গণভবনের দিকে তাকিয়ে চা শ্রমিকরা, বিকেলে বৈঠক

আগের সংবাদ

মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় বিএনপি

পরের সংবাদ

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, না আদিবাসী- এই বিতর্কের শেষ কোথায়

প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২২ , ৮:২৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২৭, ২০২২ , ৮:২৩ পূর্বাহ্ণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ১৯৭২ সালে যে আইএলও (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) কনভেনশন ১০৭ অনুস্বাক্ষর করে গেছে, সেখানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করে তাদের সব অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের ২৮ (ক) ধারায় একাধিকবার ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০৯ সালে আদিবাসী দিবস উপলক্ষে দেয়া বাণীতে আদিবাসীদের নিজস্ব পরিচয়ে সব অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর পর সংবিধানের কোথাও ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। আদিবাসীর স্থলে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য সোচ্চার এই জনগোষ্ঠী ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ শব্দগুলোকে বৈষম্য এবং বঞ্চনার প্রতীক হিসেবেই দেখছে। তবে সরকার পক্ষের মতে, দেশের নাগরিক হিসেবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ যাতে তাদের অধিকার পায়, সেটি তারা নিশ্চিত করছে। শিক্ষা এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তাদের বাড়তি সুবিধাও দিচ্ছে সরকার।

সম্প্রতি (১৯ জুলাই) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ছোট ছোট স¤প্রদায় বা গোষ্ঠীকে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃ-গোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পুরনো এই ইস্যুতে নতুন করে ঘি ঢালে প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় অংশে ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত টকশোতে অংশগ্রহণকারীদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করার অনুরোধ। এরপর এই ইস্যুতে দাবি আদায়ে সোচ্চার নৃ-গোষ্ঠী। অন্যদিকে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বহাল রাখার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের বিশিষ্টজনরা।

সংবিধানে কী আছে : ‘আদিবাসী’ নিয়ে বিতর্কের সমাধান দেয়া হয়েছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে। সংবিধানের ৬ এর ২ ধারা মতে, জাতি হিসেবে বাঙালি ও নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি বলে বিবেচিত হবে। এছাড়া বাঙালি ব্যতীত অন্যান্য যারা আছে তারা উপজাতি, নৃ-গোষ্ঠী বলে পরিচিত হবে। সংবিধানের ২৩ (ক) ধারায় রয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও স¤প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’

পঞ্চদশ সংশোধনীর পর থেকেই আদিবাসী শব্দটি নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বির্তক তৈরি হয়।

সরকার পক্ষের মতে, এখানকার মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতি চার হাজার বছরের পুরনো। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সেটিই প্রমাণ করে। অন্যদিকে যাদের আদিবাসী বলা হচ্ছে তারা এখানকার আদি বাসিন্দা নয়। তারা ১৬ শতকে মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসা শুরু করে। তারা হচ্ছে এ ভূখণ্ডের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। অন্যদিকে আদিবাসী হতে হলে কলোনিয়াল কিংবা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কলোনাইজেশন হতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে সে ধরনের কিছুই হয়নি। জাতিসংঘের ২০০৭ সালের ঘোষণাপত্রে ‘আদিবাসীর’ সর্বসম্মত সংজ্ঞাও নেই। অন্যদিকে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তখন তারা কোনো বাধা দেননি।

জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রে ভোট দেয়নি বাংলাদেশ : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে একটি ঘোষণাপত্র অনুমোদিত হয়। ওই ঘোষণাপত্রে ভূমি ও ভূখণ্ডের অধিকার, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি ও ভূখণ্ডের ওপর সামরিক কার্যক্রম বন্ধের অধিকারসহ ১২টি ক্ষেত্রে আদিবাসীদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল জাতিসংঘ। ১৪৪টি দেশ এর পক্ষে ভোট দিয়েছিল। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। পরে এই চারটি দেশ তাদের অবস্থান বদল করে এই ঘোষণাপত্রকে সমর্থন দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ, ভুটান, রাশিয়াসহ ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

‘আদিবাসী’ না ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী : আদিবাসী নাকি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-অধিকার সংরক্ষণ করার ব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি হয়েছিল ২০১৭ সালে। ওই কমিটির প্রধান ছিলেন ইতিহাসবিদ, গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল। কমিটি ‘আদিবাসী’ রাখার পক্ষেই সুপারিশ করেছিল। জানতে চাইলে বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক মেসবাহ কামাল ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ বহু জাতির মানুষ। বাঙালি ছাড়াও ৭৮টি জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে, যা জাতিসংঘের ইন্ডিজিনিয়াস জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যকে পূরণ করে। বাংলাদেশ সরকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলছে, এটি ঠিক নয়। যারা আদিবাসী তাদের আদিবাসীই বলা সঠিক। এই ক্ষুদ্র শব্দটি আপত্তিকর। অন্যদিকে ‘নৃ’ মানে মানুষ। আর গোষ্ঠী তো গোষ্ঠীই। আমরা কাউকে এই নামে কি ডাকতে পারি? তাদের জাতিগত পরিচয় রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সমতলে কয়েকটি জাতিসত্তা আদিবাসী হওয়ার শর্ত পূরণ করেন না, এটি ঠিক। আবার তারা বাঙালিও নয়। তবে সরকার ঢালাওভাবে সবাইকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলছে, এটি ঠিক নয়।

এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের সচিব হামিদা বেগম ভোরের কাগজকে বলেন, সংবিধানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে। এজন্য আমরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীই বলব। সংবিধানের কোন ধারায় আছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান পড়ে দেখেন।

এদিকে বাংলাদেশ সরকারের ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক গেজেটে দেখা যায়, বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০টি। তারা সবাই নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে দাবি করে। সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ভোরের কাগজকে বলেন, আদিবাসী এই অর্থে নয় যে, তারা বাংলাদেশ বা অন্য কোনো স্থানে সবার আগে থেকেই বসবাস করে আসছে। তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যবোধ, বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি সব আলাদা। কিন্তু বাংলাদেশ বলছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। আগে বলা হতো উপজাতি। এটি তো আরো খারাপ। তার মানে এদের সুপিরিয়র কেউ আছে? তিনি বলেন, বাঙালি আগে আসছে নাকি আদিবাসী আগে আসছে এসব নিয়ে তো বিতর্ক নেই। ১৯৪৭ সালের আগে পাহাড়ে আদিবাসীদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল এটি তো সত্য।

সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য সোচ্চার নৃ-গোষ্ঠী : পার্বত্য জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কয়েক দশক ধরে সোচ্চার সঞ্জীব দ্রং। দায়িত্ব পালন করছেন আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, গারোকে গারো বললে সমস্যা নেই। সাঁওতাল বললে সমস্যা নেই। শুধু সমস্যা আদিবাসী বললে। অথচ ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে সংবিধানে কিছুই ছিল না। আগে উপজাতি বলা হতো। কিন্তু কার উপজাতি এটি স্পষ্ট ছিল না। জাতিসংঘ কর্তৃক বলা হচ্ছে ইন্ডিজিনিয়াস। বাংলাদেশ বলছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। কিন্তু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সংবিধানেও নেই। সংবিধানে আছে জাতিসত্তা।

আদিবাসী পরিচয়ের যৌক্তিকতা কী, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের জন্য প্রয়োজন। এটি পরিবর্তন করার কারো কোনো অধিকার নেই। আইনগত অধিকারও নেই। নৈতিক অধিকারও নেই। সরকার পক্ষ বলবে, বাংলাদেশে যারা আছে, তারা হয়তো বাইরে থেকে আসছে। এই পৃথিবীতে প্রথম কে আসছে বা মানুষ কোথা থেকে আসছে- এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারবে না। এই বিতর্ক জাতিসংঘও করে না। যারা প্রান্তিক, যারা ‘নন ডমিনেন্ট’ ভাষা-সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলছে, তারা আদিবাসী। সরকারের একটি অংশ মনে করে আদিবাসী বললে জাতিসংঘের ঘোষণাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এটিকে তারা নেতিবাচকভাবে নিচ্ছে। বিতর্কটা আরোপিত বিতর্ক। আমেরিকাও ২০০৭ সালে জাতিসংঘের ঘোষণায় ভোট দেয়নি। চার বছর পরে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস, সরকার একসময় আমাদের দাবি মেনে নেবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান ভোরের কাগজকে বলেন, জাতিসংঘের ১০৭ ও ১৬৯ ধারা অনুযায়ী আদিবাসী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়া রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের চেয়ে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও রীতিনীতি আলাদা। সেদিক থেকে অবশ্যই আমরা আদিবাসী। কে আগে এসেছে, কে পরে এসেছে- সেটা বিষয় নয়। কিন্তু বর্তমানে ক্ষুদ্র শব্দটি বসিয়ে আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করে দিয়েছে।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়