ভারতে শিশুদের মধ্যে ছড়াচ্ছে ‘টমেটো ফ্লু’

আগের সংবাদ

সংশোধিত খসড়া প্রকাশের আহ্বান সম্পাদক পরিষদের

পরের সংবাদ

‘সমঝোতা’ ভেস্তে গেছে ফের ধর্মঘটে চা শ্রমিকরা

প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২২ , ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২১, ২০২২ , ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ

সরকারবিরোধী চক্রান্তের সন্দেহ শ্রম দপ্তরের

মজুরি বাড়ানো নিয়ে গতকাল শনিবার দিনভর আলোচনার পর বিকালে সমঝোতায় পৌঁছে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা দিলেও কিছুক্ষণ পরই ‘ইউটার্ন’ নিয়েছেন আন্দোলনকারী চা শ্রমিকরা। সন্ধ্যায় চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল জানান, চা শ্রমিকরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এরফলে চা বাগানগুলোতে ধর্মঘট আগের মতোই চলবে। ধর্মঘটের সমর্থনে গত রাতেই প্রায় দেড় ঘণ্টা শ্রীমঙ্গল শহরের চৌমুহনীতে রাস্তার ওপর বসে বিক্ষোভ করেন চা শ্রমিক ও তাদের সন্তানরা। এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের একটি অংশ এবং মনু, ধলাই এবং লষ্করপুর ভ্যালির সাধারণ চা শ্রমিকরা। রাত ৯টায় তারা জানান, আজ রবিবার সকাল ৮টা থেকে শায়েস্তাগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করা হবে।

প্রসঙ্গত, দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে ৯ আগস্ট থেকে টানা আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন দেশের ২৪১টি চা বাগানের প্রায় সোয়া লাখ শ্রমিক। প্রথম চারদিন শ্রমিকরা প্রতিদিন দুই ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেন। তারপর তারা বাগানের কাজে ফেরেন। কিন্তু ১৩ আগস্ট থেকে কাজে না গিয়ে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন শুরু করেন শ্রমিকরা। তারা এ সময় বাগানের সেকশনে এবং রাজপথেও মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার শ্রম অধিদপ্তরের সঙ্গে এবং একবার ঢাকায় মালিকদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হলেও তাতে কোনো ফল আসেনি। ফলে শনিবার টানা ৮ দিনের মতো আন্দোলন ও কর্মবিরতিতে ছিলেন শ্রমিকরা। এতে বাংলাদেশের ১৬৭টি চা বাগানে চা পাতা সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর গতকালের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আশ্বাস ও ২৫ টাকা মজুরি বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানান চা শ্রমিক নেতারা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তারা।

এদিকে চা শ্রমিকদের এমন ইউটার্নে বিষ্মিত শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এর নেপথ্যে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কোনো চক্রান্ত হচ্ছে কিনা- তা নিয়েও সন্দিহান তারা। এই চক্রান্তের পেছনে কারা কারা রয়েছেন তাদের খুঁজে বের করতে পুলিশের সাহায্য নেয়ার কথাও ভাবছে শ্রম দপ্তর।

জানতে চাইলে শ্রম দপ্তরের শ্রীমঙ্গল কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. নাহিদুল ইসলাম গত রাতে ভোরের কাগজকে বলেন, শ্রমিক ইউনিয়নের কিছু লোক পুরো পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েও কেন রাতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন? তারমতে, মোহনরবি দাস নামে এক ছাত্রনেতার পরামর্শে প্রত্যাহারের পরও গতরাত থেকে আন্দোলন শুরু হয়েছে। এখন এটা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চক্রান্ত কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া শ্রমিকদের দাবিমত ৩০০ টাকা মজুরি মালিকদের দেয়ার সক্ষমতা আপাতত নেই বলেও জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেছেন, চা শ্রমিক ইউনিয়নের দুটি অংশ সরকার সমর্থক এবং একটি অংশ সরকারবিরোধী। এই বিরোধী অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চা শ্রমিকদের ছাত্র ও যুব নেতারা। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে মানে না। ফলে চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বের মধ্যে ঘূর্ণিপাক বয়ে যায়। পাশাপাশি রয়েছে চা শ্রমিক ইউনিয়নের আসন্ন ভোটের বিষয়টিও। ভোটকে টার্গেট করে কোনো চা শ্রমিক নেতাই সাধারণ শ্রমিকদের চটাতে চাইছেন না। এরফলে এখন আন্দোলন চলছে মূলত ছাত্র ও যুব নেতাদের নেতৃত্বে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সাধারণ চা শ্রমিকরা।

এর আগে গতকাল শনিবার বিকাল ৩টায় শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে চা শ্রমিক নেতাদের বৈঠকের পর চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবনাকে গ্রহণ করে ও তার সম্মান রক্ষার্থে আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। আমাদের এই সিদ্ধান্ত তৃণমূল পর্যায়ের শ্রমিকদের কাছে চলে যাবে। এরফলে আগামীকাল (আজ) থেকেই তারা কাজে যোগ দেবেন।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর সেই নৃপেন পালই বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু সাধারণ চা শ্রমিকরা এই ২৫ টাকা মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তাই আমরা সম্মিলিতভাবে প্রধানমন্ত্রীকে এই প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন জানাচ্ছি। এর আগে মনু, ধলাই ও লস্করপুর ভ্যালির সভাপতি-সম্পাদকরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, কাল থেকে আমাদের শ্রমিক ধর্মঘট আগের মতোই চলবে।

এদিকে বিকালে নেতাদের পক্ষ থেকে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা আসার পর শ্রম দপ্তরের সামনেই বিক্ষোভ শুরু করেন সাধারণ শ্রমিকরা। তারা ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তারা। এ সময় সমিতির নেতাদের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাধারণ শ্রমিকরা। অঞ্জন গোয়ালা নামে এক শ্রমিক বলেন, আমরা ৩০০ টাকা মজুরির দাবি জানিয়েছি। এখন মাত্র ২৫ টাকা মজুরি বাড়ালে কীভাবে ধর্মঘট প্রত্যাহার করব। এই বাজারে ১৪৫ টাকায় কীভাবে চলব। তিনি আরো বলেন, নেতারা আপস করতে পারেন। কিন্তু আমরা আপস করব না। ধর্মঘট চালিয়ে যাব।

২৫ টাকা মজুরি বাড়ানোর সেই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেন হবিগঞ্জের লস্করপুর ভ্যালির ২৪টি চা-বাগানের শ্রমিক নেতারাও। তারা ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে কর্মবিরতি চালিয়ে যাবেন। সেই সঙ্গে ভ্যালির নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এ বিষয়ে লস্করপুর ভ্যালির সাধারণ সম্পাদক অনুরুদ্ধ বাড়াইক বলেন, চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই ১৪৫ টাকা মজুরিতে স্বাক্ষর করেছে। আমরা এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা আমাদের কর্মবিরতি চালিয়ে যাব।

‘বাংলাদেশ চা কন্যা’ নারী সংগঠনের সভাপতি খায়রুন আক্তার বলেন, আমাদের দালাল নেতারা ১৪৫ টাকা মজুরিতে স্বাক্ষর করেছে। তারা আমাদের কষ্ট কী বুঝবে। আমরা খেয়ে না খেয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছি। এখন তারা আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই ১৪৫ টাকা মজুরিতে স্বাক্ষর করেছে। আমরা এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করছি। সেই সঙ্গে দালাল নেতাদের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানাই।

এদিকে গত আটদিন ধরে চা বাগানগুলোতে প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে ও সেকশনে গজানো হাজার হাজার কেজি কাঁচা চা বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে চা বাগান প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে গত আট দিন কোনো মজুরি না পেয়ে চা বাগান শ্রমিকরাও মানবেতর জীবন-যাপন করছেন বলে জানিয়েছেন চা শ্রমিকরা।

সীতারাম বীন, দয়াশঙ্করসহ কয়েকজন চা-শ্রমিক নেতা বলেন, পরিবারে শিশু সন্তান নিয়ে চা শ্রমিক পরিবার সদস্যরা অনেক কষ্ট ভোগ করছেন। শ্রমিকরাও চা বাগানের ক্ষতি হোক তা চায় না। তবে বর্তমানে জিনিসপত্রের যে পরিমাণ দামবৃদ্ধি পেয়েছে তাতে স্বল্প এই মজুরিতে এক লিটার সয়াবিন তেলও কেনা যাবে না।

ন্যাশনাল টি কোম্পানির পাত্রখোলা চা বাগান ব্যবস্থাপক শামসুল ইসলাম বলেন, চায়ের ভরা মৌসুমে শ্রমিকদের আন্দোলনের ব্যাপক প্রভাব পড়বে। আমার বাগানের সেকশনে যেসব পাতা বড় হয়েছে সেগুলোর কোয়ালিটি বিনষ্ট হয়ে গেছে। এখন সেগুলো কেটে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাছাড়া দৈনিক মজুরির সঙ্গে চা শ্রমিকরা রেশন, চিকিৎসা, গৃহ সুবিধাসহ আরো নানা ধরনের সুবিধা ভোগ করছেন। সেসব বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসা উচিত বলে তিনি দাবি করেন।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়