সামাজিক অপরাধ বেড়েছে

আগের সংবাদ

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিলেন ক্যাসমিরো

পরের সংবাদ

মোমেনের বেফাঁস মন্তব্যে ‘বিব্রত’ সরকার

প্রকাশিত: আগস্ট ২০, ২০২২ , ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২০, ২০২২ , ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ

** ব্যক্তিগত মত, সরকারের নয়: আ.লীগ ** দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে ** জনমনে ভুল বার্তা যাচ্ছে ** মিডিয়ায় বক্তব্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে: মোমেন **

একদিকে কোভিড বিশ্বের বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে উন্নয়ন প্রকল্প অব্যাহত রাখা। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, সার, বিদ্যুৎসহ দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানতে সরকার যখন ব্যতিব্যস্ত, তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অতিকথনে বিব্রত সরকার, বেকায়দায় দল। একের পর এক বেফাঁস মন্তব্যে অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন বিরোধী শিবিরে। এক সপ্তাহ আগেই ‘অন্য দেশের তুলনায় আমরা বেহেশতে আছি’ মন্তব্য করে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। গত বৃহস্পতিবার ‘আমি ভারতে গিয়ে বলেছি, শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে’- মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ব্যক্তিগত অভিমত, সরকার এবং দলের নয়- বলছে ক্ষমতাসীনরা। অন্যদিকে মন্ত্রীর এমন বক্তব্য দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম শহরের জে এম সেন হলে জন্মাষ্টমী উৎসবের অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমি ভারতে গিয়ে বলেছি, শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। শেখ হাসিনা আমাদের আদর্শ। তাকে টিকিয়ে রাখতে পারলে আমাদের দেশ উন্নয়নের দিকে যাবে এবং সত্যিকারের সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক একটা দেশ হবে। শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, আমি ভারতবর্ষের সরকারকে সেটা করতে অনুরোধ করেছি।’

বিএনপির হাতে আন্দোলনের ‘অস্ত্র’ : পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তার এই বক্তব্যকে পুঁজি করে ইতোমধ্যেই মাঠগরমের চেষ্টা করছে বিএনপি। বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকারে পায়ের নিচে মাটি নেই বলেই বেফাঁস বলছে মন্ত্রীরা। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের উদ্দেশে বলেন, বড় বড় কথা বলছেন, সন্ত্রাসীর মতো বক্তব্য ও হুমকি দিচ্ছেন, তখন কেন ভারতের কাছে সরকার টিকিয়ে রাখার আহ্বান জানান? পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দিতে হবে সরকার এবং ভারতকে। তাদের বক্তব্য প্রমাণ করে তারা ভারতের আনুকূল্যে টিকে আছে। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যই দেশের বর্তমান সার্বভৌমত্বের দৈন্য দশার প্রমাণ। শেখ হাসিনার পায়ের নিচে মাটি নেই। এই মন্ত্রী অনেক সময় তার অজান্তেই অনেক সত্য কথা বলে ফেলেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন- ভারত সরকারকে বলেছি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে হবে। অর্থাৎ তাদের মানুষের ওপর আস্থা নেই।

দায় নেবে না আওয়ামী লীগ : পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের দায় নেবে না বলে সাফ জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। তার বক্তব্য ব্যক্তিগত অভিমত বলে দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ভারত বাংলাদেশের বন্ধু হলেও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তাদের অনুরোধ করতে কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দলের বা সরকারের নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে, শেখ হাসিনার সরকারের একজন মন্ত্রী হিসেবে আমি বলতে চাই, ভারত আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। ভারত আমাদের সুসময়ের বন্ধু। একাত্তরের রক্তের বন্ধনে আমরা আবদ্ধ। কিন্তু তাই বলে আমরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতকে অনুরোধ করব- এ ধরনের কোনো অনুরোধ আওয়ামী লীগ করে না, করেনি, শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষ থেকে কাউকে দায়িত্বও দেয়া হয়নি।

মিডিয়ায় বক্তব্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে : মিডিয়ায় তার বক্তব্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। গতকাল শুক্রবার গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো শেষে তিনি বলেন, দেশে সবার বাকস্বাধীনতা রয়েছে। তাই সবাই সব কথা বলতে পারে। এ সময় মিডিয়াকে সহনশীল হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনা সরকারে থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা থাকে। জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। অসাম্প্রদায়িকতা বজায় থাকে। তাই দুই দেশেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তিনি ভারত সরকারের সহায়তা চান।

দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে : বক্তব্য দেয়ার সময় আরেকটু ভেবেচিন্তে কথা বলতে সরকার ও দলের শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এ ধরনের অবান্তর বক্তব্য সরকার ও দলের জন্য ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির ভোরের কাগজকে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনেক সময় অনেক কথা বলেন, পরে আবার বলেন ঠিক এটা বলিনি। এজন্য তিনি কোন প্রেক্ষিতে বলেছেন এটি জানা জরুরি। তিনি ভারতকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার কথা বলতে পারতেন, যৌথ নদীগুলো নিয়ে, তিস্তার পানি নিয়ে, কিংবা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়ে সহযোগিতার কথা বলতেন, তাহলে ঠিক ছিল। কিন্তু তিনি যা বলেছেন, এটি ঠিক নয়। কারণ একটি দেশ আরেকটি দেশকে সহযোগিতা করতে পারে, সরকারকে টিকিয়ে রাখতে নয়। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার ভোরের কাগজকে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দল এবং সরকারের জন্য ক্ষতিকর। কোনোভাবেই স্কোর বাড়বে বলে আমার মনে হয় না। যদি ধরেও নেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কূটনৈতিক পর্যায়ে কোনো আলাপ করে থাকেন, তবুও পাবলিকলি তিনি বলতে পারেন না। এটি আমার কাছে মনে হয়েছে অসঙ্গত। কাদের সামনে বলেছেন এটিও লক্ষণীয়। বাংলাদেশে এমনিতেই উগ্রবাদীরা আওয়ামী লীগকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করে নানারকম অপপ্রচার চালিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। শান্তনু মজুমদার বলেন, জানি না কোন বিবেচনায় এই কথা তিনি বলেছেন। তবে অবশ্যই সরকার ও দলের জন্য বিব্রতকর। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। পররাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে সরকার পরিবর্তন সব কিছুই নিজেরা ঠিক করে। কেউ কাউকে করে দেবে এটি অবান্তর। আর যেখানে আমাদের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলারের দিকে যাচ্ছে, সামনে হয়তো আরো ছাড়িয়ে যাবে, তখন ২০০ ডলার থাকা অবস্থার কথা মানায় না। মেরুদণ্ডের পরিচয় থাকা উচিত। এমন বক্তব্য দেশের ভাবমূর্তির জন্য ভালো নয়। সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা দেবে।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়