বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ : সাধারণ মানুষ সুফল পাবে তো?

আগের সংবাদ

এখনো ফুরায়নি বিএনপির গুরুত্ব

পরের সংবাদ

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ

ইসির পরিকল্পনায় দশ করণীয়

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২২ , ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১, ২০২২ , ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ

মাঠে থাকবে সেনাবাহিনী > ২০২৩ সালের শেষে তফসিল, ২০২৪ সালের শুরু ভোট

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ১০টি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয়ার পরেই সংলাপের মধ্য দিয়ে মূলত তাদের কর্মপরিকল্পনা শুরু করে। এর পরেই ইভিএম নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং এই প্রযুক্তির জন্য নতুন করে পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরি। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার, জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণ, বিধিবিধান অনুসরণ করে ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া, পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন ও নবায়ন কার্যক্রম, নির্বাচনে নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে সেনা বাহিনীকে অন্তর্ভূক্তি করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে এ কর্মপরিকল্পনায়। গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে লাখ লাখ এনআইডি সংশোধনের বিষয়টিও।

ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানা গেছে, এবারের রোডম্যাপটি সময়োপযোগী ও বাস্তবায়নযোগ্য করার জন্য কমিশন কাজ করেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের টার্গেট করে রোডম্যাপ চূড়ান্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ২০২৩ এর নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে তপশিল ঘোষণার পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে এ কর্মপরিকল্পনায়।

এক্ষেত্রে ইসি সচিবালয়কে খসড়া প্রস্তুতের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি জানিয়েছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপকে মূলভিত্তি ধরেই তারা একটি খসড়া প্রণয়ন করবে। কমিশন তার ওপর চূড়ান্ত কর্মপদ্ধতি ঠিক করবে। সংসদ নির্বাচনের পথে ইসির কর্মপরিকল্পনায় একটির মতো বিষয় অগ্রাধিকার পেয়েছে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী ২০২৩ এর নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারীর মধ্যে দ্বাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ইসির একটি কর্ম পরিকল্পনা বা রোড ম্যাপ থাকে। সে অনুযায়ী ইসি তার কাজ এগিয়ে নিতে থাকে। সে জন্য রোডম্যাপের কাজটি আমরা শুরু করে দিয়েছি এবং বেশ এগিয়েও গেছে। হয়তো আগামী মাসের প্রথম দিকে নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রকাশ করতে পারবো।

কর্ম পরিকল্পনায় কি কি গুরুত্ব পেয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি মো. আলমগীর বলেন, মোটামুটি ১০টি বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আমরা এগুচ্ছি। খসড়া পরিকল্পনা ধরে কাজ গোছালেও নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন নিয়ে শিগগির প্রতিটি কাজের ‘সময় কাঠামো’ চূড়ান্ত করবে ইসি সচিবালয়। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা যেটিকে সব চেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি সেটি হলো একটি নির্ভূল ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা। কেননা ভোটার তালিকা নির্ভূল না হলে ভোট সঠিক ও সুষ্ঠু হয় না। সে কাজটি ইতিমধ্যে আমরা শুরু করে দিয়েছি। এর আগে আমরা সমাজের বিশিষ্টজন, দল, সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপ করেছি। সেখান থেকে আমরা প্রচুর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এটি করে ইসি নির্বাচনে দল ও ভোটাররা কি চায় তা জানতে সমর্থ হয়েছে, যা রোডম্যাপ তৈরিতে ইসিকে সহায়তা করেছে।

প্রসঙ্গত, ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়া পাঁচ সদস্যের কমিশন নাগরিক সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, গণমাধ্যম সম্পাদক, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, পর্যবেক্ষকের মতামত ইতোমধ্যে নিয়েছে।

এ বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ জানান, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কমিশন প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছে, যার খসড়াও প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নতুন দলের নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি, ইভিএমের বিষয়ে দলের মতামত ও বাজেট তৈরি, আইনি সংস্কারের পর্যালোচনার মতো বিষয়গুলো চলমান। তিনি বলেন, ভোটকে সামনে রেখে যেসব কাজ রয়েছে, এ লক্ষ্যে আমরা খসড়া একটি তালিকা করেছি। এ নিয়ে কমিশন আরো পর্যালোচনা করে কোন সময়ে কোন কাজ শেষ করতে হবে, তা চূড়ান্ত করবে।

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিুবল আউয়াল জানান, প্রতিটি কমিশন জাতীয় নির্বাচনের আগে তাদের কর্ম পরিকল্পণা তৈরি করে। এটি ইসির একটি রুটিন কাজ। রোডম্যাপ গত সংসদ নির্বাচনের সময়ও করেছিল তৎকালীন কমিশন। এবার আমাদের কাজও চলমান রয়েছে, কমিশন সব বিবেচনা করে এবারের খসড়াটি চূড়ান্ত করবে। পরে সময় ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পণা প্রকাশ করা হবে। সে অনুযায়ী ইসি জাতীয়সহ অন্য নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করবে।

আগামী বছর নভেম্বর থেকে পরের বছর জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়রি একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সেক্ষেত্রে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন শেষ করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, আগামী বছর নভেম্বরে-ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণার সম্ভাব্য সময় ধরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব ধরনের কাজ শেষ করার রূপরেখা থাকবে এ কর্মপরিকল্পনায়। এছাড়া সামনে জেলাপরিষদ নির্বাচন ছাড়াও স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়েও রোডম্যাপে উল্লেখ থাকবে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আহসান হাবিব খান বলেন, খসড়া রোডম্যাপটি বাস্তবভিত্তিক করার জন্য কমিশন বসে সিদ্ধান্ত নেবে। বিশেষ করে সবদলের অংশগ্রহণে আগামীতে কীভাবে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেই বিষয়ের ওপর অধিক গুরুত্ব থাকবে। তবে এবার গতানুগতিক কোনো রোডম্যাপ হবে না। বাস্তবভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন করে তার সফলতাই মূল লক্ষ্য। আমাদের লক্ষ্য জাতিকে একটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়া।

অগ্রাধিকার যে ১০ বিষয়ে : ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের কর্ম পরিকল্পণায় মোটামুটি ১০টি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রথমত : নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন, যা চলমান। দ্বিতীয়ত : আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার। তৃতীয়ত : নির্বাচন প্রক্রিয়া সময়োপযোগী করতে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ নেয়া। চতুর্থত : সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ, কেননা সম্প্রতি শেষ হওয়া জনসংখ্যা জরিপে দেখা গেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশ কিছু সংসদীয় আসনের ভোটার কমবেশি তারতম্য চোখে পড়ার মতো। অনেক আসনে পাশের আসনের প্রায় দ্বিগুনেরও বেশি ভোটার রয়েছে। এর জন্য ইসি ইতোমধ্যে ডিসিদের সংসদীয় আসনের ভোটার সংখ্যা জানাতে চিঠি দিয়েছে। এগুলো পেলে সীমানা পুনর্বিন্যাস কাজ শুরু হবে। তবে ঢাকা জেলায় ২০টি আসনের মধ্যে কয়েকটি আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। পঞ্চমত : বিধিবিধান অনুসরণ করে ভোটকেন্দ্র স্থাপন। ষষ্টত : নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন ও নিবন্ধিত দলের নিরীক্ষা। সপ্তমত : সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসি সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যক্রম, যাতে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া যায়। অষ্টমত : নির্বাচনে অধিকতর প্রযুক্তির ব্যবহার (ইভিএমের ব্যবহার ও তার জন্য প্রকল্প নেয়ার কাজ, যা চলতি বছরের মধ্যে শেষ করতে চায় ইসি। নবম : ইভিএমে ভোটের ক্ষেত্রে সংসদীয় আসন নির্বাচনের পদ্ধতি নির্ধারন, ভোটার ও ভোট কর্মীদের প্রশিক্ষণ, যা আগামী বছরের প্রথম থেকে শুরু করা হবে। দশম : পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন ও নবায়ন কার্যক্রম।

এই কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে ইসি আবারো সমাজের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পণা করছে। পরিকল্পনা রয়েছে দেশী বিদেশী পর্যবেক্ষক, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সঙ্গে মতবিনিময়ের। আর এসব কাজ ইসি দ্রুত শেষ করতে চায়, যাতে সব দলও ভোটারদের আস্থা অর্জনে ইসি সক্ষম হয়।

আর এবারে কমিশন আরো একটি বিশেষ বিষয়ে মনোযোগী হচ্ছে। সেটি হলো : প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়, একাধিকবার তাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা হবে যে, ভোটে হার জিত মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।

এরপরে ধাপে ধাপে সব কাজ শেষ করার পরে নির্বাচনের বাজেট, ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করা, ভোট কর্মীদের তালিকা তৈরি, নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ, দেশি-বিদেশি সংস্থা ও দলের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রচার কাজের বিষয়েও রোডম্যাপে থাকবে বলে জানান ইসি কর্মকর্তারা।

এজন্য সিইসির নেতৃত্বে অন্য চার কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আহসান হাবিব খান, (ইভিএম ও এনআইডি বিষয় ও দলগুলোর সমর্থন), রাশেদা সুলতানা এমিলি (আইন সংস্কার), মো. আলমগীর (সীমানা পূণ নির্ধারন) ও আনিছুর রহমান (ভোটার তালিকা, নতুন দল নিবন্ধন)। সিইসিসহ চার জন কমিশনার ছাড়া ইসি সচিব, ইসির অতিরিক্ত সচিবসহ ঊর্ধ্বকর্মকর্তাদের এলাকাভিত্তিক (বিভাগীয়) দায়িত্ব দেয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, কে এম নূরুল হুদার কমিশন ২০১৭ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরি করেছিলেন। সেসময় আইন সংস্কার, সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ, নতুন দল নিবন্ধন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সংলাপ ও দক্ষতা বাড়ানোসহ ৭টি বিষয় রোডম্যাপে রেখেছিলেন তারা।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়