনা ঘটছে। যা বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। এমনকি, দু’দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীই নিজেদের মধ্যে নিয়মিত কথা বলছে বলেও জানিয়েছেন হাসিনা।

‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ প্রকল্পের জন্য নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ : ভ্যাকসিন মৈত্রী প্রকল্পের জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে টিকা দানের যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন, তা খুবই সহযোগিতাপূর্ণ ছিল। এর পাশাপাশি আমরা নিজেদের টাকায় টিকা কিনেছি এবং অন্যান্য দেশও সহযোগিতা করেছে। আমরা আমাদের জনগণকে টিকা নিতে উৎসাহিত করেছি। গ্রামে, এমনকি শহরাঞ্চলেও অনেককে আমি দেখেছি টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। তাদের টিকা নিতে তাড়া দিয়েছি। তাদের বলেছি, এটা জীবন বাঁচাবে। নিঃসন্দেহে ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ একটি ভালো উদ্যোগ। এছাড়া পারস্পরিক সহযোগিতায় যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উদ্ধারসহ বিভিন্ন উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়