নিরাপত্তাহীন নির্মাণের খেসারত

আগের সংবাদ

সিরিজ বোমা হামলা: ১৭ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

পরের সংবাদ

পুরান ঢাকাতেই হাজারো পলিথিন কারখানা

প্রকাশিত: আগস্ট ১৭, ২০২২ , ৮:৪৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ১৭, ২০২২ , ৮:৪৮ পূর্বাহ্ণ

একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ও মৃত্যুর মিছিলেও থামছে না পুরান ঢাকার পলিথিন কারখানার দৌরাত্ম্য। উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও পুরান ঢাকার অলিগলিতে দাপটের সঙ্গে চলছে হাজার হাজার পলিথিন কারখানা। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রমরমা ব্যবসা চলছে প্রশাসনের চোখের সামনেই। পলিথিন কারখানা চালু রাখতে এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেটও। বড় কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে ওই সিন্ডিকেটের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট এলাকার কারখানা বন্ধ রাখা হয় ৩ থেকে ৫ দিন। এরপর আবারো শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। আবারো ঝরে যায় তাজা প্রাণ। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে অবৈধ পলিথিন কারখানাগুলো দেখার যেন কেউ নেই। অজ্ঞাত কারণে সব সময় নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও পুলিশ।

সর্বশেষ গত সোমবার দুপুরে পুরান ঢাকার চকবাজারের কামালবাগের বরিশাল হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬ জন নিহত হওয়ার পর পলিথিন কারখানার বিষয়টি আবারো আলোচনায়। কীভাবে অনুমোদন না নিয়ে বহুতল ভবন করা হলো? নিচতলায় হোটেল ও উপরের তলাগুলোতে কীভাবে প্লাস্টিক কারখানা করতে দেয়া হলো? এসব প্রশ্ন জনমনে।

সরেজমিন কামালবাগ এলাকায় দেখা যায়, দেবিদাসঘাট লেনে অবস্থিত শুধু বরিশাল হোটেলে প্লাস্টিক কারখানা করা হয়েছে, তা নয়। এর পাশের গণি মিয়ার হাট ও লাড়কি পট্টিও পলিথিন কারখানায় ঠাঁসা। সবচেয়ে আশ্চর্য্যরে বিষয়- দেবিদাসঘাট লেন, গণি মিয়ার হাট ও লাড়কি পট্টি এলাকায় একই হোল্ডিং নম্বরে (৩০নং) চলছে প্রায় ২ হাজার দোকান। যার ৫ শতাধিকই পলিথিন কারখানা ও এর গোডাউন। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন। টিনের বেড়ার এসব ভবন পুরোটাই পলিথিন ও প্লাস্টিক কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে এখানে উৎপাদন করা হচ্ছে পলিথিনের দানা, প্লাস্টিকের খেলনা, বালতি, চেয়ারসহ নানা পণ্য ও পলিথিনের ব্যাগ। এই প্লাস্টিকের দানাগুলো আবার সরবারহ করা হচ্ছে ইসলামপুরের বড় বড় অবৈধ পলিথিন কারখানায়। সেখানে রাত-দিন উৎপাদন করা হচ্ছে প্লাস্টিক পণ্য।

এসব অবৈধ কারখানার কারণে অন্য ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হলেও ভয়ে মুখ খুলতে পারেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিনিয়ত কারখানার হিটার মেশিন বিস্ফোরণ হওয়ার শঙ্কা নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। সেই সঙ্গে প্রায় ছোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও আতঙ্কে রাখছে তাদের। যদিও ছোট আগুন লাগার ঘটনাগুলো কখনোই প্রকাশ পায় না।

দোকানিরা বলছেন, কামালবাগের পুরো এলাকার মালিক একজনই। তার নাম এমদাদ ব্যাপারি। এজন্য এই এলাকার সব দোকানের হোল্ডিং নাম্বার একই। এমদাদ ব্যাপারির কাছ থেকে ঘর লিজ নেয় শক্তিশালী একটি চক্র। পরে তারাই ব্যবসায়ীদের কাছে ঘর ভাড়া দেয়। অনেকে আবার ওই লোকদের কাছ থেকে জমি কিনে বহুতল ভবন গড়ে তোলেন। ভবন তৈরিতে এখানে সিটি করপোরেশন ও রাজউকের নিয়ম মানে না কেউ। নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও।

২-৩টি ভিন্ন হোল্ডিং নাম্বার দেখে সংশ্লিষ্ট দোকানিদের কাছে কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, ঋণ পেতে নিজের ইচ্ছায় একটু ভিন্ন হোল্ডিং নাম্বার দিয়েছেন। মূলত এগুলোর হোল্ডিংও একই। প্রায় ২ হাজার দোকানে কীভাবে একই হোল্ডিং নম্বরে চলছে জানতে চাইলে ৩০নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ এরফান সেলিম ভোরের কাগজকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। সত্যি যদি এ রকম হয়ে থাকে তাহলে তদন্ত করে নগরপিতাকে (মেয়র) জানানো হবে। ইতোমধ্যে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। সেগুলো বাস্তবায়ন হলে, এ ধরনের সমস্যা থাকবে না।

মদতদাতা স্বনামধন্য প্লাস্টিক কোম্পানিগুলো : প্রায় ১৩ বছর ধরে নিজ কারখানায় পলিথিন উৎপাদন করছেন রিংকু। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, প্লাস্টিক অবৈধ হলেও এর ব্যবহার কিন্তু থেমে নেই। সবক্ষেত্রে পলিথিন দরকার হয়। এজন্য অনেক বছর আগে থেকেই এসব এলাকায় পলিথিন কারখানা গড়ে ওঠে। কেউ পলিথিন উৎপাদন করে, কেউ প্লাস্টিকের পণ্য বানায়, কেউ দানা তৈরি করে ইসলামপুরে সরবরাহ করেন। তবে, কখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেয়া হয় না। চাহিদা থাকায় হাজার হাজার দোকান বন্ধ করাও সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সরকার যদি তাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গা কারখানা করতে বলে, তাহলে তাদের যেতে আপত্তি নেই। কিন্তু সাভারে ট্যানারি স্থান্তরের নামে সমন্বয়হীনতা থাকলে তারা যাবেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী দাবি করেন, দেশের স্বনামধন্য প্লাস্টিক কোম্পানিগুলো কাঁচামালের জন্য পুরান ঢাকার ওপর নির্ভরশীল। ওই কোম্পানিগুলোই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে।

আগুন আতঙ্কে অন্য ব্যবসায়ীরা : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণি মিয়ার হাট এলাকার এক চালের ব্যবসায়ী বলেন, আমার এই গলিতেই ১১টি প্লাস্টিকের কারখানা ও গোডাউন। মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় হাত কেটে ফেলতে হয়েছে অনেকের। তবুও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে সবাই। ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারি না। আতঙ্কে থাকি, কখন আগুন লাগে। ওসব কারখানায় আগুন লাগলে আমার দোকানও পুড়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, বড় আগুনের ঘটনা ঘটলে সিন্ডিকেটের লোকজন ৩-৫ দিন দোকান বন্ধ করে রাখতে বলে। এজন্য এই এলাকার সব দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩ জন ভ্যান চালক ভোরের কাগজকে বলেন, এসব কারখানায় উৎপাদিত প্লাস্টিক দানা পরিবহনের সময় রাস্তায় মাশোয়ারা নেয় পুলিশ। এজন্য কারখানা মালিক অতিরিক্ত ১০০-২০০ টাকা দিয়ে দেয়। পুলিশকে ৩০-৫০ টাকা দিলেই ভ্যান ছেড়ে দেয়।

স’ মিল থেকে চারতলা ভবন : সোমবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটা বরিশাল হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টের সাবেক বাবুর্চি মোহসিন মোল্লা ভোরের কাগজকে বলেন, ৩০ বছর কাজ করার পর গত রোজার ঈদের পরে চাকরি ছেড়ে দিলেও আগুন লাগার খবর শুনে ছুটে এসেছেন। আগে এর নাম ছিল রুবেল হোটেল। তখন স’ মিলের সঙ্গে ছোট হোটেল ছিল। এক বছর আগে এটি বহুতল ভবন করা হয়। তখন নাম দেয়া হয় বরিশাল হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট। দুই শিফটে ১৫ জন কর্মচারী হোটেলটিতে কাজ করত।

সরেজমিন দেখা যায়, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে লাগা আগুনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে হোটেলটি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া চেয়ার-টেবিল, হাড়ি পাতিল। বিস্ফোরণে উড়ে গেছে হোটেলের উপরে পাটাতন করে নির্মিত স্টাফদের ঘুমানোর জায়গাও। এই পাটাতনের উপরেই ঘুমিয়ে ছিলেন হোটেলের নিহত কর্মচারীরা। পাটাতনে ওঠার লোহার তৈরি সিঁড়ি দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছে স্টাফদের মানবেতর জীবনযাপনের। বিস্ফোরণে ক্ষত চিহ্ন লেগে রয়েছে দেয়ালেও। হোটেলের সঙ্গে থাকা কিচেনেও পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া বিক্রির জন্য রান্না করা বিভিন্ন তরকারি, ভাত, আটার বস্তা ও সিঙ্গারাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারিদিকে।

আগুনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপর তলাগুলোর প্লাস্টিক কারখানাও। আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের ভবনেও। গতকাল দুপুরেও পাশের ওই ভবন থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। ভিড় দেখা যায় উৎসুক জনতারও। জানা গেছে, ভবনের মালিক আলম নামে এক ব্যক্তি হলেও বর্তমান মালিকের নাম মো. রানা।

বরিশাল হোটেলের মালিক রিমান্ডে : ৬ কর্মচারী নিহতের ঘটনায় হোটেল মালিক মোহাম্মদ ফখরুদ্দিনের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিম এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে গতকাল সকালে ফখরুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চকবাজার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাজিব কুমার সরকার জানান, নিহত হোটেল কর্মচারী রুবেলের বড় ভাই মোহাম্মদ আলি সোমবার রাতে ২ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে অভিযান চালিয়ে ফখরুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নিহতদের লাশ হস্তান্তর : গতকাল স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড) মর্গে ছয় মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতালটির ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. ওমর ফারুক জানান, মরদেহগুলো থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এই নমুনাগুলো সিআইডির ফরেনসিক টিমকে দেয়া হবে।

এদিকে গতকাল রাতে স্বজনদের কাছে মরদেহগুলো বুঝিয়ে দেয়া হয়। হস্তান্তরকৃত ছয় মরদেহ হলো- বিল্লাল (৩৫), ওসমান (২৫), মো. শরীফ (১৬), স্বপন সরকার (১৯), মোতালেব (১৬) ও রুবেল (২৮)। হস্তান্তরের সময় মরদেহ বহন ও দাফনের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়। প্রতি পরিবারকে ২ লাখ করে আর্থিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়